৮০ শতাংশ পুরুষ নির্যাতনের শিকার নারায়ণগঞ্জে বছরে ৩৯৭
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৬ মার্চ ২০২৩, ০৮:০০ পিএম
সারা দেশের ন্যায় নারায়ণগঞ্জ জেলায়ও বেড়েছে পুরুষ নির্যাতনের সংখ্যা। নারী নির্যাতনের ঘটনা সচরাচর শোনা গেলেও পুরুষ নির্যাতনের ঘটনা আমাদের সমাজে গুরুত্ব পায়না। লোকলজ্জা, সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হওয়া সহ নানা কারণে পুরুষ নির্যাতনের ঘটনা আড়ালে-আবডালে থেকে যায়। তবে এই সমস্যা ক্রমশ বিরাট আকার ধারণ করছে। পুরুষরা শারীরিকের তুলনায় মানসিক নির্যাতনের শিকার বেশি হচ্ছেন। তবে নির্দিষ্ট সংখ্যক নির্যাতিত পুরুষ বাধ্য হয়ে নির্যাতনের কথা তুলে ধরছেন। বাংলাদেশ ম্যান’স রাইটস ফাউন্ডেশন নামে একটি সংস্থা পুরুষ নির্যাতন নিয়ে জরিপ চালিয়েছে।
সংস্থাটির তথ্য অনুাযায়ী, সারা দেশে ৮০ শতাংশ বিবাহিত পুরুষ মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন বলে জরিপে উঠে এসেছে। এছাড়া সারা দেশে গত এক বছরে ৭৯২ জন পুরুষ শারীরিক ও মানসিক উভয় নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ পেয়েছে সংস্থাটি। আর নারায়ণগঞ্জ জেলায় পুরুষ নির্যাতনের সংখ্যা ৩৯৭ জন।
২০১৬ সালে বাংলাদেশ ম্যান’স রাইটস ফাউন্ডেশনের যাত্রা শুরু হয়। বাংলাদেশ ম্যান’স রাইটস ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে নারায়ণগঞ্জ জেলায় ৩৯৭ টি ও সারা দেশে ৭৯২টি পুরুষ নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ২০২১ সালে নারায়ণগঞ্জে ২১২টি ও সারাদেশে ৪৫০টি, ২০২০ সালে নারায়ণগঞ্জে ১৫৩টি ও সারাদেশে ৩৩০টি, ২০১৯ সালে নারায়ণগঞ্জে ১১৭টি ও সারাদেশে ২৪০টি, ২০১৮ সালে নারায়ণগঞ্জে ৮২টি ও সারাদেশে ১৭০টি, ২০১৭ সালে নারায়ণগঞ্জে ৬৫টি ও সারাদেশে ১২০টি, ২০১৬ সালে নারায়ণগঞ্জে ২৩টি ও সারাদেশে ৫০টি। তবে প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক গুন বেশি বলে দাবি করছেন সংস্থাটি।
স্ত্রী কর্তৃক মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন সরকারি চাকরীজীবি আব্দুল্লাহ আল আরেফিন (ছদ্মনাম)। তিনি নারায়ণগঞ্জ জেলার আমলাপাড়া এলাকায় বসবাস করেন। তিনি ভালোবেসে বিয়ে করে পরিবার সদস্যদের ত্যাগ করে অন্যত্র বসবাস করছেন। আক্ষেপের সুত্রে তিনি বলেন, ‘স্ত্রীর কথা না শুনলে তিন বছরের কণ্যা সন্তানকে নিয়ে বাবার বাড়িতে পাড়ি জমান তার স্ত্রী। এমনকি স্ত্রীর কোন অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে উল্টো রেশানলে পড়তে হয়, নারী নির্যাতনের মামলা ঠুকে দেওয়ার ভয় দেখান স্ত্রী সহ শ্বশুর বাড়ির লোকেরা।
এ বিষয়ে স্থানীয় পুলিশ স্টেশনে গিয়েও কোন সহযোগিতা পাননি। উল্টো তার বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের মামলা হলে সরকারি চাকরী হারানোর কথা জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তারা। তাছাড়া সমাজে হেয় প্রতিপন্ন হওয়ার লজ্জায় এ বিষয়ে কাউকে বলতেও পারছেন না। ফলে স্ত্রীর মানসিক নির্যাতন সহ্য করে নিরবে চোখের জল ফেলছেন এই কর্মকর্তা।
বাংলাদেশ ম্যান’স রাইটস ফাউন্ডেশনের (বিএমআরএফ) চেয়ারম্যান শেখ খায়রুল আলম বলেন, পুরুষ নির্যাতন দমনে দেশে কোন আইন নেই বলে এর প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। আমরা নারী-পুরুষ সমতা চাই। আমাদের দেশে আইন আছে কিন্তু একচেটিয়া। এই আইনে পুরুষদের প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করা হয়েছে। যেমন নারী নির্যাতন আইন। আমরা চাই নারী কিংবা পুরুষ যে নির্যাতিত হোক-না কেন তার যেন বিচার হয়। তদন্ত করে সুষ্ঠু বিচার হোক। এজন্য নিরপেক্ষ আইন হওয়া দরকার।
তবে নারী নির্যাতন আইন থাকলেও পুরুষ নির্যাতন আইন নেই। ফলে অনেক ক্ষেত্রে নারী নির্যাতন আইনের অপব্যবহার হচ্ছে। এতে অনেক পুরুষ নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, মিথ্যা মামলার মধ্য দিয়ে হয়রানির শিকার হচ্ছে। কিন্তু লোকলজ্জা ও সম্মান হানির ভয়ে অনেকে তা বলতে পারছেনা। এরপরও আমাদের কাছে অনেকে নির্যাতনের নানা অভিযোগ নিয়ে আসছে। আমরা সংগঠনের পক্ষ থেকে জরিপ করে দেখেছি, আমাদের দেশে ৮০ শতাংশ বিবাহিত পুরুষ মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। অনেক পুরুষ এই নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার পথ পর্যন্ত বেছে নিচ্ছে।
নারীদের পক্ষে থাকা একটি আইনের ধারা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দন্ডবিধি ৪৯৭ ধারায় আছে, এক জনের স্ত্রী আরেক ব্যক্তির সাথে পরকীয়ায় আসক্ত হলে, ওই নারী দায়মুক্ত আর পুরুষ ব্যক্তিটির ৫ বছরের জেল জরিমানা হবে। অথচ এখানে দুজনই সমান অপরাধী, কিন্তু শাস্তি পাচ্ছে পুরুষ। এটা কেন? এ কারণে আমরা সংগঠনের পক্ষ থেকে চাই ধারাটি সংশোধন হোক।
তিনি আরও বলেন, আমাদের সমাজে নারী নির্যাতন বাড়ছে গাণিতিক হারে। আর পুরুষ নির্যাতন বাড়ছে জ্যামিতিক হারে। সমাজে পুরুষ নির্যাতন বাড়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে বিয়েতে মোটা অংকের দেনমোহর দেওয়া। দেনমোহরের এই টাকা আদায়কে কেন্দ্র করে সমাজের একদল নারী মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালায়। আবার অনেক নারী দেনমোহরের মোটা অংকের টাকা নিয়ে অন্যত্র বিয়ে করছে। পুরুষদের হাতের পুতুল বানাতে না পারলে অনেক নারী উল্টো নারী নির্যাতনের মিথ্যা মামলা ঠুকে দেওয়ার ভয় দেখায়, এমনকি মামলা করে দেয়। এছাড়াও পরকীয়া, স্যাটেলাইট চ্যানেলের নেতিবাচক প্রভাবের ফলে পুরুষ নির্যাতন বাড়ছে।
প্রথম স্ত্রী কর্তৃক মিথ্যা মামলায় হয়রানির শিকার হয়েছেন বাংলাদেশ ম্যান’স রাইটস ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শেখ খায়রুল আলম। তিনি বলেন, পারিবারিকভাবে আমার প্রথম বিয়ের হয়েছিল। বিয়ের তিন মাস পর আমার স্ত্রীকে ঘরে তোলার কথা ছিল। কিন্তু শ্বশুরবাড়ীর লোকজন ঘরে তুলতে দিচ্ছিল না। স্ত্রীকে ঘরে তুলতে পারিবারিকভাবে চাপ দিলে তিনি আমার বিরুদ্ধে ২০১৫ সালে যৌতুকের মামলা ঠুকে দেয়। স্থানীয়রা সবাই এই মামলাকে মিথ্যা মামলা বলে অভিহিত করেছে। কিন্তু আদালত সেই কথায় কর্ণপাত করেনি।
পরে জামিনে বেরিয়ে এলে ফের নারী নির্যাতনের মামলা দেওয়া হয়। তবে মামলার তদন্তে নির্যাতনের সত্যতা পায়নি। তবুও আমাকে হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। আমার বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট হয়েছে। তখন উপলব্ধি করতে পারি যে, আমার মত হাজার হাজার লাখ লাখ পুরুষ এভাবে হয়রানির শিকার হয়ে আসছে। ফলে মামলার ওয়ারেন্ট মাথায় নিয়ে ২০১৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারী পুরুষ নির্যাতন প্রতিরোধ আন্দোলন শুরু করি। আর সেই মামলা মিটমাট করেছি যৌতুকের টাকার দ্বিগুণ টাকা পরিশোধ করে। নারীদের পক্ষের এই আইনের কাছে নিতান্তই নিরুপায় ছিলাম।’
মহিলা পরিষদের জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হাসিনা পারভীন বলেন, ‘বর্তমানে আইন নারীদের পক্ষে। এর কারণ হলো আগে ৯৯ শতাংশ পুরুষ খারাপ ছিল। নারী নির্যাতনের ঘটনা অহরহ ঘটতো। আইনের কারণে সেটা আগের তুলনায় কমেছে। আর পুরুষ নির্যাতনের বিষয়টা সেই তুলনায় অনেক কম বলা চলে। তবে কিছু কিছু অসাধু নারী এই আইনের অপব্যবহার করছে। তারা কাবিনের টাকা পাওয়ার জন্য মামলা করে থাকে। তবে এই সংখ্যা অতি নগন্য।
তিনি আরও বলেন, ‘‘আমরা অনেক আগে থেকে সমতা বা সমান অধিকারের কথা বলে আসছি। এই আইনের কথা আমরা অনেক আগে থেকে দাবি করে আসছি। কারণ নারী ও পুরুষের সমান অধিকার পাওয়া উচিত। পুরুষ অধিকার ফাউন্ডেশন এই দাবি করে থাকলে আমরা তাদের সাধুবাদ জানাই।
জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মনিরুজ্জামান বুলবুল বলেন, ‘নারী-পুরুষ উভয়কে সমান অধিকার দেওয়া উচিত। বর্তমান আইন ব্যবস্থার ফলে অনেক নারী মিথ্যা মামলা দিয়ে পুরুষদের হয়রানী করতে পারেন। তবে সব নারী খারাপ নয়, তাদের মধ্যে ভাল-খারাপ রয়েছে। প্রকৃত নারী নির্যাতনের বিষয়গুলোকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে অনেক নারী বিয়েতে বেশি টাকা কাবিন করিয়ে, সেই টাকা আদায়ের জন্য মামলা দিয়ে হয়রানী করে। অনেক সময় উদ্দেশ্যমূলকভাবে মামলা দেওয়া হয়।
এ কারণে অনেক সময় মিথ্যা মামলার আড়ালে সঠিক বা প্রকৃত মামলাগুলো হারিয়ে যায়। তাই পুরুষের বেলায়ও আইন করা দরকার। যাতে করে পুরুষরা তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়, হয়রানির শিকার না হয়। ফলে আইন পরিবর্তন নয়, আইন মোডিফাই করা দরকার।
এস.এ/জেসি


