৯ ঘণ্টা মেঘনা নদীতে ভেসে থাকার স্মৃতি মনে পড়লেই আঁতকে উঠছেন জোহরা
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ০৬ মে ২০২৩, ০৩:৩৪ পিএম
চলন্ত লঞ্চ থেকে পড়ে যাওয়ার পর ৯ ঘণ্টা খরস্রোতা মেঘনা নদীতে ভেসে থাকা জোহরা বেগমের (৩৮) পায়ের অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে। ঢাকার জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে তাঁর অস্ত্রোপচার করা হয়। চিকিৎসাধীন জোহরা এখন হাসপাতালের শয্যায় পায়ের যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন।
লঞ্চ থেকে পড়ে যাওয়া আর বেঁচে থাকার জন্য দীর্ঘ সময় নদীতে ভেসে থাকার দুঃসহ স্মৃতি মনে করে মাঝেমধ্যে তিনি আঁতকে উঠছেন। কখনো কখনো কাঁদছেন। জোহরা বেগম গোসাইরহাট থেকে ঢাকা যাওয়ার পথে বুধবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে ঠান্ডার বাজার এলাকায় মেঘনা নদীতে পড়ে যান।
৯ ঘণ্টা নদীতে ভেসে থাকার পর গতকাল সকাল সাড়ে ৭টার দিকে একটি নৌকার জেলেরা তাঁকে নদীর তীরবর্তী এলাকা থেকে উদ্ধার করেন। পরে কোস্টগার্ডের সদস্যরা তাঁকে উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে স্বজনদের কাছে বুঝিয়ে দেন। লঞ্চ থেকে পড়ে ওই নারীর বাঁ পা ভেঙে গেছে।
জোহরার স্বজনেরা বলেন, নদী থেকে উদ্ধার করার পর প্রথমে জোহরাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে চিকিৎসকদের পরামর্শে তাঁকে গতকাল বিকেলে ঢাকায় জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যাওয়া হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে রাতে তাঁর পায়ে অস্ত্রোপচার করা হয়। অস্ত্রোপচার শেষে জোহরাকে হাসপাতালের নারী রোগীদের জিএইচও ওয়ার্ডের ২৬ নম্বর শয্যা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ওই শয্যায় অন্য রোগী থাকায় জোহরাকে ক্যাজুয়ালিটি ১ নম্বর ওয়ার্ডের করিডরে রাখা হয়েছে।
জোহরার দেবর মাইদুল ইসলাম মৃধা মুঠোফোনে বলেন, ‘আমার ভাবি চলন্ত লঞ্চ থেকে পড়ে বাঁচার জন্য ৯ ঘণ্টা নদীতে ভেসে ছিলেন। কতটা প্রাণশক্তি থাকলে একজন নারী ভাঙা পায়ের যন্ত্রণা নিয়ে রাতে দীর্ঘ সময় নদীতে স্রোতে ভেসে থাকতে পারেন। তিনি শারীরিক যন্ত্রণার পাশাপাশি মানসিক ট্রমায় আছেন। তাঁকে নিবিড় পরিবেশে চিকিৎসা করা প্রয়োজন। কিন্তু হাসপাতালের জরুরি বিভাগের অপারেশন থিয়েটারের পাশের একটি ওয়ার্ডের করিডরে তাঁকে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।’
জোহরা বেগমের স্বামী জহিরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘তিন সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে নারায়ণগঞ্জে থাকি। গ্রাম থেকে নারায়ণগঞ্জে ফিরছিলাম। ফেরার পথে এমন একটি দুর্ঘটনার শিকার হতে হবে, তা বুঝতে পারিনি। জোহরা যেভাবে পানিতে ভেসে থেকে বেঁচে ফিরেছে, তা অবিশ্বাস্য।
আল্লাহর অশেষ রহমত, সে আমাদের কাছে বেঁচে ফিরেছে। বাঁ পায়ের যন্ত্রণায় (ব্যথায়) হাসপাতালের শয্যায় কাতরাচ্ছে। আর দুঃসহ ওই ঘটনার কথা মনে করে আঁতকে উঠছে, কিছু সময় পরপর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। তার এ দুর্ঘটনার খবর পেয়ে অনেক আত্মীয়স্বজন হাসপাতালে এসেছেন।’
কোস্টগার্ড ও পুলিশ জানায়, জোহরা বেগম শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলার কুচাইপট্টি ইউনিয়নের পশ্চিম বিষকাটালি গ্রামের জহিরুল ইসলামের স্ত্রী। স্বামী-সন্তানের সঙ্গে তিনি নারায়ণগঞ্জে থাকেন। গ্রামের বাড়িতে ঈদ করে বুধবার রাতে ঈগল-৩ লঞ্চে তিনি ঢাকায় যাচ্ছিলেন।
রাত সাড়ে ৯টার দিকে তাঁরা মাইঝাগা ঘাট থেকে লঞ্চে ওঠেন। সাড়ে ১০টার দিকে লঞ্চটি ঠান্ডাবাজার এলাকায় পৌঁছালে অসাবধানতাবশত তিনি লঞ্চের দ্বিতীয় তলা থেকে নদীতে পড়ে যান। অনেক খোঁজাখুঁজির পর স্বজনেরা জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন দিয়ে দুর্ঘটনার তথ্য জানান। পরে রাতে পুলিশ ও কোস্টগার্ডের সদস্যরা ওই গৃহবধূকে উদ্ধারে অভিযান চালান।
স্থানীয় লোকজন ও জেলেরা জানান, লঞ্চ থেকে পড়ার পর জোহরা নদীতে ভাসতে থাকেন। সারা রাত তিনি নদীতে ভেসে ছিলেন। স্রোতে তিনি এক কিলোমিটার ভাটিতে ঠান্ডাবাজারের কাছাকাছি চলে আসেন। সকাল সাড়ে সাতটার দিকে একটি নৌকার জেলেরা ওই নারীকে ভাসতে দেখে তাঁকে টেনে নৌকায় তোলেন। খবর পেয়ে কোস্টগার্ড তাঁকে উদ্ধার করে গোসাইরহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়। সেখান থেকে তাঁকে ঢাকায় পাঠানো হয়। এন.হুসেইন/জেসি


