Logo
Logo
×

বিশেষ সংবাদ

মাদক সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি বন্দরবাসী

Icon

লতিফ রানা

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৩, ০৬:১৩ পিএম

মাদক সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি বন্দরবাসী
Swapno

 

# পুলিশের সোর্সেরাও এসব সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত বলে অভিযোগ
# গত ৫ মাসের দায়ের হওয়া ২২৩টি মামলার মধ্যে ১১৯টিই মাদকের মামলা
# পুলিশের সাথে সাথে স্থানীয়দেরও ভূমিকা রাখতে হবে : ওসি বন্দর

 

 

নারায়ণগঞ্জের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হিসেবে পরিচিত বন্দর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় মাদকে নিমজ্জিত হয়ে ধ্বংসের দিকে ধাবিত হচ্ছে যুব সমাজ। এতে বন্দরের মদনপুর, ধামগড়, মুসাপুর, বন্দর ও কলাগাছিয়া ইউনিয়নসহ বন্দরে অবস্থিত নাসিকের ৯টি ওয়ার্ডের অলিগলিতে ছেয়ে গেছে মাদকের রমরমা ব্যবসা। এসব মাদক এখন প্রকাশ্যে সেবন এবং বিক্রি হলেও এই সিন্ডিকেটের সাথে কথিত প্রভাবশালী নেতা ও রাঘববোয়ালরা জড়িত থাকার কারণে তাদের বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করতেও সাহস পাচ্ছে না বলে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ।

 

এরই মধ্যে মাদকের এ ধরণের সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে অনেকেই প্রাণ হারানোসহ মারধর ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন প্রতিবাদ কারীরা। তাছাড়া বন্দর থানায় প্রতিনিয়ত যে মামলা দায়ের হচ্ছে তার সিংহভাগই মাদক মামলা বলে জানা গেছে। চলতি বছরের গত ৫ মাসে বন্দর থানায় দায়ের করা মোট মামলা ২২৩টির মতো। যার মধ্যে ১১৯টিই হয়েছে মাদক মামলা। এতে অনেকটাই হতাশা ও আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন অভিভাকসহ স্থানীয় সুশীল সমাজ।

 

অন্যদিকে এসব মাদক প্রতিরোধে স্থানীয় যেসব কমিটি গঠন করা হয় তার মধ্যে মাদক কারবারীরাও দায়িত্বে থাকে বলে জানা যায়। তাছাড়া মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের কোন অভিযানের আগেই প্রকৃত মাদক বিক্রেতা ও সেবনকারীরা খবর পেয়ে সঁটকে পড়েন। তাই পুলিশের জালে মাদকের সঙ্গে জড়িত চুনো-পুটিরা ধরা পড়লেও ধরাছোয়ার বাইরে থাকেন রথী-মহারথীরা। তাই মাদক নির্মূলে প্রতিনিয়ত অভিযান চালালেও মাদক নির্মূল করা আর সম্ভব হয় না। অথচ সভা সেমিনারে মাদক নির্মূলে জিরো টলারেন্স, কোন ছাড় না দেওয়ার অঙ্গীকার ইত্যাদি ইত্যাদি অনেক নীতিবাক্য শোনা যায়। কিন্তু কাজির গরু কিতাবে থাকলেও গোয়ালে আর দেখা যায় না।

 

অন্যদিকে বেশিরভাগ মাদক সিন্ডিকেটের সাথেই পুলিশের সোর্সদের সাথে সখ্যতা থাকে বলেও বিভিন্ন এলাকা থেকে অভিযোগ পাওয়া যায়। তাই মাদক বিক্রির বড় একটি অংশ তাদের পকেটেও চলে যায় বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। অনেক সময় এসব সোর্সেরা তাদের সম্পর্ক থাকা প্রকৃত মাদক বিক্রেতাদের সাথে আঁতাত করে যারা মাদকের প্রতিবাদ করে তাদের বিরুদ্ধে পুলিশ দিয়ে হয়রানি করে বলেও অনেক অভিযোগ পাওয়া যায়।

 

মাদকের সাথে সম্পৃক্ত নয় এমন পরিবারের সদস্যদের শায়েস্তা করার জন্য এবং তাদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার জন্য সেখানে মাদক উদ্ধারের নাটক সৃষ্টি করা হয় বলেও বিভিন্ন সময় অভিযোগ পাওয়া যায়। তাছাড়া এসব সোর্সদের বেশিরভাগই মাদকাসক্ত, মাদক বিক্রেতা কিংবা মাদক সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত বলে জানিয়েছে একাধিক সূত্র। বন্দরের আইন শৃঙ্খলা কমিটির সভাগুলোতেও মাদকের বিষয়টি খুব গুরুত্বের সাথে ওঠে আসছে প্রতিবার। তারপরও মাদকের পরিধি কমানোতো দূরের কথা আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে বন্দরবাসীর অভিযোগ।

 

বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী চলতি বছরের গত ৫ মাসে বন্দরের মাদক মামলার পরিমান ও এই মামলায় অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার ও উদ্ধারকৃত তালিকার চিত্র দেখলেই মাদকের ভয়াবহতা অনুধাবন করা যায়। এই সময়ের মধ্যে বন্দর থানায় মোট মামলা দায়ের হয়েছে ২২৩টি। যার মধ্যে ১১৯টিই মাদকের মামলা।

 

গত জানুয়ারিতে বন্দর থানায় মোট দায়ের করা ৪৩টি মামলার মধ্যে ২১টি-ই মাদক মামলা। শুধু মাত্র জানুয়ারি মাসেই র‌্যাব, ডিবি ও বন্দর থানা পুলিশের বিভিন্ন অভিযানে ৫ হাজার ৬৮ পিছ ইয়াবা ট্যাবলেট, ৪৯ হাজার ৯০০ পিছ ট্যাবলেট, ৬৮ কেজি ৫’শ গ্রাম গাঁজা, ১৬ বোতল বিদেশী মদ ও ১৬ বোতল ফেন্সিডিল উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃত মাদক দ্রব্যের আনুমানিক মূল্য ৪৮ লাখ ৪২ হাজার ৫’শ ৫০ টাকা বলে থানা সূত্রে জানা গেছে।

 

ফেব্রুয়ারিতে বন্দর থানায় মোট ৩৬টি মামলা হয়েছে যার মধ্যে মাদক মামলা ২৩টি। ফেব্রুয়ারিতে পুলিশ বন্দরে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে ২৭ জন মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করে। পৃথকভাবে থানায় দায়ের করা মামলায় ৫২৬ পিছ ইয়াবা ট্যাবলেট, ৩০ গ্রাম হেরোইন ও ২ কেজি ৫০০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধার, গোয়েন্দা পুলিশের মামলায় ৩০০ পিছ ইয়াবা ট্যাবলেট ও ১০ বোতল ফেন্সিডিল উদ্ধার, কাউন্টার টেরোরিজমের মামলায় ২ হাজার ৪৫০ পিছ ইয়াবা ট্যাবলেট, ২০০ পুড়িয়া হেরোইন, র‌্যাব এর মামলার ১১ কেজি গাঁজা ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মামলায় ৫ কেজি গাঁজা উদ্ধার করা হয়।

 

মার্চে বন্দর থানায় দায়ের করা মোট ৪৯টি মামলার মধ্যে মাদক মামলা ২৭টি। এই মামলার অভিযানে ৪১ জন মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশ ও র‌্যাব-১১সহ বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বন্দর থানার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১শ’ ৭৬ কেজি ৬শ’ ৩০ গ্রাম গাঁজা ও ২৪ হাজার ৫শ’ পিস ইয়াবা, ২৬ বোতল ফেনসিডিল ও ৬ বোতল বিদেশী মদ উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। যার আনুমানিক মূল্য ৬১ লাখ ৮০ হাজার টাকা।

 

এপ্রিলে বন্দর থানায় মোট ৪৪টি মামলা হয়েছে যার মধ্যে মাদক মামলা ২০টি। এসব মামলায় র‌্যাব ও পুলিশ বন্দরের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে ১৫ হাজার ১শ’ পিছ ইয়াবা, ৬০ কেজি ৫শ’ ১০ গ্রাম গাঁজা, ১০ গ্রাম হেরোইন ও ৬৮ ক্যান বিয়ার উদ্ধার করে। যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ৭৭ লাখ ৩২ হাজার ৫’শ টাকা বলে জানা গেছে। অন্যদিকে গত মে মাসে বন্দর থানায় মোট ৫১টি মামলা হয়েছে। যার মধ্যে মাদক মামলা ২৮টি।

 

মে মাসে পুলিশ বন্দরে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে ৪৮ জন মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশ, র‌্যাব-১১, জেলা গোয়েন্দা পুলিশ ডিবি, মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, জেলা কাউন্টার ট্যারোরিজম ইউনিটসহ আইন শৃঙ্খলা বাহিনী বন্দরের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে ৪৪ হাজার ৫’শ ৫২ পিছ ইয়াবা ট্যাবলেট, ৬৬ কেজি ৫’শ গ্রাম গাঁজা, ৩১ বোতল ফেন্সিডিল, ৯৬ ক্যান বিয়ার ও ২৬০ পুড়িয়া হেরোইন উদ্ধার করে। যার আনুমানিক মূল্য হলো ১ কোটি ৫৩ লাখ ১১ হাজার ৬’শ টাকা।

 

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে বন্দরে মাদক বৃদ্ধির কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম কারণ হলো স্থানীয় একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি এদের সাথে জড়িত। এমনকি কিছু কিছু অসাধু পুলিশ সদস্যও তাদের সাথে লিয়াজো করছে। অন্যদিকে মাদক আইনে কাউকে গ্রেফতার করা হলেও আইনের বিভিন্ন ফাঁক-ফোঁকর গলিয়ে তারা আবার বেরিয়ে এসেই পুরানো ব্যবসায় ফিরে যাচ্ছে। এরমধ্যে মাদক সহজ প্রাপ্তিও একটি বড় কারণ বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে। সূত্র মতে বন্দরের মাদক সিন্ডিকেটের সদস্যরা খুব সহজেই হাতের নাগালে মাদক পেয়ে যান।

 

কারণ হলো ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক এখন মাদকদ্রব্য পাচারকারীদের জন্য একটি নিরাপদ রুটে পরিণত হয়েছে। এই রুট দিয়ে যাত্রীবাহী বাসসহ বিভিন্ন যানবাহনের মাধ্যমে সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ফেনী, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও কক্সবাজার দিয়ে ভারত ও মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে অবৈধ পথে মাদক প্রবেশ করছে। সেসব মাদক এই রুট দিয়ে খুব সহজেই বিভিন্ন ধরনের মাদক দ্রব্য রাজধানী ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জসহ দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।

 

এখানে প্রায় প্রতিনিয়তই চলছে মাদক উদ্ধার অভিযান। কাজ করছে র‌্যাব, হাইওয়ে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভিন্ন বাহিনীর একাধিক টিম। অন্যদিকে মাদক পাচারকারীরাও এসব কাজে প্রায় প্রতিদিনই নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন করছে। নানা কৌশলে তারা মাদক পাচার এবং বিক্রি অব্যাহত রেখেছে। অর্থের লোভে এরা জীবনের ঝুঁকি নিতেও দ্বিধাবোধ করে না। তাদের নিত্য নতুন কৌশলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সদস্যরাও হিমশিম খাচ্ছেন। বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়ে ব্যাপক মাদকসহ মাদককারবারীদের গ্রেফতার করেন এসব সংস্থা।

 

এই বিষয়ে বন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, মাদকের বিষয়ে আমরা কোন ছাড় দেই না। আমরা যখনই কোন তথ্য পাই সাথে সাথেই তার ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করি। এই এলাকাকে মাদক মুক্ত করতে আমরা যথেষ্ট আন্তরিক। তারপরও আমাদের থানায় প্রতিমাসে যে মামলা দায়ের হয় তার সিংহভাগই মাদকের মামলা। তবে শুধু মাত্র পুলিশের উপর ভরসা করলেই হবে না। পরিবার ও স্থানীয় পর্যায় থেকেও এই বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে। তিনি আরও জানান, মাদক বিক্রেতার বিষয়ে যারা তথ্য প্রদান করবেন তাদের নাম পরিচয় গোপন রাখা হবে। এস.এ/জেসি

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন