Logo
Logo
×

বিশেষ সংবাদ

শীতলক্ষ্যা বিশুদ্ধ পানির যোগান দিতে অক্ষম

Icon

লতিফ রানা

প্রকাশ: ২৫ মার্চ ২০২৩, ০৮:০৬ পিএম

শীতলক্ষ্যা বিশুদ্ধ পানির যোগান দিতে অক্ষম
Swapno

 

 # গুরুত্বপূর্ণ এই নদী বাঁচানোর উদ্যোগ কথাতেই সীমাবদ্ধ

 

 

আমাদের দেশের সভ্যতার বিকাশে, শিল্প-বাণিজ্য তথা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে নদ-নদীর ভূমিকা খুবই খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ছোট্ট এই এদেশটির আনাচে-কানাচে অবস্থিত অজস্র নদ-নদী বাঙালীর অস্তিত্বের সাথে জড়িয়ে আছে। ইতিহাসের পর্যালোচনা করলে দেশের আর্থিক পরিসংখ্যান, সভ্যতার বিকাশ ও উন্নয়নে বাঙালির ঐতিহ্যের সাথে জড়িয়ে আছে এদেশের অসংখ্য নদী। এই নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা আমাদের জীবনাবস্থার কারণেই বাংলাদেশকে নদীমাতৃকার দেশ বলা হয়। সভ্যতার উন্নয়নের সাথে প্রযুক্তিরও ব্যাপক উন্নয়ন ঘটেছে। প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সাথে সমন্বয় করে বেড়ে চলেছে যান্ত্রিক ব্যবহার।

 

সভ্যতার পরিবর্তনের সাথে পাল্লা দিয়ে সেই কৃষি নির্ভর দেশেই এখন এসব নদীকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে শহর-বন্দর, মিল-কারখানা ও বিভিন্ন শিল্প-প্রতিষ্ঠান। যার অনন্য দৃষ্টান্ত নারায়ণগঞ্জ জেলার বুক চিরে প্রবাহিত হওয়া নদী শীতলক্ষ্যা। এই শীতলক্ষ্যাকে কেন্দ্র করেই নারায়ণগঞ্জ সমৃদ্ধতা অর্জনসহ প্রাচ্যের ডান্ডি হিসেবে খ্যাতি অর্জন করে। এই নদীকে কেন্দ্র করেই নারায়ণগঞ্জ শহরের গোড়াপত্তন। নদীর তীরে গড়ে উঠেছে শত শত শিল্প-কারখানা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারায়ণগঞ্জের বিরাট ভূমিকার পেছনের নায়কও এই শীতলক্ষ্যা নদী। তবে আমাদের উদাসীনতা এবং কিছু স্বার্থান্বেষী লোকের কারণে আজ ঐতিহ্য হারিয়ে মরতে বসেছে শীতলক্ষ্যা।

 

বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, এই নদীর পানি ছিল খুবই সুস্বাদু এবং শীতল। নদীর পাশে গড়ে উঠা বসত বাড়ির জনগণ এই নদীতে গোসল, ব্যবহৃত জিনিসপত্রের ধোয়া মোছার কাজসহ পানির যাবতীয় কাজেই এই নদীর পানি ব্যবহার করতো। অনেক দূর দূরান্ত থেকেও এই নদীর পানি সংগ্রহের জন্য চলে আসতো। বছরের প্রায় সব সময়ই নদীর পানিতে মাছের বাস ছিল। এই নদীর মাছকে কেন্দ্র করে নদীর আশেপাশের অনেক অনেক পরিবারই মাছ ব্যবসার কাজে নিয়োজিত ছিল। তাদেরকে জেলে পরিবার বলা হতো। এই ধরণের জেলে পরিবারদের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছিল ছোট ছোট পাড়া, যাদের জেলেপাড়া বলা হতো।

 

অথচ শীতলক্ষ্যা নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন বর্জ্যের কারণে আজ বিষাক্ত হয়ে উঠেছে এই নদীর পানি। সেখানে মাছ বাস করবেতো দূরের কথা কোন পোকা মাকড়ও বাস করা সম্ভব নয় বলে স্থানীয়দের অভিমত। বিভিন্ন টেক্সটাইল মিলস, কটন মিলস, নীটিং-ডায়িং কারখানা, সিমেন্ট কারখানার বর্জ্যসহ পয়ঃনিষ্কাশনের বিভিন্ন ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে শীতলক্ষ্যা আজ অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়েছে। এই নদীর মাছ ধরার উপর নির্ভর করে যেসব জেলে পরিবারগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী যাবৎ জীবিকা চালিয়ে আসছিলেন, এখন তারা বাধ্য হয়েই সেই ঐতিহাসিক পেশা পরিবর্তন করছেন। অন্যদিকে নদীর পানি ব্যবহারে অযোগ্য হয়ে পড়ায় দৈনন্দিন প্রয়োজনে ব্যবহৃত পানির সঙ্কটের সৃষ্টিসহ খাবার পানির সঙ্কটে দিশেহার হয়ে পড়েছেন স্থানীয় জনগণ।

 

সচেতন মহলের মতে প্রযুক্তি মানব কল্যানের জন্য। তাই এর সুষ্ঠ ব্যবহারে অমঙ্গলের কোন আশঙ্কা থাকে না। সভ্যতার পরিবর্তনে শিল্প ও বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানের উন্নতির সাথে সাথে প্রকৃতিকে রক্ষা করারও কৌশলও উদ্ভাবন করেছে প্রযুক্তি। কিন্তু যান্ত্রিক প্রযুক্তি উন্নয়নের সাথে সাথে আমাদের কিছু সুবিধাবাদি স্বার্থান্বেষী লোকও এখন যান্ত্রিক হয়ে পড়েছে বলে মনে করেন তারা। এর ফলে তাদের কিছু ব্যক্তিগত লাভের জন্য সেসব কৌশলকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখাচ্ছেন তারা। শিল্প প্রতিষ্ঠানের নীতিমালায় শিল্প বর্জ্যরে ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তারের কথা বিবেচনা করে তা নিয়ন্ত্রণে ইটিপি প্লান্টের (ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট, যার মানে বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ স্থাপনা) নির্দেশনা দেওয়া আছে।

 

‘শিল্প কারখানার তরল বর্জ্য পদার্থকে যে প্লান্টের মাধ্যমে পরিশোধন করে সাধারণ পানির মতো করে পুনঃব্যবহার করার উপযোগী করে বা শিল্প কারখানা থেকে নির্গত পানি যেন পরিবেশকে দূষিত করতে না পারে সে জন্য যে প্লান্ট ব্যবহার করা হয় তাকেই ইটিপি প্লান্ট বলে’। কিন্তু নারায়ণগঞ্জে অবস্থিত অনেক কারখানায়ই ইটিপি প্লান্ট নেই। যেসব কারখানায় এই প্লান্ট তৈরি করা হয়েছে টাকা খরচ কমানোর জন্য তাদের বেশিরভাগই কারখানায় ইটিপি প্লান্ট ব্যবহার করছেন না। তারা কারখানার কেমিক্যালসহ বিভিন্ন বর্জ্য ড্রেনেজ ব্যবস্থার মাধ্যমে এই শীতলক্ষ্যায় ত্যাগ করছেন।

 

পরিবেশবিদসহ সরকারের পক্ষ থেকে ইটিপি প্লান্ট ব্যবহারের কড়া নির্দেশনা থাকলেও অনেক শিল্প কারখানাই তাদের সারাদিনের বর্জ্য জমিয়ে রেখে রাতের আধারে তা নদীতে ছেড়ে দিচ্ছেন। এতে নদীর পানির সাথে এসব কেমিক্যাল মিশে গিয়ে পানিকে ব্যবহারের অযোগ্য করে তুলেছেন। এর সাথে পয়ঃনিষ্কাশনের বর্জ্য সিমেন্ট কারখানার বর্জ্য পানির সাথে মিলে মিশে একাকার হয়ে পুরো শীতলক্ষ্যার পানিকেই কেমিক্যালে পরিণত করে দিয়েছে। তাই এখন শীতলক্ষ্যা নদীটির অস্তিত্ব নিয়েই শঙ্কায় আছেন সচেতন মহল।

এস.এ/জেসি
 

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন