Logo
Logo
×

বিশেষ সংবাদ

বঙ্গবাজার-যে আগুন দেখা যায়না

Icon

করীম রেজা

প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০২৩, ০৯:২৯ পিএম

বঙ্গবাজার-যে আগুন দেখা যায়না
Swapno


ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখে ডরায়,আমরা ডরাই না। বঙ্গবাজারে আগুন লেগেছে। সব পুড়ে ভস্ম হয়েছে। কদিন আগেও সিদ্দিক বাজারে আরেক ভবনে আগুন ধরেছিল। খোদ ঢাকা শহরের বেশ কয়েকটি জায়গায় অল্পদিনের ব্যবধানে কয়েকটি আগুন লাগার ঘটনা ঘটল। সাধারণত অগ্নিকান্ড নিয়ন্ত্রণে আসার পর ক্ষয়ক্ষতির একটা খতিয়ান তুলে ধরা হয়। সম্ভাব্য কারণও নির্দেশ করা হয়।

 

 

এবার বঙ্গবাজারের আগুনের কারণ এখনও অনুুমান করা যায়নি। আনুমানিক ক্ষতির পরিমাণ পত্রপত্রিকায় লিখছে কমপক্ষে ১ হাজার কোটি টাকা। সবাই জানে এ হিসাবের চেয়ে ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি। কোনও কোনও ব্যবসায়ীর অস্তিত্বই সাফ হয়ে গেছে, সেই ক্ষতির হিসাব টাকায় গুণে নিরূপণ করা কঠিন। 

 

 

আগুন আছে, আগুন লাগে। আগুন বনে লাগে, মনে লাগে, ঘরে লাগে, সব জায়গাতেই লাগে। আগুন একটু অভদ্র, বেয়াদব রকম। বড় ছোট, ভাল মন্দ কিছু বুঝতে চায় না। তবে মানুষ আগুন নিয়ন্ত্রণের অনেক ফন্দি ফিকির করে ফেলেছে। তাই আগুনের আর সেই কাল নাই,সব বিনা বাঁধায় ছাই করে ফেলবে।

 

 

কিন্তু আমাদের দেশে তার উল্টো, আগুন নিয়ন্ত্রণ করার আয়োজন আমাদের কাছে অহেতুক অতিরিক্ত ব্যয়। কোটি টাকা খরচা করে বহুতল ভবন, মার্কেট বানাতে পারি কিন্তু অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থার জন্য সামান্য খরচ করতে পারি না। তার খেসারত আমাদের দিতে হয় বঙ্গবাজারে, সিদ্দিক বাজার বা অন্য কোথাও। 

 

 

একদিন গরু আগুনের লাল লেলিহান শিখা দেখেছিল ঘনকালো ধোঁয়ার মাঝে। সেই প্রায় একই ছবি গরুর স্মৃতিতে ধরা দেয় যখন ঘন কৃষ্ণ চুলের সিঁথিতে টকটকে লাল রঙের সিন্দুরের ফোঁটা দেখতে পায়। তখনই দড়ি ছিঁড়ে গৃহস্থের গোয়াল থেকে নিজেকে মুক্ত করে জান বাঁচাতে পালায়। বার বার আগুন লাগলে আমরা নিয়মমাফিক কিছু জ্ঞানগর্ভ সৎ কথাবার্তা বলি, তারপর আবার নিয়মমতই ভুলে যাই। অপেক্ষায় থাকি তেমন আরেকটি ঘটনার পুনরাবৃত্তি পর্যন্ত। আবার কথা বলতে। 

 

 

হাজার হাজার দোকানীর স্বপ্নসহ মালপত্র আগুনে ছাই হয়েছে। আগুন এতই খারাপ যে রোজা-রমজান বুঝল না, সামনে ঈদ-লক্ষ মানুষের খুশির কথা ভাবল না। এমন মহামূল্য অর্থ, যাকে আমরা বলি সকল অনর্থের মূল, তাও লোহার সিন্দুকের ভিতরে পুড়িয়ে ফেলল। আগুন লাগার খবরের পরই বলা শুরু হয়েছিল যে, ভবনটি ঝুকিপূর্ণ অনিরাপদ ছিল, ভেঙ্গে ফেলার জন্য নোটিশ করা হয়েছে। এই জায়গায় বহুতল ভবন তৈরির উদ্যোগও ব্যবসায়ীরা মামলা করে থামিয়ে দিয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি।

 

 

নোটিশেই যদি দায়িত্ব শেষ হয় আর বহুতল ভবনেই যদি সমাধা তা এতদিন করা হল না কেন? জবাব কে দেবে? কেউ বলছে এ জায়গার মালিক রেলওয়ে, কেউ বলছে সিটি কর্পোরেশন। আবার দোকানের মালিক যারা তারা অনেকেই এখানে ব্যবসা করেন না। দোকান ভাড়া দিয়ে আয় করছেন। দেশের অধিকাংশ দোকান মালিক অন্য মালিকের কাছে ভাড়া দিয়ে রাখেন। এইসব মার্কেটে কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয়। হয় রাজস্ব আদায় সরকারি-বেসরকারি। তহরী বা তোলা, যা ভদ্রস্থরূপে চাঁদা- তার ব্যবস্থাও বেশ ভাল। 

 

 

ঘরপোড়ার মধ্যে আলুপোড়া দিয়ে খাওয়ার লোকেরও অভাব নেই। পোড়া দোকানের আধাপোড়া, সিকি পোড়া যা কিছু বাকি আছে তা লুট করে নেওয়ার জন্য একদল ব্যস্ত হয়ে আছে। আইন রক্ষা বাহিনীর হস্তক্ষেপে শেষতক তা কমেছে। দোষারূপের উদ্যোগও বেশ ভাল চলছে। সরকারকে দায়ী করে বিভিন্ন মহল থেকে কথাবার্তা হচ্ছে। একদল ত দমকল বাহিনীকেই উপস্থিত শত্রুজ্ঞানে হামলা করে। পাশেই দমকল বাহিনীর হেড কোয়ার্টার ভাঙচুরও হয়।

 

 

ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষোভে যদি এমনটা হয়ে থাকে কিছু বলা বা করার নাই। কিন্তু কোনও মহল যদি এই সুযোগে অস্থিরতা সৃষ্টি করার চেষ্টা নিয়ে থাকে, তার সমুচিত বিধান হওয়া আবশ্যক। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা আকারে প্রকারে বিবিধ মন্তব্য সহযোগে আগুন লাগার ঘটনার ছবি প্রচার হচ্ছে। কেউ কেউ আবার এই সুযোগে ধর্মীয় হেদায়েত বিতরণ করছে। আমাদের বিবেচনায় এ সবই বালখিল্যতা, অবিলম্বে এসব অনাচার বন্ধ করা উচিত। 

 

 

বঙ্গবাজার দেশের তৈরি পোশাকের সাশ্রয়ী দামের অন্যতম বৃহৎ পাইকারী বাজার। আগুন লাগায় দোকানদার ব্যবসায়ী, দোকানের মালিক কর্মচারীদের ক্ষতি, বিপদ, আহাজারির করুণ দৃশ্য সামনে এসেছে। দেখা যায়নি এইসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যারা জড়িত আছে-সেই সব ক্ষুদ্র মাঝারি কাপড় ব্যবসায়ী,পোশাক প্রস্তুকারক এবং সংশ্লিষ্ট সকলের পরিবারের সদস্যদের। সরকার আশ্বস্ত করেছে পুড়ে যাওয়া দোকানীদের ঈদের আগেই ব্যবসা করার ব্যবস্থা করে দেবে।

 

 

মেয়রও প্রধানমন্ত্রীর বরাতে একই কথা বলেছেন, গতকাল প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সরেজমিনে এসে আশ্বাস পুনর্ব্যক্ত করেছেন। প্রায় ৬০০০ হাজারের বেশি দোকান বিনষ্ট হয়েছে। দোকান মালিক সমিতির পক্ষে হেলালউদ্দিন ৭০০ কোটি টাকা দাবী করেছেন। ঈদ সামনে রেখে মালিকপক্ষ অতিরিক্ত পুঁজি লগ্নি করেছেন- বিভিন্ন উৎস থেকে ধার দেনা করে, ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে,বাকিতে মাল সংগ্রহ করে।

 

 

পত্রিকার খবর থেকে জানা যায় খাতাপত্র পুড়ে গেছে তাই পাওনা-দেনা কোনটাই ঠিকভাবে উদ্ধারের কোনও সম্ভাবনা নাই। এই সঙ্গে কেউ ভাবছে না, যে সকল ক্ষুদ্র কারখানার মালিক বাকিতে মাল সরবরাহ করে অপেক্ষায় ছিলেন, ঈদের আগে বঙ্গবাজারের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা পেয়ে নিজের সন্তান, কারখানার কর্মী এদের ঈদের বেতন, বোনাস দিবেন, তাদের এখন কি হবে? 

 

 

সরকারী উদ্যোগে পুড়ে যাওয়া দোকান বা ব্যবসায়ীদের তালিকা করা হবে, সেই তালিকায় কি এই পথে বসা ছোট ছোট কারখানার মালিকদের নাম ওঠবে? সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আহমেদ বাবলু এ বিষয়ে বিস্তারিত বলেছেন। তিনি আগে এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার কারণে পেছনের অদৃশ্য দুর্ভাগাদের আসল অবস্থা তুলে ধরেছেন। বঙ্গবাজারের আগুনের তাপ নারায়ণগঞ্জেও এসে অনেক কারখানা মালিক-ব্যবসায়ীকে সর্বস্বান্ত করে দিয়েছে। দেওভোগ এবং নয়ামাটি এলাকার অনেক ব্যবসায়ী বঙ্গবাজারসহ সারা বাংলাদেশে তৈরি পোশাক সরবরাহ করে থাকেন। এই সঙ্গে তারাও ক্ষতিগ্রস্ত। 

 

 

আগুনে পোড়া এই মার্কেটের জায়গায় বহুতল ভবনের পরিকল্পনা অনেক আগে থেকেই করা হয়।  কিন্তু উদ্যোগ যথাযথভাবে কার্যকর করার কোনও চেষ্টা হয়নি। ঝুকিপূর্ণ ভবন ব্যবহার না করে ভেঙ্গে ফেলার নোটিশের মাধ্যমে এক পক্ষ দায়িত্ব শেষ করেছে।  আরেকপক্ষ আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে চুপ করে বসেছিলেন।  কিন্তু বাঁধা দূর করার চেষ্টা করেননি। ফলত শেষপর্যন্ত যা হবার তাই হলো। 

 

 

দোকানদারদের আশঙ্কা এখানে বহুতল ভবন হলে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা দোকান বরাদ্দ পাবেন না। পেলেও বিরাট অংকের টাকার জন্য সেই দোকান বরাদ্দ নিয়ে পুঁজির সংস্থান করে ব্যবসা চালাতে পারবেন না। তাই বহুতল ভবনের বিপক্ষে তারা অবস্থান নিয়েছেন। ঈদের আগে চৌকি বিছিয়ে দোকান করার ব্যবস্থা করার জন্য ব্যবসায়ীরা অনুরোধ করেছেন। তাদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিয়ে কমপক্ষে এইটুকু ব্যবস্থা করলেও ব্যবসায়ীরা অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার শেষ চেষ্টা করে দেখতে পারবেন। 

 

 

পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে হবে কি কারণে আগুন লেগেছে। যদি কারো অবহেলায় এমন হয়ে থাকে তার যথার্থ প্রতিবিধান করা আশু জরুরী। আগুন নেভাতে দমকল বাহিনীর গাফিলতি বা বিলম্বের দোহাই দিয়ে দোষারূপ করা হচ্ছে। বাস্তবতায় দেখা যায় যোগাযোগ ব্যবস্থার দূর্বলতার কারণে অগ্নি নির্বাপক গাড়ির চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তারপর পানির উৎস সহজলভ্য ছিল না। ভবিষ্যত পরিকল্পনায় সব কিছু বিবেচনায় নিয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দরকারী কাজগুলো করতে হবে।

 

 

সর্বাগ্রে দরকার যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আর্থিক প্রণোদনাসহ ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী এবং তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে ঘুরে দাঁড়াতে, নতুন করে ব্যবসা সংগঠনে সর্বতোভাবে অকুন্ঠ সহযোগিতার ব্যবস্থা করা । লাল ফিতার অহেতুক অযাচিত দীর্ঘসূত্রিতা যেন কোনওভাবেই প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিকতায় বিঘ্ন ঘটাতে না পারে সেদিকটা খেয়াল রাখতে হবে। আসন্ন ঈদে তারা যেন সামান্য খুশি থেকে বঞ্চিত না হয়।এন. হুসেইন/জেসি

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন