Logo
Logo
×

বিশেষ সংবাদ

আধিপত্য নিয়ে বাড়ছে খুন

Icon

রাকিবুল ইসলাম

প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০২৩, ০৭:৪৬ পিএম

আধিপত্য নিয়ে বাড়ছে খুন
Swapno

 

# তুচ্ছ কারণে ঘটছে হত্যার ঘটনা, ৪ দিনে ৫ হত্যার ঘটনা
# পাতি নেতাদের শেল্টারে হত্যার ঘটনা ঘটছে : নুর উদ্দিন

 

 

রমজান মাস হলো তাকওয়া অর্জনের মাস। বিশেষ করে এই মাসে মানুষের মন মানসিকতা, চিন্তা চেতনার মাধ্যমে সৃষ্টি কর্তার প্রতি আনুগত্য শীল হয়ে থাকেন। অর্থাৎ ইবাদতের মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তার প্রতি নত হয়ে থাকেন। কিন্তু এই মাসে হঠাৎ করে মার্ডার, মারামারি, প্রকাশ্যে দিন দুপুরে মানুষ মেরে ফেলার ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সচেতন নাগরিক সমাজ। এছাড়া ছিন্তাই, পকেটমার সহ নানা অপরাধ বেড়েগেছে। কিন্তু অপরাধ থেকে মানুষকে প্রশাসন সচেতন করার পরেও অপরাধ থামানো যাচ্ছে না।

 

এদিকে জানা যায়, গত এক সপ্তাহ না যেতেই হঠাৎ করে নগরীসহ জেলার আশপাশের এলাকা গুলোতে হঠাৎ করেই অপরাধের ঘটনা বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বীভৎস কায়দায় খুন করা হচ্ছে। আবার অনেক জায়গায় আধিপত্যকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্যে অস্ত্র দিয়ে খুন করা হচ্ছে। সেই সাথে লাশ গুম করতে মানব দেহকে খণ্ডবিখণ্ড করা হচ্ছে। সচেতন মহলের মতে এই সকল হত্যার নেপথ্যে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে পারিবারিক দ্বন্দ্ব, এলাকায় ব্যবসা দখল করা নিয়ে দ্বন্দ্ব, আর্থিক সংকট, পরকীয়া, মাদক, ভুমিদস্যুতাসহ বিভিন্ন কারণে ঘটছে খুনের ঘটনা।

 

একের পর এক খুনের ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়েছে জনমনে। তার মাঝে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী একাধিক ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করলেও মুল হোতারা ধরা ছোয়ার বাইরে থেকে যায় বলে অভিযোগ ভুক্তভোগির। সেই সাথে অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দও করেছে। এর পরেও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা কমছে না। জানা যায়, সম্প্রতি কয়েকটি ঘটনা বিশ্লেষণে নৃশংসতার চিত্র ফুটে ওঠে। এদিকে সচেতন মহল সহ নগরবাসী এই অপরাধ থেকে বের হওয়ার জন্য পথ খুঁজতে গিয়ে অভিভাবকদের সচেতন হওয়ার জন্য পরামর্শ দেন। সেই সাথে তাদের সন্তানদের প্রতি খোজ রাখার আহবান জানান সচেতন মহল এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

 

ব্যবসার আধিপত্য নিয়ে হত্যার ঘটনা : 

সম্প্রতি বছর কয়েক যাবৎ জনপ্রিয় সংক্ষিপ্ত ভিডিও তৈরির অ্যাপ টিকটটের অপব্যবহার হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমটি। টিকটকের মাধ্যমেই অপরাধ জগতে প্রবেশ করছে কিশোররা। এতে খালি হচ্ছে অসংখ্য মায়ের বুক। এছাড়াও কিশোরী ও তরুণীরা তাদের সম্ভ্রম হারাচ্ছেন। বয়স ১৬ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে তরুন তরুণীরা টিকটকে জরিয়ে পরছে। তাদের বেশির কিশোর কিশোরীর গায়ে দেরশ থেকে ২০ টাকার প্যান্ট শার্ট পড়া থাকে। সেই সাথে হাতে একটি এন্ড্রোয়েট দামি মোবাইল থাকে। দাম কমপক্ষে ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা। তারা কিশোর গ্যাং হিসেবে পরিচিত।

 

এদের কেউ প্রিন্টিং কারখানা, কেউ গার্মেন্টস আবার কেউ ডাইং কারখানায় চাকরি করে। এছাড়াও মাধ্যমিক উচ্চ মাধ্যমিক লেভেলের শিক্ষার্থীরা রয়েছেন। সপ্তাহ শেষে ছুটির দিনে ওরা দলবেঁধে টিকটক ভিডিও চিত্র তৈরি করে ফেসবুকে ছাড়ে। বন্ধুদের শেয়ার করে। কিন্তু বেশভূষায় তার ছাপ নেই। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ শহরে ভাসমান, কোনো আত্মীয়ের বাসায় থাকে কিংবা কোনো মেসবাড়িতে থাকে। এদের বেশিরভাগই নারায়ণগঞ্জের বহিরাগত থেকে আসা। কিন্তু অপরাধ জগত থেকে তাদের ফেরানো যাচ্ছে না বলে অভিযোগ নগরবাসির।

 

কয়েকটি ঘটনায় জানা যায়, ২৭ মার্চ  রূপগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম মাড়া এলাকার গৃহবধূ পারভীন আক্তারের সঙ্গে পারিবারিক কলহের জের ধরে তার দেবর রফিকুল ইসলামের বাকবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে রফিকুল ইসলাম (৫০) ও তার ছেলে রনি মিয়া (২২) পারভীন আক্তারকে বেদম প্রহার করে। তার ডাক চিৎকারে আশপাশের লোকজন ছুটে আসলে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। পরে পারভীন আক্তারকে উদ্ধার করে প্রথমে রূপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সে ও পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপালে ভর্তি করা হয়। গত ৩ এপ্রিল রাতে পারভীন আক্তারের মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় নিহত পারভীন আক্তারের দেবর রফিকুল ইসলামকে ৪ এপ্রিল রুপগঞ্জ থানা পুলিশ গ্রেপ্তার করে আদালতে প্রেরণ করেন।

 

চলতি মাসের ৩ এপ্রিল বন্দরে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ঠিকাদারি ব্যবসার একক নিয়ন্ত্রণ নিতে মো. মিরাজুল ইসলাম মেরাজ (২৩) নামে ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। এ সময় মেরাজের কর্মচারী আলআমিনকে (২১)কে কুপিয়ে জখম করা হয়েছে। গত সোমবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে  বন্দর রূপালী আবাসিক এলাকায় আয়মান ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপের সামনে এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় মেরাজের উপর হামলা এবং নিহত হওয়ার ঘটনার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে এরই মধ্যে আব্দুর রব (৪৮) ও স্বপন (৩৮) নামে দুই জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ৪ এপ্রিল রাতে নিহত মেরাজুলের মা নাসরিন বাদী হয়ে বন্দর থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।

 

মামলায় সিটি করপোরেশনের ২১ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর শাহীন মিয়াকে হুকুমের আসামি করে ১৪ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরো ৬ জনকে বিবাদী করা হয়। মামলার অপর নামীয় আসামীরা হলো বন্দরের চিনারদী এলাকার শাহ আলমের ছেলে আকিব হাসান রাজু (৩৪), ছালেহনগর এলাকার খলিলুর রহমানের ছেলে সোহেব ওরুফে সৌরভ (২৮), নূর হোসেনের ২ ছেলে সাখাওয়াত হোসেন পিংকি (৩৮) ও বাবু (৪৫), আব্দুল জলিলের ছেলে ফয়সাল ওরফে রবিন (৩০), শামসুদ্দিন প্রধানের ছেলে কাজল প্রধান (৪৮), মুছা মিয়ার ছেলে মাসুদ ওরুফে মাইচ্ছা (৪৮), তোতা মিয়ার ছেলে নাদিম (৩৭), রূপালী আবাসিক এলাকার বাকি মিয়ার ছেলে মানিক (৩৫), একই এলাকার মৃত সোয়েব আলী বেপারীর ছেলে আব্দুর রব (৫৫), মুছা মিয়ার ছেলে স্বপন (৪৮), সোবহান মিয়ার ছেলে বিল্লাল হোসেন বিল্লু (৩৩), কুদ্দুস মিয়ার ছেলে রানা ওরুফে কাইল্লা রানা (৩২)।

 

এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই তার পরের দিন ৪ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ আড়াইহাজার উপজেলার কালিবাড়ি বাজার সংলগ্ন এলাকা থেকে যুবদল নেতা মাহবুবুল আলমকে ধরে নিয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। হত্যার ঘটনার সাথে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতাকর্মীরা জড়িত বলে দাবি বিএনপি নেতাকর্মীদের। এ ঘটনায় ইতোমধ্যে ৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে আড়াই হাজার পুলিশ।

 

গত ১৬ মার্চ বন্দরের ফরাজি কান্দা এলাকায় কলাগাছিয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান রাইসুল হকের ছেলেদের সাথে জায়গা দখল নিয়ে শহরের হোন্ডাবাহিনী গুলাগুলির ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় রাইসুল চেয়ারম্যানের বড় ছেলে মাইনুল হক পারভেজ পায়ে গুলিবৃদ্ধ হন। পরে তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৫ এপ্রিল ভোরে মারা যান। তার মৃত্যু নিয়ে এলাকার মানুষের মাঝে নানা প্রশ্ন উঠেছে। তবে জায়গা দখলের ঘটনায় বন্দর থানায় মামলা হয়েছে।

 

এই ঘটনার পরিস্থিতি কাটিয়ে না উঠতেই গতকাল ৬ এপ্রিল কাশিপুর বাংলা বাজার এলাকায় আধিপত্য এবং বালুর ব্যবসাকে কেন্দ্র করে চিহ্নিত সন্ত্রাসী রাজু সাজু বাহিনীর হাতে নিহত ১৪ মামলার আসামী আফজালুর রহমান। স্থানীয়দের অভিযোগ উভয় গ্রুপের মাঝে দীর্ঘ দিন যাবৎ প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে বালুর ব্যবসা দখল নিয়ে দ্বন্দ্ব চলে আসছে। তারই সূত্র ধরে গতকাল প্রকাশ্যে আফজালকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। একই দিনে অপরদিকে বন্দরের ধামগর কুঁড়িপাড়া এলাকায় নিখোঁজের ৩ দিন পর সৌরভ (৭) নামে এক শিশুর মৃতদেহ পরিত্যক্ত একটি জঙ্গল থেকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। ৬ এপ্রিল বৃহস্পতিবার দুপুরে ধামগড় কুড়িপাড়া এলাকা ভাড়া বাড়ির পাশ্ববর্তী একটি ঝোপ থেকে এই লাশটি উদ্ধার করা হয়।এ ঘটনায় নিহত সৌরভের বড় ভাই সানি, ভাবী আয়েশা এবং সানির শাশুড়ী শিল্পী বেগমকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছে পুলিশ।  

 

নিহতের মা কুলসুম বেগমের অভিযোগ করে বলেন, তার বড় ছেলে সানি ৭ মাস আগে পার্শ্ববর্তী বাড়ির ভাড়াটিয়ার মেয়ে আয়েশাকে ভালবেসে বিয়ে করে। কিন্তু আয়েশার মা শিল্পী বেগম এ বিয়ে মেনে নিতে পারেননি। বিয়ের পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে সানির পরিবারের সাথে আয়েশার মা শিল্পী বেগমের সম্পর্ক খারাপ ছিল। তার জের ধরেই শিল্পী বেগম সৌরভকে গুম করেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। গত ৪ এপ্রিল মঙ্গলবার সকাল ৯ টায় ঘর থেকে বেরিয়ে নিখোঁজ হয় সৌরভ। পরে গতকাল ওই এলাকার এক জঙ্গল থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়।

 

আমরা নারায়ণগঞ্জবাসি সংগঠনের সভাপতি হাজী  নুর উদ্দিন বলেন, যে কোন হত্যার ঘটনাই মানুষকে সংকিত করে তোলে। এখন সামfন্য ছোট খাটো তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটছে। যা আগে ছিলনা। এলাকায় কিছু পাতি নেতা জন্মাইছে, তাদের শেল্টারে এখন পাড়া মহাল্লার যুব সমাজের ছেলেরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এই পাতি নেতাদের শেল্টারে এই ধরনের হত্যার ঘটনা ঘটছে। এদেরকে দমন করার জন্য প্রশাসনের সাথে স্থানীয় পাতি নেতাদের পদক্ষেপ নিতে হবে। সেই সাথে পারিবারিক, সামাজিক ভাবে অল্প বয়সের ছেলেদের নিয়ন্ত্রনের ব্যবস্থা নিতে হবে।

 

এ ব্যাপারে জেলা পুলিশ সুপার গোলাম মোস্তফা রাসেলের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন কল রিসিভ করেননি।

এস.এ/জেসি

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন