# এতো দুর্ঘটনার পরেও সচেতনতা বাড়েনি
# অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার তাগিদ দেয়া হয়েছে : ফায়ার সার্ভিস
নারায়ণগঞ্জে গ্যাস বিস্ফোরণসহ বিভিন্ন অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা বেড়েই চলছে। জেলার বিভিন্ন স্থানে একের পর এক বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। যা নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে ভাবিয়ে তুলেছে। এসব ঘটনার মধ্যে ফতুল্লার পশ্চিম তল্লার একটি মসজিদে গ্যাস বিস্ফোরণে ৩৭ জন নিহত এবং রূপগঞ্জের সেজান জুস কারখানার ৫২ জন নিহতের ঘটনা এখন পর্যন্ত ভুলতে পারেনি তাদের স্বজনসহ নারায়ণগঞ্জবাসী।
নারায়ণগঞ্জ জেলার বিভিন্ন এলাকায় গত ২০২০ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় আগুনে দগ্ধ হয়ে কয়েকশত লোকের প্রাণ হানি ঘটেছে বলে বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে। এসব ঘটনার বেশিরভাগই অবহেলা জনিত কারণে হয়েছে বলে বিভিন্ন মাধ্যমের সংবাদ বিশ্লেষণ করে জানা যায়। আর এসব ঘটনার বেশিরভাগ প্রাণহানি আহতবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হয়েছে বলেও জানা যায়।
এসব ঘটনা তিতাসের পাইপ লিকেজ, গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ, কেমিক্যাল কারখানায় অসাবধানতা, বয়লার বিস্ফোরণ জনিত কারণে হলেও এরমধে কারখানাগুলোতে হতাহতের সংখ্যা বৃদ্ধিতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কর্তৃপক্ষের গাফলতি বলে বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগ পাওয়া যায়। আর এসব ক্ষেত্রে প্রশাসনের জোরালো কোন ভূমিকা থাকায় এবং প্রকৃত দোষীরা প্রাপ্য শাস্তি না পাওয়ায় এসব ঘটনা বৃদ্ধিসহ হতাহতের সংখ্যা এভাবে বেড়ে চলছে বলে সচেতন মহলের ধারণা।
এরমধ্যে শুধুমাত্র ২০২২ সালেই ১০৪টি গ্যাস বিস্ফোরণের অগ্নিকাণ্ড ঘটে। যার ৬৯টি তিতাসের লাইনের ত্রুটিতে এবং ৩৪টি বিস্ফোরণ ঘটেছে রান্নাঘরের গ্যাস সিলিন্ডার, বয়লার কিংবা এসি বিস্ফোরণের কারণে। অন্যদিকে ২০২১ সালে ১১৪টি গ্যাস বিস্ফোরণের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। যার ৯৬টি তিতাসের লাইনের ত্রুটিতে এবং ১৮টি বিস্ফোরণ ঘটেছে রান্নাঘরের গ্যাস সিলিন্ডার, বয়লার কিংবা এসি বিস্ফোরণের কারণে (সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক)। তবে এসব ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে যে মৃত্যুর সংখ্যা পুলিশ প্রশাসনের তারিকায় রেকর্ড করা হয় বাস্তবে তার সংখ্যা আরও ভয়াবহ। কারণ চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুর বেশিরভাগই তাদের তালিকায় লিপিবদ্ধ হয় না বলে জানা গেছে।
গত বৃহস্পতিবার নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার গাউছিয়া সাউঘাট এলাকার ‘আরআইসিএল স্টিল মিলে’ লোহা গলানোর ভাট্টিতে বিস্ফোরণ হয়। বিস্ফোরণে গলিতো তরল লোহা শ্রমিকদের ওপর ছিটকে পড়লে গুরুতর দগ্ধ হন ৭ জন। হাসপাতালে নেওয়ার পথেই মারা যান শংকর (৪০) নামে একজন। এরপর সর্বশেষ খবর অনুযায়ী চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় আরও তিনজন। বাকি তিনজনের মধ্যে দুইজনের অবস্থাও আশঙ্কাজনক বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে।
এর আগে ২০২০ সালের অক্টোবরেও রূপগঞ্জ উপজেলার বরাপো এলাকায় প্রিমিয়ার স্টিল অ্যান্ড রি-রোলিং মিলের (পিএসআরএম) লোহা গলানোর ভাট্টিতে (পাত্র) বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। সে সময় গলিত লোহা গায়ে পড়ে গুরুতর দগ্ধ হয় ছয় শ্রমিক। তাদের মধ্যে একজন ঘটনাস্থলেই মারা যায়। পরে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও তিন শ্রমিকের মৃত্যু হয়।
এর আগে গত ১৮ মার্চ নারায়ণগঞ্জ শহরের ব্যস্ততম এলাকা নিতাইগঞ্জে পুরানো একটি দোতলা ভবনে বিস্ফোরণের ঘটনায় আওলাদ (৪০) নামে এক শ্রমিকের মৃত্যুসহ গুরুতর আহত হয় বেশ কয়েকজন। সেখানেও চিকিসাধীন অবস্থায় ইকবাল নামের এক নিরাপত্তা কর্মী ও শাহজাহান নামের আরেক শ্রমিক মারা যায়। পরে ক্ষতিগ্রস্থ দ্বিতল ভবনটি এক্সেভেটর দিয়ে ভেঙে ফেলে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন।
গত ১২ মার্চ মাসদাইর শোভন গামের্ন্টসের সামনে খন্দকার ম্যানশনের ষষ্ঠ তলার ফ্ল্যাটে গ্যাস লিকেজ থেকে সিলিন্ডার বিস্ফোরণে কুলসুম বেগম (২৫) ও তার ৩ বছর বয়সী ছেলে খালিদ দগ্ধ হয়। তাদের শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ণ ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। গত ৩ মার্চ রূপগঞ্জের অন্তিম নিটিং ডাইং অ্যান্ড ফিনিশিং লিমিটেড নামে একটি কারখানায় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নেভাতে সক্ষম হয়।
সে সময় কারখানার একটি দেয়াল ভেঙে পাশের রাস্তায় গিয়ে পড়ে। অবশ্য সেদিন ছুটির দিন থাকায় কারখানায় কোন হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। ২ মার্চ রূপগঞ্জের ভূলতা এলাকার নান্নু স্পিনিং মিলে সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ডে ফায়ার সার্ভিসের ১৪টি ইউনিটের প্রচেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। একই দিনে আড়াইহাজারের দুপ্তারা এলাকার এইচপি কেমিক্যাল কারখানায় অগ্নিকাণ্ড ঘটে। সেই আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে ফায়ার সার্ভিসের ৯টি ইউনিট কাজ করে।
গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ফতুল্লা রামারবাগের একটি বাসায় বিস্ফোরণের পর অগ্নিকাণ্ড ঘটে। সেই ঘটনায় আল আমিন সিকদার (৩০) তার স্ত্রী সুখী আক্তার (২৫), আলেয়া বেগম (৬৫) তার ছেলে জামাল (৪৫) এবং রাজমিস্ত্রী রফিক (৩৫) নামের পাঁচজন দগ্ধ হয়। ৭ ফেব্রুয়ারি রাতে সদর উপজেলার জালকুড়ির পশ্চিমপাড়া ঝুটপট্টি এলাকায় ঝুটের গোডাউনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় শাহজালাল (৫২) নামের এক শ্রমিকের মৃত্যু হয়।
২ ফেব্রুয়ারি ভোরে শহরের খানপুর এলাকায় অবস্থিত বিদ্যুতের পাওয়ার সাপ্লাই স্টেশনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। মণ্ডলপাড়া ও হাজিগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের পাঁচটি ইউনিট প্রায় দেড় ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। নারায়ণগঞ্জের অগ্নিকাণ্ডের সবচেয়ে বড় ট্রাজডি হিসেবে পরিচিত ২০২১ সালের সেজান জুস কারখানার অগ্নিকাণ্ড এবং ২০২০ সালের তল্লা ট্র্যাজেডি। ২০২১ সালে ৮ জুলাই বিকেলে রূপগঞ্জে অবস্থিত সেজান জুস কারখানায় সৃষ্ট অন্যতম ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৫২ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।
এই ঘটনায় প্রায় অর্ধশতাধিক শ্রমিক আহত হয় বলেও জানা যায়। সে সময় আগুন থেকে বাঁচতে লাফিয়ে পড়ে প্রথম দিনই স্বপ্না রানী (৪৪), মিনা আক্তার (৩৪) ও মোরসালীন (২৮) নামের তিনজন শ্রমিকের মৃত্যু হয়। ফায়ার সার্ভিসের রূপগঞ্জের কাঞ্চন, ডেমরা, আদমজী, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ স্টেশন থেকে ১৮টি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নেভানোর কাজ চালায়। তারপরও একদিনের চেষ্টায় সেই আগুন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে ২০২০ সালের ৪ সেপ্টেম্বর ফতুল্লার পশ্চিমতল্লা এলাকার বাইতুস সালাত জামে মসজিদে জমে থাকা গ্যাস থেকে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। সেই ঘটনায় দগ্ধ অবস্থায় ৩৭ জনকে জাতীয় শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৩৪ জন মারা যায়।এভাবে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক এধরণের অস্বাভাবিক বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ভাবিয়ে তুলছে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে।
এসব ঘটনায় একদিকে জনগণের অসচেতনতা, কর্তৃপক্ষর গাফিলতি এবং দায়ী ব্যক্তিগণের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাগ্রহণ না করাকে দায়ী করেন সচেতন মহল। এতে করে একদিকে বেড়ে চলছে নিহতের ঘটনা তার সাথেই তাল মিলিয়ে বেড়ে চলছে আহতের সংখ্যা। সচেতন মহলের মতে অগ্নিকাণ্ড সৃষ্টি এবং তাতে হতাহতের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য আমাদের আরো অনেক বেশি সচেতন হতে হবে। অন্যথায় আমাদের একটু ভুলের জন্য পুরো পরিবার শেষ হয়ে যাবে।
এই বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস এবং সিভিল ডিফেন্স এর উপ সহকারী পরিচালক ফখর উদ্দিন আহাম্মদ বলেন, এখানে যেসব অগ্নিকাণ্ডগুলো ঘটে তার বেশিরভাগই বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট এবং গ্যাস বিস্ফোরণজনিত কারণে ঘটে। তাছাড়া পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগ কারখানায়ই অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকে, কিন্তু ছোটখাট প্রতিষ্ঠানসহ অন্যান্য কলকারখানায় এই ব্যবস্থার অভাব আছে। আমরা আশা করি প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠান এই বিষয়টিতে নজর দিবেন এবং অগ্নি প্রতিরোধে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণসহ নিয়মিত মহড়ার মাধ্যমে অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করবেন।
এস.এ/জেসি


