Logo
Logo
×

বিশেষ সংবাদ

নাটকীয়তার মধ্যে নবীগঞ্জে সড়কের দু’পাশের স্থাপনা উচ্ছেদ

Icon

লতিফ রানা

প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৩, ০৯:২৩ পিএম

নাটকীয়তার মধ্যে নবীগঞ্জে সড়কের দু’পাশের স্থাপনা উচ্ছেদ
Swapno

 

# পথে বসেছে প্রায় ৪৫ পরিবার, প্রায় দেড়কোটি টাকার ক্ষতি
# সমন্বয়ের মাধ্যমে অভিযান হলে ক্ষতির পরিমান কম হতো : এহসান চেয়ারম্যান

 

 

বেশ কিছুদিন যাবৎই বন্দর উপজেলার মদনপুর-মদনগঞ্জ সড়কের নবীগঞ্জ চৌরাস্তা এলাকার দুই পাশের স্থাপনা উচ্ছেদ নিয়ে বিভিন্ন নাটকীয় ঘটনার মঞ্চস্থ হয়েছে। বীর মুক্তিযোদ্ধা নাসিম ওসমান (তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতু) সেতটিু উদ্বোধনের পর এই সড়কটি প্রশস্থকরণ কাজ শুরু হলে সড়ক ও জনপথ (সওজ) নারায়ণগঞ্জের উদ্যোগে এখানকার স্থাপনাগুলে বেশ কয়েকবার ভাঙ্গা-গড়ার মাধ্যমে একটু একটু করে দূরে সরিয়ে নেওয়া হয়।

 

সর্বশেষ সওজের চাহিদার চেয়েও বেশকিছু বেশি পরিমান জায়গা রেখে তারা এসব স্থাপনা পুনঃনির্মাণ করেন বলে জানান তারা। এরই মধ্যে এখানকার লীজকৃত জমির সীমানা নিয়ে স্থানীয় কয়েকটি পক্ষের রেলওয়ে ও সওজের সাথে বাধানুবাদ তৈরি হয়। বিষয়টি নিয়ে এরই মধ্যে মামলা পাল্টা মামলা, এবং কোর্ট থেকে স্থগিতাদেশও আনা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়। সর্বশেষ সবকিছুর মধ্যে জল ঢেলে দিয়ে এই এলাকায় সড়কটির আশে পাশের স্থাপনা ভেকু দিয়ে প্রায় ৪৫টির মতো দোকানপাট ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেওয়া হয়।

 

আর এতে করে কমপক্ষে দেড় কোটি টাকার ক্ষতিসহ এই ৪৫টি পরিবার পথে বসেছে বলে আর্তনাদ করছেন তারা। ভাঙ্গার কাজ শুরু করার পূর্বে এক ঘন্টা সময় চেয়েও তারা পাননি বলে অভিযোগ করেন ব্যবসায়ীরা। পুলিশের ভয়ে কোন প্রতিবাদ করতে না পেরে বসে বসে নিজেদের সর্বনাশ দেখতে হয়েছে বলেও জানান তারা। অন্যদিকে স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে এই উচ্ছেদের অভিযান পরিচালনা করলে এই হতদরিদ্র পরিবারগুলোর ক্ষতির পরিমান সিংহভাগই কমে যেতো বলে মনে করেন স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এহসান উদ্দিন আহমেদ।

 

গতকাল সোমবার বন্দরের নবীগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড এলাকার মদনগঞ্জ-মদনপুর সড়কের দুই পাশের স্থাপনা উচ্ছেদে অভিযান চালিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। সকাল দশটা থেকে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত বাংলাদেশ রেলওয়ের ডিভিশনাল এস্টেট অফিসার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মো. শফিউল্লাহর নেতৃত্বে এবং নারায়ণগঞ্জ জেলার সিনিয়র সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট আরাফাত মোহাম্মদ নোমানের সহযোগিতায় ছয় সদস্যর একটি প্রতিনিধি দল এই অভিযান কার্য পরিচালনা করেন।

 

এই টিমের সাথে নিরাপত্তার বিষয়ে সহযোগিতা করেন রেলওয়ে পুলিশের স্পেশাল ফোর্স, বন্দর থানা এবং জেলা পুলিশের একটি বিশেষ দল। এ সময় প্রায় ৪৫টি দোকানঘর ভেকুর সাহায্যে ভেঙ্গে ফেলা হয়। এই অভিযানে এখানকার অস্থায়ী ব্যবসায়ীরা প্রায় দেড় কোটির টাকার মতো ক্ষতির শিকার হয়েছেন বলে ভূক্তভোগীদের অভিযোগ।

 

ভূক্তভোগী ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, মদনপুর-মদনগঞ্জ সড়কটি প্রসস্থ করার উদ্যোগ নেয় সরকার। এর ফলে এর আগে সড়ক ও জনপথের (সওজ) মাধ্যমে নবীগঞ্জ এলাকায় সড়কের দুই পাশে মার্কিং করে এখানে অস্থায়ীভাবে গড়ে তোলা স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। সে অনুযায়ী এখানকার ব্যবসায়ীরা তাদের স্থাপনা সরিয়ে নিয়ে নতুন করে দোকান তৈরি করে তারা। কিন্তু তার কিছুদিন পরই আবারও নতুন মার্কিং করে আরও জায়গা খালি করে নির্দেশ দেন সওজ। পরে ব্যবসায়ীরা আবারও তাদের স্থাপনা সরিয়ে নিয়ে আবারও নতুন করে স্থাপনা তৈরি করে তারা।

 

কিন্তু গত কিছুদিন যাবত আবারও এসব স্থাপনা স্থায়ীভাবে সরিয়ে নেওয়ার জন্য মাইকিং করে বাংলাদেশ রেলওয়ে বিভাগ এবং সেই মাইকিং অনুুযায়ীই গতকাল সোমবার এই উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। এই সময় উচ্ছেদের সকল প্রকার প্রস্তুতি নিয়ে আসে বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। অভিযানে সড়কের দুই পাশের প্রায় ৪০ থেকে ৪৫টি দোকানঘর ভেকু দিয়ে গুড়িয়ে দেওয়া হয়। এসময় রাস্তার উপর অনেক দোকানের মালামাল পড়ে থাকতে দেখা যায়। খাবার দোকানসহ অনেক দোকান পাটের ব্যাপক মালামাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

 

এই বিষয়ে রাস্তার পূর্ব পাশের দোকানের লীজপ্রাপ্ত মালিক নাজির মিয়া জানান, তিনি এখানে কৃষি কাজে ব্যবহারের জন্য রেলওয়ে থেকে ৪ শতাংশ জায়গা লীজ এনেছেন। এই স্থাপনা উচ্ছেদ না করার জন্য জজকোর্ট থেকে অস্থায়ী আদেশ নিয়ে এসেছেন এবং হাইকোর্টেও একটি রীট করেছেন। সেই কাগজপত্র তিনি উচ্ছেদ অভিযানের নেতৃত্ব প্রদানকারী ম্যাজিস্ট্রেটকে দেখালেও তিনি তা আমলে নেননি। এর আগে এই কয়েক মাসের ব্যবধানে সড়ক ও জনপথের নির্দেশে একই দোকান বেশ কয়েবার ভাঙ্গা হয় এবং তৈরি করা হয়।

 

ফলে আর্থিকভাবে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এখানকার গরীব দোকানদাররা। তারপরও সুদ ও ধারে টাকা নিয়ে আবারও দোকানগুলো পুনঃনির্মাণ করেন। কিন্তু এখন আবারও তা ভেঙ্গে দেওয়ায় এই দুঃসময়ে তারা মারাত্মক সংকটে পড়বে। তখন সওজ আমাদের বলেছে রাস্তা প্রশস্তকরণের জন্য যা প্রয়োজন সেই পরিমান জায়গা তারা নিয়েছে। ভবিষ্যতে রাস্তাটি আরও প্রশস্ত করা হলে তখন হয়তো আবারও সরিয়ে নেওয়ার লাগতে পারে আপাতত আর ভাঙার প্রয়োজন পড়বে না।

 

বন্দর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এহসান উদ্দিন আহমেদ বলেন, এখানে যে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে তাতে আমার প্রায় দশ বারো লাখ টাকার মতো ক্ষতি হয়েছে। সরকারের জায়গা প্রয়োজনে যেকোন সময় সরকার নিয়ে নিতে পারে, এতে কারো কোন কিছু বলার থাকবে না। এখানে যে ভাঙচুর করা হয়েছে তার আগে এখানে মাইকিংও করা হয়েছে বলে শুনেছি। কিন্তু এর আগেও বিভিন্ন সময় মাইকিং করা হয় এবং অল্প অল্প করে বেশ কয়েকবার দোকানপাট ভেঙ্গে জায়গা নিয়েছে সওজ।

 

কিন্তু যেহেতু এমন ব্যাপকভাবে ভাঙচুর করবে তাই বিষয়টি শুধু মাইকিং নয়, আমাদের উপজেলা প্রশাসন, থানা প্রশাসন, আমাদের ইউনিয়ন পরিষদের স্থানীয় সরকার প্রশাসন এবং আমাদের জনপ্রতিনিধিদের চিঠি দেওয়া দরকার ছিল। তাদের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়ে দুএকবার সতর্ক করা দরকার ছিল। এরমধ্যে এসব স্থাপনা সরিয়ে নেওয়া নাহলে কারও পক্ষে আটকানো সম্ভব না বলে জানানো যেতো। বিষয়টা যদি শক্তভাবে সতর্ক  করা হতো তাহলে প্রত্যেকেই নিজেদের মতো করে স্থাপনা সরিয়ে নিতো।

 

এখন এখানকার ক্ষুদে ব্যবসায়ীরা প্রায় দেড় থেকে দুই কোটি টাকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখানে যারা আছে তারা খুবই সাধারণ পরিবারের মানুষ। এত টাকার ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার অবস্থা এদের কারও পক্ষে সম্ভব না। এরই মধ্যে করোনা মহামারি ও বর্তমানে রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে জনগণ খুব চাপে আছে। আমরা এখনও সেসব বৈরী পরিবেশ থেকে উত্তরণ করতে পারিনি। অনেকেই ধার দেনাসহ বিভিন্ন এনজিও থেকে টাকা কিস্তি উত্তোলন করে এই সব ব্যবসা দাঁড় করিয়েছেন।

 

সম্প্রতি সময় আরও বেশ কয়েকবার ভাঙচুরের শিকার হয়েছে তারা। তাই এই ভাঙচুরের আগে স্থানীয় জনপ্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের চিঠি ইস্যু করার মাধ্যমে তাদের সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা নিজেরা যদি এসব সরিয়ে নিতো তাহলে এই ক্ষতির পরিমান অনেক কম হতো। এখন ভেকু দিয়ে ভাঙ্গার ফলে এগুলো সব মালামালই ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। আমি না হয় আমার জায়গা সম্পত্তি বিক্রি করে আবার দাঁড় করাতে পারবো।

 

কিন্তু যারা বিভিন্ন জায়গা থেকে ধার-দেনা করেছে তারা কিভাবে তা পরিশোধ করবে, নিজেদের পরিবার পরিজন নিয়েই বা কিভাবে চলবে? এগুলো আমাদের বিবেচনা করতে হবে। আমাদের সমন্বয়হীনতার কারণেই অনেক সময় এমন বড় ধরণে ক্ষতি হয়ে যায়।

এস.এ/জেসি

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন