‘না.গঞ্জবাসী ওসমান পরিবারকে ঘৃণা করে’ : এড. মাসুম
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৩, ০৭:৪৫ পিএম
# শুধু ত্বকী হত্যা নয়, এমন সকল হত্যকাণ্ডের বিচার চাই : রফিউর রাব্বি
# জড়িতদের অবিলম্বে তাদের বিচারের আওতায় আনা হোক : হালিম আজাদ
তানভীর মুহাম্মতদ ত্বকী হত্যার ১২২ মাস উপলক্ষে গতকাল সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের উদ্যোগে আলী আহাম্মদ চুনকা নগর মিলনায়তন প্রাঙ্গণে আলোক প্রজ্বালন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে। কর্মসূচি অনুষ্ঠানে নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি মানবাধিকার কর্মী এড. মাহবুবুর রহমান মাসুম বলেন, আজকে ১২২ মাস। ১২২ মাসে মানুষের বয়স বাড়ে না কমে ?
এই ১২২ মাসের মধ্যে আমরা আমাদের সন্তান ত্বকী হত্যার বিচার পেলাম না। আমরা চিৎকার করে বলি, আমার বক্তব্যের প্রারম্ভেই বলি ত্বকী হত্যার বিচার চাই। ত্বকী হত্যার বিচার করতে হবে। যেকোনো মূল্যে ত্বকী হত্যার বিচার হবে এই নারায়ণগঞ্জের মাটিতে। আজকে অত্যন্ত দুঃখ ও ভারাক্রান্ত মন নিয়ে বলি ত্বকী হত্যার বিচার তো দূরের কথা এই খুনি পরিবার ওসমান পরিবার। স্বামী আর স্ত্রী মিলে বলে বেড়ায় নাকি সাড়া নারায়াণগঞ্জের সবাই নাকি ওসমান পরিবার।
আমরা খুনি না, আমরা সন্ত্রাসী না, আমরা পরিবহন দস্যু না, আমরা র্যাবের দস্যু না তাহলে আমরা এই নারায়াণগঞ্জবাসী ওসমান পরিবার হলাম কেমন করে। সাহস কত? বুকের পাটা কত? বেশি বেশি বলতে বলতে নারায়াণগঞ্জকে এখন ওসমান পরিবার বানিয়ে ফেললেন তাহলে ওসমান নগর বানান না কেন? ওসমান নগর বানিয়ে দেখিয়ে দেন যে, আপনাদের ক্ষমতা অনেক বেশি।
এড. মাসুম আরো বলেন, ত্বকী হত্যার পরে পুলিশের র্যাবের কাছে ১৬৪ ধারায় দুই জন জবানবন্দি দিয়েছে। আমি দেখি নাই একজন আইনজীবী হিসেবে ১৬৪ তে আসামীর নাম আসলে সেই আসামী বাইরে থাকে কেমন করে। আজকে বাইরে নাই সারা নারায়াণগঞ্জে আছে অথচ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কোনো ভূমিকা রাখছে না। র্যাব কোনো ভূমিকা রাখছে না। আমি বলতে চাই, বাড়তে বাড়তে এমন জায়গায় চলে গেছেন শামীম ওসমান আপনি প্রধানমন্ত্রীর সাথে ছবি তোলেন।
ছবি তুলে আপনি নারায়াণগঞ্জবাসীদের জানান দেন কিচ্ছু করা যাবে না আপনার। কিচ্ছু করা যাবে যেতেই হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ওই খুনিদের সাথে আপনি ছবি তোলেন আমাদের আপত্তি নাই। ওই খুনিদের আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করান, বিচার হোক। বিচারে দোষী সাব্যস্ত হলে অবশ্যই রায় কার্যকর করতে হবে এটা আমার স্পষ্ট কথা। আজকে সর্বজায়গায় ওরা সারা নারায়াণগঞ্জকে জিম্মী করে রেখেছে।
এড. মাসুম বলেন, নারায়াণগঞ্জ ওসমান পরিবার নয় নারায়াণগঞ্জবাসী ওসমান পরিবারকে ঘৃণা করে এবং কোনো দিন নারায়াণগঞ্জবাসী ওসমান পরিবার হতে পারে না, কোনো খুনী নারায়ানগঞ্জবাসী হতে পারে না, কোনো ডাকাত নারায়াণগঞ্জবাসী হতে পারে না, কোনো দস্যু-ভূমিদস্যু নারায়াণগঞ্জবাসী হতে পারে না। আজকে সারা নারায়াণগঞ্জকে জিম্মী করে রেখেছেন এখন নারায়াণগঞ্জবাসী বানিয়ে দিচ্ছেন।
একটা কথাই বলে শেষ করতে চাই ত্বকী হত্যার বিচার চাই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সারা দুনিয়ায় ঘুরছেন ঘোরেন আমাদের কোনো সমস্যা নাই, আপনি আবার ক্ষমতায় আসতে চান আসেন আমাদের কোনো আপত্তি নাই, রাতে ভোট করেন, দিনে ভোট করেন আমাদের আপত্তি নাই জনগণ দেখবে। কিন্তু আমাদের কথা একটাই ত্বকী হত্যার বিচার চাই।
ত্বকী হত্যার বিচার হতে হবে। চঞ্চলের মা কাঁদে, বুলুর মা কাঁদে, আজকে তনু হত্যার বিচার হয় না, সাগর-রুনি আজকে কী অবস্থা মেঘ বড় হয়ে গেল, মেঘ ক্রিকেটার হয়ে গেল অথচ তার বাবা-মায়ের হত্যার বিচার পেল না। আরেকটা কথা হচ্ছে আমরা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন চাই না। আইনমন্ত্রী আপনি যেভাবে বেফাঁস কথাবার্তা বলেন ডিজিটাল আইন আপনি বাতিল করবেন না। সেদিন বেশি দূরে নাই বাতিল আপনাকে করতেই হবে।
ডিজিটাল আইন আপনি সংশোধন করবেন। আপনার সংশোধনকে অগ্রিম প্রত্যাখান করলাম আজকের সভা থেকে। আমরা ত্বকী হত্যার বিচার চাই, ত্বকী হত্যার বিচার করতে হবে। মাণনীয় প্রধাণমন্ত্রী চোখ খুলে দেখুন আপনার ঘরেও সন্তান আছে। আপনার ঘরেও অনেক সদস্য আছে শিশু আছে কিশোর আছে তাদের দিকে তাকিয়ে ত্বকী হত্যার বিচারের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করুন।
নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি ভবানী শংকর রায়ের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক শাহীন মাহমুদের সঞ্চালনায় কর্মসূচিতে বক্তব্য রাখেন, নিহত ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বি, নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটির সভাপতি এড. এবি সিদ্দিক, সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের সদস্য সচিব কবি সাংবাদিক হালিম আজাদ, সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের যুগ্ম আহ্বায়ক দৈনিক খবরের পাতার সম্পাদক এড. মাহাবুবুর রহমান মাসুম, মহিলা পরিষদের জেলা সভাপতি লক্ষ্মী চক্রবর্তী।
নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক সভাপতি এড. প্রদপি ঘোস বাবু, বাসদ জেলা আহ্বায়ক নিখিল দাস, সিপিবির শহর সভাপতি আবদুল হাই শরীফ, ন্যাপ জেলা সাধারণ সম্পাদক এড. আওলাদ হোসেন, গণসংহতি আন্দোলন জেলার সমন্বয়ক তরিকুল সুজন সামাজিক সংগঠন সমমনার সাবেক সভাপতি দুলাল সাহা, প্রগতী লেখক সংঘের জেলা সভাপতি জাকির হোসেন ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির জেলা সংগঠক রাশিদা আক্তার।
অনুষ্ঠানে সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের আহবায়ক ও নিহত ত্বকীর পিতা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বি বলেন, আমাদের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রের চোখে সকল নাগরিকের সমান অধিকার রয়েছে কিন্তু তা মানা হচ্ছেনা। যদি দেশের সকল নাগরিক সমান অধিকার পায়। তাহলে তাদের বিচার পাবারও সমান অধিকার রয়েছে।
কিন্তু সরকারের চোখে সরকারি দলের লোকজন একভাবে গুরুত্বপূর্ণ আর অন্য যারা দেশের সকল নাগরিক গুরুত্বহীন। আর সে জন্যই দেশে সংগঠিত অপরাধগুলোর বিচার হয় না। এবং এই সরকার এই বিচার ব্যবস্থাকে শুধু প্রশ্নবিদ্ধ করে নাই সংবিধানের গণতান্ত্রিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ভূলন্ঠিত করেছে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে হরণ করেছে।
রফিউর রাব্বি আরো বলেন, আমি বলতে চাই এই শাসক গোষ্ঠী তারা কি আয়নার সামনে দাঁড়ায় না। তাদের চেহারা তারা দেখে না ? কিভাবে তারা মিথ্যাচার করে। তারা এতটাই নির্বোধ যে জনগণকে মনে করে বোকা। যা তারা বলবে জনগণ তাই বিশ্বাস করবে। আমরা এখানে শুধু ত্বকী হত্যার বিচারের দাবী নিয়ে দাঁড়াই না। অন্যায়ভাবে যাদেরকে হত্যা করা হয়েছে আমরা তাদের বিচার চাই।
আমরা সাগর-রুনিসহ সকল সাংবাদিক হত্যার বিচার চাই। তনুসহ সকল গুম-খুনের বিচার চাই। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিচারহীনতা থাকতে পারে না। আপনারা বলেন সংবিধানের বাইরে একচুল পরিমান বাইরে যাবার সুযোগ নাই। তাহলে সংবিধান অনুযায়ী মানুষের যে অধিকার গুলো সেগুলো আপনারা পদদলিত কেন করেন ? সংবিধানের দোহাই দেন শুধু ক্ষমতায় থাকার জন্য। এই সংবিধান কি আপনাকে ক্ষমতায় রাখার রক্ষা কবচ ?
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সম্পর্কে তিনি বলেন, এই আইন থাকবে না। আপনারা থাকেন বা না থাকেন এই কালো আইন থাকবে না। এই আইন পৃথিবীর কোথাও নাই। এই আইন স্বাধীন দেশে টিকবে না। এই আইন বলবৎ থাকলে আপনাদের প্রত্যেককে জেলে যেতে হবে, এই কারাগার এই আওয়ামীলীগ শাসক গোষ্ঠী দ্বারা পূর্ণ হবে।
সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের সদস্য সচিব কবি ও সাংবাদিক হালিম আজাদ বলেন, আপনারা ইতিমধ্যে জেনেছেন যে ত্বকী হত্যার ১০ বছর পূরণ হতে যাচ্ছে। এই হত্যাকাণ্ডের পিছনে যে ঘটনা ঘটেছে কারা ত্বকীকে হত্যা করেছিলো এই কথা আমরা বিভিন্ন সমাবেশে এবং সাংস্কৃতিক প্রেগ্রামে বার বার বলে এসেছি।
কিন্তু আবারো আজকে বলতে চাচ্ছি যে ত্বকীকে হত্যা করার পরে র্যাব যে তদন্ত করে একটা রিপোর্ট প্রকাশ করেছিলো সে কথা বার বারই বলেছিলাম যে ত্বকীকে অপহরণ করা হয়েছিলো শামীম ওসমানের বুদ্ধিতে তার ভাতিজা কয়েকজনকে নিয়ে ত্বকীকে হত্যা করে নদীতে লাস ফেলে দিয়েছিলো। এই ঘটনা তদন্ত করে জাতির সামনে প্রকাশ করেছিলো এটা আমাদের কোন কথা নয়।
তারপরও আমরা লক্ষ্য করছি র্যাবের এই তদন্ত রিপোর্টের পরেও সরকার কোন বক্তব্যে রাখছে না। ত্বকী হত্যার জন্য র্যাব যে দায়িত্ব নিয়েছে র্যাবের সেই দায়িত্বকারী যারা আছে তারা কোন কথা বলছে না এবং কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না। ত্বকীকে হত্যাকারীরা এই নারায়ণগঞ্জের একটি রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য।
আজমীর ওসমানসহ তার সহযোগীরা ত্বকীকে হত্যা করে ওর লাশ নদীতে ফেলে দিয়েছিলো। এ কথা আমরা বলছিনা। এগুলা বারবার পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এই হত্যার চুড়ান্ত তদন্ত হচ্ছে না বিচারের কোর অগ্রগতি আমরা দেখছি না। এই হত্যাকারীদের সরকার রক্ষা করতে চায়। যে পরিবারটি ত্বকীকে হত্যা করেছে তারা শুধু তাকেই হত্যা করেনি আরও অনেককে হত্যা করেছে একটারও বিচার হয়নি একে একে ১৭ টি সন্তানকে তারা হত্যা করেছে আজমীর ওসমানের নেতৃত্বে।
এই আজমেরী ওসমান ও তার পরিবারের রাজনৈতিক কর্মকর্মারা আছেন কিভাবে ক্ষমতায় যেতেন কিভাবে অরাজকতা সৃষ্টি করে তারা সংসদ সদস্য হয়েছেন এ কথা এদেশের মানুষ জানে। আমাদের বক্তব্যে হচ্ছে র্যাবের যে তদন্ত হয়েছে তদন্তকে আরও অগ্রগতি করে, কারা কারা জড়িত আছে অবিলম্বে তাদের বিচারের আওতায় আনা হোক।
উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের ৬ মার্চ নগরীর শায়েস্তা খাঁ রোডের বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী। দু’দিন পর ৮ মার্চ শীতলক্ষ্যা নদীর কুমুদিনী খাল থেকে ত্বকীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই বছরের ১২ নভেম্বর আজমেরী ওসমানের সহযোগী সুলতান শওকত ভ্রমর আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে জানায়, আজমেরী ওসমানের নেতৃত্বে ত্বকীকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়।
৫ মার্চ ২০১৪ তদন্তকারী সংস্থা র্যাব সংবাদ সম্মেলন করে জানায়, নারায়ণগঞ্জের ওসমান পরিবারের নির্দেশে তাদেরই টর্চারসেলে ১১ জন মিলে ত্বকীকে হত্যা করেছে। অচিরেই তারা অভিযোগপত্র আদালতে পেশ করবে। কিন্তু সে অভিযোগপত্র আজও আদালতে পেশ করা হয় নাই। ত্বকী হত্যার পর থেকে বিচার শুরু ও চিহ্নিত আসামীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে প্রতি মাসের ৮ তারিখ আলোক প্রজ্বালন কর্মসূচি পালন করে আসছে নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোট।
এস.এ/জেসি


