# উদ্বিগ্ন অভিভাবক মহল
# প্রশাসনের ব্যর্থতাকে দায়ী করছে সচেতন মহল
নির্মম ও নিষ্ঠুরভাবে স্বজনকে হত্যা বা হত্যার পর নিজে আত্মহত্যা করা, কিংবা হত্যা লাশ গুম করে ফেলা, পথচারীকে গাড়ি চাপা দিয়ে হত্যাসহ নানা ধরনের অপরাধের ঘটনা বেড়েছে। আবার অনেকেই আইন নিজের হাতে তুলে আধিপত্য ধরে রাখার জন্য মতের বিপক্ষ লোকদের হত্যা করতে কর্ণপাত করছেন না। আবার কেউ কেউ আইনকে তোয়াক্কা না করেই দিব্বি অপরাধ করে যাচ্ছে।
এদিকে আর এনিয়ে অপরাধ ও সমাজ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘটনার পর দ্রুত অপরাধী গ্রেফতার না হওয়া, বিচারে দীর্ঘসূত্রিতা, সামাজিক বন্ধনের অনুপস্থিতি, ইন্টারনেটের অপব্যবহার. অসহিষ্ণুতা, মাত্রাতিরিক্ত ক্ষোভ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রশাসনের কাছে হেনস্থার স্বিকার হওয়া, অর্থনৈতিক বৈষম্য, পরকীয়া সমস্যা, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয়ের চিত্র ফুটে উঠছে একের পর এক লোমহর্ষক ঘটনায়। তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা ঘটছে।
সাম্প্রতিক সময়ে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনা সমাজকে নাড়া দিয়েছে। সর্বত্র আলোচনা চলছে কেন এবং কি কারনে হত্যা সহ নানা অপরাধ বেড়েই চলছে। এতে করে প্রশাসন তাদের ব্যর্থতার দায় এড়িয়ে যেতে পারে কী না তা নিয়ে সর্বত্র প্রশ্ন উঠেছে।
সম্প্রতি সময়ে নারায়ণগঞ্জের কয়েকটি অপরাধের ঘটনা তুলে ধরা হলো, নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে আজিবপুর বাগানবাড়ী জাহাঙ্গীরের বাড়ির ভাড়া বাসায় ২৪ এপ্রিল ৭ বছর বয়সী শিশু আবদুল্লাহ তারই সৎ বাবার আরিফের হাতে খুন হন। এই ঘটনায় তার সৎ বাবা আরিফকে (৩২) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বুধবার (২৬ এপ্রিল) বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম মোস্তফা।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, মা স্বপ্না আক্তার ও সৎ বাবা আরিফের সঙ্গে সিদ্ধিরগঞ্জের জাহাঙ্গীরের বাসায় বসবাস করে আসছিল শিশু আবদুল্লাহ। গ্রেপ্তারকৃত সৎ বাবা আরিফ ২৪ এপ্রিল দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আবদুল্লাহকে বিভিন্ন অজুহাতে মারধর করতে থাকে। মারধরের একপর্যায়ে বাড়ির গলির রাস্তায় টাঙ্গানো মইয়ে তাকে ঝুলিয়ে মারধর করে ও উপর থেকে ফেলে দেয়।
পরে দুই পা ধরে শূন্যে ভাসিয়ে রেখে দেয়ালের সঙ্গে হত্যার উদ্দেশে মাথায় আঘাত করে গুরুতর জখম করে। পরে আবদুল্লাহর মা তাকে সেবা যত্ন করতে থাকে। রাতে আবদুল্লাহ জ্বরে কাঁপতে থাকলে মা তাকে ডাক্তারের কাছে নিতে চাইলে আরিফ বাধা দেয়। পরবর্তিতে আবদুল্লাহর অবস্থা আরও খারাপ হলে গত ২৫ এপ্রিল সকালে মাতুয়াইল মাতৃসনদ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেয়।
পরে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক আব্দুল্লাহকে মৃত ঘোষণা করেন। তখন সৎ বাবা আরিফ মৃত আবদুল্লাহ ও তার মাকে সিএনজিতে তুলে দিয়ে দাফন করার পরামর্শ দিয়ে চলে যায়। আবদুল্লাহর মা আরিফের কথা মতো আব্দুল্লাহকে তার আগের স্বামীর বাড়ি যাত্রাবাড়ীর কাজলারপাড় দাফন করেন।
এ ঘটনায় বুধবার (২৬ এপ্রিল) মৃতের মা স্বপ্না আক্তার বাদী হয়ে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। এ বিষয়ে সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম মোস্তফা জানান, এ ঘটনায় থানায় একটি মামলা হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
অপর দিকে ২৬ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে ৬ বছরের শিশু ভাতিজিকে ধর্ষণের অভিযোগে দায়েরকৃত মামলায় আমজাদ আলী (৫৫) নামে এক ব্যাক্তিকে গ্রেফতার করেছে থানা পুলিশ। বুধবার এলাকাবাসী তাকে ধরে গণপিটুনী দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করে। ধর্ষক আমজাদ আলী উপজেলার আড়াইহাজার পৌরসভার মুকুন্দি গাজীপুরা গ্রামের তাহের আলীর ছেলে।
জানা গেছে , শিশুটি ধর্ষক আমজাদ আলীর চাচাতো ভাইয়ের মেয়ে। সে স্থানীয় একটি মাদরাসায় পড়ালেখা করে। ২৩ এপ্রিলশিশুটি সমবয়সী শিশুদের সঙ্গে বাড়ীর পাশে খেলা করার সময় আমজাদ আলী তাকে ডেকে স্থানীয় একটি মার্কেটের ছাদে নিয়ে গিয়ে ভয় ভীতি দেখিয়ে জোরূর্বক ধর্ষণ করে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি গোপন রাখার জন্য শিশুকে চাপ প্রয়োগ করে।
শিশুটি প্রথমে বিষয়টি চেপে গেলেও পরে অসুস্থ হয়ে পড়লে বিষয়টি তার মাকে বলে দেয়। পরে শিশুর মা বাদী হয়ে ২৬ এপ্রিল আড়াইহাজার থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। আড়াইহাজার থানার ওসি মুহাম্মদ এমদাদুল ইসলাম তৈয়ব জানান, থানায় মামলা হয়েছে। গ্রেফতারকৃত আমজাদকে কোর্টে প্রেরণ করা হয়েছে।
এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই জেলার আড়াইহাজারে চাচীকে ধর্ষণের অভিযোগের মামলায় ভাসুরের পুত্র মো. ইয়ানুসকে হন(২৩) গ্রেফতার করে আড়াই হাজার থানা পুলিশ। বৃহস্পতিবার সকালে তাকে গ্রেফতার করা হয়। ইয়ানুস উপজেলার খাগকান্দা ইউনিয়নের ইসলামপুর গ্রামের হাবিবুল্লাহর ছেলে। মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায় যে, ওই গ্রামের দুবাই প্রবাসীর স্ত্রীকে (২৫) গত চার বছর ধরে বিভিন্ন সময়ে ভয় ভীতি দেখিয়ে ধর্ষণ করে আসছে ভাসুরপুত্র ইয়ানুস।
লোক লজ্জার ভয়ে ধর্ষিতা সম্প্রতি স্বামীর বাড়ী ছেড়ে তার পিত্রালয় একই ইউনিয়নের খাগকান্দা কান্দাপাড়া গ্রামে আশ্রয় নেয়। সর্বশেষ ২৩ এপ্রিল রাতে ইয়ানুস ধর্ষিতার পিত্রালয়ে গিয়েই তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আবারো তাকে ধর্ষণ করে। এ ব্যাপারে ধর্ষিতা নিজে বাদী হয়ে আড়াইহাজার থানায় বৃহস্পতিবার মামলা দায়ের করলে পুলিশ ইয়ানুসকে গ্রেফতার করে।
এর আগে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার দেওভোগ কাশিপুর বাংলা বাজার বাশমুলির এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ঘিরে আফজালকে (৪২) কুপিয়ে হত্যা করেছে প্রতিপক্ষ রাজু প্রধান বাহিনীর সন্ত্রাসীরা। ৬ এপ্রিল সকালে ফতুল্লা মডেল থানার দেওভোগ এলাকায় এ হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটে। নিহত আফজাল ফতুল্লা মডেল থানার পশ্চিম দেওভোগের বাংলা বাজার প্রধান বাড়ীর এবাদুলের ছেলে।
স্থানীয়রা জানায়, বেশ কয়েক মাস পূর্বে রাজু প্রধান বাহিনীর রাসেদকে হোন্ডা থেকে নামিয়ে আফজাল সহ বেশ কয়েক সন্ত্রাসী পিটিয়ে ও কুপিয়ে হাত- পা ভেঙ্গে দিয়েছিলো। সে সময়কার ঘটনার ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয় এবং মামলাও হয়েছিলো। সেই মামলায় আফজাল গ্রেফতার ও হয়। সেই হামলার প্রতিশোধ নিতেই ৬ এপ্রিল আফজালকে কুপিয়ে হত্যা করে রাজু প্রধান, রাসেল, রাসেদ সহ রাজু প্রধান বাহিনীর সন্ত্রাসীরা।
পুলিশ জানায় সকাল নয়টার দিকে নিহত আফজাল রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলো সে সময় রাজু বাহিনীর প্রধান রাজু প্রধান, রাসেল তার ভাই রাসেদ সহ ১০-১৫ জন সন্ত্রাসী তাকে রাস্তা থেকে তুলে হাসেমবাগ এলাকায় নিয়ে গিয়ে কুপিয়ে রক্তাক্ত জখম করে। আফজালের স্বজনেরা সংবাদ পেয়ে ঘটনাস্থলে এসে তাকে উদ্ধার করে শহরের জেনারেল (ভিক্টোরিয়া) হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করে।
আমরা নারায়ণগঞ্জবাসী সংগঠনের সভাপতি নুর উদ্দিন বলেন, এই ধরনের অপরাধের প্রবণতা থেকে পরিবারের অভিভাবক মহলের সচেতন হতে হবে। প্রশাসনের সাথে সামাজিক ভাবে অভিভাবক মহলকে এগিয়ে আসতে হবে। নগরবাসির মতে অপরাধ বেড়ে যাওয়ায় প্রশাসন তাদের ব্যর্থতার দ্বায় এড়িয়ে যেতে পারেন না। প্রশাসনকে সকলের সহযোগিতা করতে হবে। তাহলে সমাজে যদি অপরাধ কমানো যায়। এন.হুসেইন/জেসি


