সভাপতি পদে নাই শামীম ওসমানের বেয়াই লাভলু
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৩, ০৭:৩৫ পিএম
# ভোটার তালিকা হালনাগাদ না করে নির্বাচনের অভিযোগ
# আমি হুমকি-ধমকির মানুষ না : লাভলু
# ভোটার তালিকা হালনাগদ করতে দেয়া হয় নাই : প্রধান শিক্ষক
বিভিন্ন সময় নানা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। একই সাথে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রভাব বিস্তার করে সভাপতি পদ দখলেরও অভিযোগ রয়েছে। প্রভাব বিস্তারকারীরা অনেক সময় ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচন না দিয়েওই নির্বাচন দেখিয়ে কমিটিতে আসতে চায় এমন অভিযোগও উঠেছে। এই অনিয়মের সাথে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক থেকে শুরু করে ম্যানেজিং কমিটির সদস্য, সভাপতি বিদ্যালয়ে কতিপয় শিক্ষকরাও জড়িত থাকেন। নানা অনিয়মের মাঝে নারায়ণগঞ্জ শহরের গণবিদ্যা নিকেতন উচ্চ বিদ্যালয়ের নির্বাচন না করে ম্যানেজিং কমিটির অনুমোদনের জন্য আবেদন করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিদ্যালয়ের অভিভাবকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এই বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাংসদ শামীম ওসমানের পুত্র ওয়ন ওসমানের শ্বশুর ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ লাভলু। আবার কেউ কেউ বলছে তিনি এডহক কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি। কিন্তু কাগজ বলছে ভিন্ন কথা। বর্তমানে গণবিদ্যা নিকেতন বিদ্যালয়ের কোন কমিটি নেই। কেননা ইতোমধ্যে এড হক কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। তার আগে পূর্ববর্তী কমিটির মেয়াদ শেষ হয়। এছাড়া নতুন কমিটির অনুমোদন না দেয়ায় বর্তমানে কমিটি বিহীন আছে।
এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২৩ সনের ২৯ জানুয়ারি ২০০৯ মালের প্রবিধানমালা প্রবিধি ৭ ও ৮ ধারা মোতাবেক গণবিদ্যা নিকেতন উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির অনুমোদনের জন্য আবেদন করা হয়। আবেদন পত্রে দেখা যায়, সকল ক্যাটাগরির সদস্য নির্বাচন ২৫ জানুয়ারি হয়। তার আগে ২০২২ সনের ৮ সেপ্টম্বর ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ লাভলুকে সভাপতি করে ৩ সদস্যের এডহক কমিটি গঠন করা হয়। যার মেয়াদ এই বছরের ৭ মার্চ শেষ হয়ে গেছে। ছয় মাসের জন্য এডহক কমিটি অনুমোদন পায়। এডহক কমিটির সাধারণ শিক্ষক সদস্য ছিলেন, মো. মাইন উদ্দিন,অভিভাবক সদস্য হারুনুর রশিদ এবং বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক।
অপর দিকে নতুন কমিটি অনুমোদন আবেদন কপিতে গণবিদ্যা নিকেতন উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি পদে রয়েছেন এমপি শামীম ওসমানের বিয়াই ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ লাভলু, সাধারণ শিক্ষক সদস্য পদে রয়েছে কামরুল হক সিদ্দিকী, মো. মুঈন উদ্দিন, সংরক্ষিত মহিলা শিক্ষক সদস্য তানিয়া রহমান, অভিভাবক সদস্য মো. হারুন নুর রশিদ, ইসরাত জাহান, শাহ আলম, তপন দে তরু, সংরক্ষিত নারী অভিভাবক সদস্য নাজনিন আক্তার নিপুন।
কিন্তু এই কমিটি আবেদনের সময় ছয় মাস হলেও এখনো পর্যন্ত মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড থেকে অনুমোদন দেয়া হয় নাই। অনুমোদন না হওয়ার পিছনের কারণ হিসেবে বিদ্যালয়ের একাধিক অভিভাবকরা জানান এখানে কোন নির্বাচন হয় নাই। কবে এই বছরের কোন নির্বাচন হতেই তারা দেখে নাই। তাছাড়া অভিযোগ রয়েছে এই পাতানো নির্বাচন ২০২২ সনের ভোটার তালিকা দিয়ে করা হয়েছে। ২০২৩ সনের ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা হয় নাই। নিয়ম অনুসারে নতুন বছরের ভোটার তালিকা নাগাদ করে নির্বাচন হতে হবে। এখানে তা মানা হয় নাই বলে অভিযোগ উঠেছে।
মাধ্যমিক উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ডের নিয়ম অনুসারে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার ৮০ দিন আগেই নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে হবে। এছাড়া নিম্ন-মাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি, গভর্নিং বডি প্রবিধানমালা-২০০৯ এর প্রবিধি ১২ এর উপ প্রবিধি(১) অনুযায়ী ম্যানেজিং কমিটির মেয়াদ উত্তীর্ণের অন্তত ৮০ দিন আগেই নির্বাচনের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে।
প্রতিষ্ঠান প্রধান সকল শ্রেণির সদস্য পদের জন্য পৃথক পৃথক খসড়া ভোটার তালিকা প্রণয়ন করে কমিটির সভায় উপস্থাপন করে অনুমোদন করিয়ে নিতে হবে। কোনওভাবেই আগের ভোটার তালিকা দিয়ে নির্বাচন করা যাবে না। কিন্তু নারায়ণগঞ্জ শহরের গণবিদ্যা নিকেতন উচ্চ বিদ্যালয়ের নতুন কমিটির অনুমোদনের আবেদন নিয়ে অভিযোগ রয়েছে ভোটার তালিকা হালনাগাদ না করে ২০২২ সনের ভোটার তালিকা দিয়ে নির্বাচন হয়েছে।
অথচ ২০২২ সনের যে সকল শিক্ষার্থীরা এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন তাদের অভিভাবকরা ২০২৩ সনে এসে ভোটার হতে পারবে না। তাছাড়া এই ভোটার তালিকায় ৬ষ্ঠ শ্রেনীতে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের অভিভাবকগণ ভোটার হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু তা করা হয় নাই। আর এতে করে বুঝা যায় এখানে প্রভাব বিস্তার করে নির্বাচন করে কমিটির অনুমোদনের জন্য আবেদন করা হয়েছে।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে একাধিক শিক্ষক জানান, এখানে সাধারণ শিক্ষক সদস্য পদে একাধিক প্রার্থী ছিল কিন্তু প্রভাবশালী মহল প্রভাব বিস্তার করে হুমকি দিয়ে তাদের বসিয়ে দেয়া হয়। কেননা এই বিদ্যালয়ের কমিটির সভাপতি পদে সাংসদ শামীম ওসমানের বিয়াই লাভলু রয়েছেন। আর এজন্য অনেকে ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পান নাই। এখানে কামরুল হক সিদ্দিকী, তানিয়া রহমান এবং মঈন উদ্দিনকে সদস্য পদে রাখা হয়। তাদের বিপক্ষে প্রার্থীদের হুমকি দিয়ে বসানো হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক জানান, মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের নিয়ম অনুসারে যে বছর নির্বাচন হবে ওই বছরের ভোটার তালিকা হালনাগাদ করে নির্বাচন করতে হবে। অথচ ২০২২ সনের ভোটার তালিকা দিয়ে নতুন ভোটার তালিকা না করে সম্পূর্ণ অনিয়ম করে তারা নির্বাচন করে কী করে তা আমাদের বোধগম্য নয়। বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ লাভলু, তার সহযোগী হিসেবে কামরুল হক সিদ্দিকী, মঈন উদ্দিন, তানিয়া রহমান মিলে একটি সিন্ডিকেট করে তারা এই পাতানো নির্বাচন দেখিয়ে কমিটির অনুমোদন আনতে চান।
কিন্তু এখন শুনতেছি এই কমিটির অনুমোদন না দিয়ে আগামী ১৯ তা তদন্তের জন্য নাকি জেলা শিক্ষা অফিস থেকে শিক্ষা অফিসারের প্রতিনিধি আসবে। আমরা আশা করি তাদের তদন্তের মাধ্যমে সঠিক তথ্য বেরিয়ে আসবে। তার পাশে আরেক শিক্ষক জানান, শিক্ষক প্রতিনিধি নির্বাচনের সাংসদ শামীম ওসমানের বিয়াই ফয়েজ উদ্দিন লাভলু এসে বলেন, আমি শামীম ওসমানের বিয়াই। তখন তিনি অন্য প্রার্থীদের ধমকের সুরে বসে পরতে বলেন।
অভিযোগ করে সেলিনা আক্তার নামে এক অভিভাবক বলেন, এখানে নির্বাচন হলো কবে খবর ওইত পাইলাম না। তাছাড়া এখানকার শিক্ষার মান আগের মত নেই। শিক্ষার মান উন্নয়ন বিষয়ে ম্যানেজিং কমিটির তেমন কোন তদারকি নেই। তাছাড়া প্রধান শিক্ষককে কোন ভোটার তালিকা করতেও শুনলাম না। এদিকে শিক্ষাবিদরা বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রভাববিস্তার, বৈষম্য, বাণিজ্য ও দলবাজির সুযোগ চিরতরে রুদ্ধ করতে হবে।
শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেন বিশেষ দল ও গোষ্ঠির রাজনৈতিক উচ্চাভিলাস হাছিলের মতলবী হাতিয়ারে পরিণত না হয় তার আইনগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। গণবিদ্যা নিকেতন উচ্চ বিদ্যালয়ে যেন প্রভাবশালী মহলের নজর পরেছে। এতে করে শিক্ষার নামে অনৈতিক বাণিজ্য বিস্তার লাভ করে। আবার অনেকে দাতা সদস্য হয়ে উল্টো আরও লুটে পুটে খায়। এজন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রভাব বিস্তার রোধ করতে হবে।
গণবিদ্যা নিকেতন উচ্চ বিদ্যালয়ের নির্বাচনের প্রিজাইডিং অফিসার ও সদর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার আবু তালেব জানান, এই বিদ্যালয়ের জমিসংক্রান্ত বিষয়ে জামেলা থাকার কারনে আবেদনকৃত কমিটির অনুমোদন দেয়া হয় নাই। তদন্তাধিন অবস্থায় রয়েছে। ভোটার তালিকার বিষয়ে আমার এখন অনেক কিছু মনে নেই। আপনি সরাসরি সামনে আসেন আপনার সাথে কথা বলি।
গণবিদ্যা নিকেতন উচ্চ বিদ্যালয়ের কমিটির আবেদনকৃত সংরক্ষিত মহিলা অভিভাবক সদস্য নাজনীন আক্তার নিপুন জানান, নির্বাচনের সময় কম থাকার কারনে ২০২২ সনের ভোটার তালিকা দিয়ে নির্বাচন করা হয়। তখন ভোটার তালিকা হালনাগাদ করার সুযোগ ছিলনা। কমিটির অনুমোদন নিয়ে তিনি বলেন, কমিটি তদন্ত অবস্থায় আছে। তদন্তের মাধ্যমে আমাদের কমিটি অনুমোদন পেলে আমরা দায়িত্বে বসবো।
সাধারণ শিক্ষক সদস্য কামরুল হক সিদ্দিকী বলেন, ২০২২ সনের ভোটার তালিকা ঠিক ছিল। কিন্তু ২০২৩ সনে নির্বাচন হলেও তখন কোন ভোটার তালিকা হালনাগদ করা হয় নাই। তা আমার জানা নেই। তাছাড়া কি কারনে ভোটার তালিকা হালনাগদ হয় নাই সে বিষয়ে খবর নেয়া হবে। ভোটার তালিকা হালনাগাদ বিহীন নির্বাচন হলো কিভাবে জানতে চাইলে তিনি তার উত্তর না দিয়ে পাশ কাটিয়ে যান। এই কমিটি অনুমোদনের বিষয়ে তদন্ত অবস্থা রয়েছে। আগামী সোমবার তদন্ত হবে সেদিন আপনারা গণমাধ্যমও উপস্থিত থাকবে।
গণবিদ্যা নিকেতন উচ্চ বিদ্যালয়ের আবেদনকৃত কমিটির সভাপতি ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ লাভলু বলেন, আমি কোন হুমকি ধমকির মানুষ না। যেই আমার নামে এই কথা বলেছে তা সম্পুর্ণ মিথ্যা। আমি পাচঁ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি। এই বিদ্যালয়ের উন্নয়নের জন্য আমি কাজ করে যাচ্ছি। ভোটার তালিকার বিষয়ে বলেন, ভোটার তালিকা হালনাগাদ করতে হবে না। আনোয়ার নামে এক অভিভাবকের অভিযোগের প্রেক্ষিতে কমিটি অনুমোদন আটকে রয়েছে।
গণবিদ্যা নিকেতন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুল জব্বার বলেন, আমাকে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করতে দেয়া হয় নাই। সভাপতি আমাকে কমিটির অনুমোদনের জন্য পাঠাতে বলছে আমি তার কথা মত তা অনুমোদনের জন্য পাঠিয়েছি। এডহক কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় এবং নতুন কমিটির অনুমোদন না মিলায় বর্তমানে বিদ্যালয়ে কমিটি বিহীন হয়ে আছে। তবে কমিটির বিষয়ে আগামী সোমবার তদন্তের জন্য আসবে জেলা শিক্ষা অফিসারের প্রতিনিধি। এস.এ/জেসি


