Logo
Logo
×

বিশেষ সংবাদ

‘রাতে স্বপনের ভাত টেবিলে রেখে দেই কিন্তু আমার স্বপন তো আর আসে না’

Icon

মেহেদী হাসান

প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৩, ১০:৪৮ পিএম

‘রাতে স্বপনের ভাত টেবিলে রেখে দেই কিন্তু আমার স্বপন তো আর আসে না’
Swapno


 # গরীব বলে শামীম ওসমান-চন্দনশীল তাদের ভুলে গেছে : স্বপনের মা  


কত স্বপ্ন-কত আশা ছিলো সন্তানকে নিয়ে। সন্তান একদিন বড় কোন চাকুরী করে পরিবারে হাল ধরবে, বাবা-মায়ের মুখ উজ্জল করবে।  কিন্তু সেই স্বপ্ন এক নিমেষেই শেষ হয়ে গেলো একটি বোমে। আজও ছেলে হারানো শোকে নীরবে দু’চোখের পানি ফেলে নিহত স্বপনের মা গিতা রানী।

 

 

আজ ১৬ই জুন, ২০০১ সালের এই দিনে নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়ায় আওয়ামীলীগ অফিসে বোমা হামলায় নিহত হন স্বপন চন্দ্র দাস সহ আরও ১৯জন। স্বপনের মা গিতা রানী বলেন, ছয় ভাই-বোনের মধ্যে স্বপন ছিলো চার নম্বর। দুই ভাই, এক বোনের পরে ছিলো স্বপন। খুব গরীর ঘরে সন্তান ছিলো স্বপন, তারা বাবা পেশায় একজন পাদুকা।

 

 

বাবার স্বপ্ন ছিলো এই স্বপনকে শিক্ষিত করতে পারলে তাদের আর কোন কষ্ট থাকবে না। অন্য ভাই-বোনদের শিক্ষিক করতে না পারলেও স্বপনকে (বি.এ) পাশ করিয়ে ছিলেন তার পিতা। নারায়ণগঞ্জ কলেজ থেকে (বি.এ) পাশ করেছে স্বপন, চাকুরী জন্য বিভিন্ন কোম্পানীতে আবেদন করতে করতে একটি কোম্পানীতে তার চাকুরী হয় কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে।

 

 

কিন্তু সেখানে চাকুরী পেতে হলে এমপির প্রত্যায়ণ পত্র লাগে, স্বপন দুই দিন শামীম ওসমানের স্বাক্ষরের জন্য চাষাঢ়া আওয়ামীলীগ অফিসে যান কিন্তু সে শামীম ওসমানের দেখা পায়না। পরে ১৬জুন সন্ধ্যার পরে সাইদুল হাসান বাপ্পীর সাথে চাষাঢ়া আওয়ামীলীগ অফিসে যান এমপি শামীম ওসমানের স্বাক্ষরের জন্য।

 

 

বিকেল ৫টার সময় স্বপন বাসা থেকে বের হয়, রাত ১০টা বেজে গেলেও স্বপন বাসায় ফিরে না। রাতে খাবারের জন্য স্বপনের ভাত টেবিলে রেখে দেই কিন্তু স্বপন আর আসে না। রাত যতো বেশি হচ্ছে আমার মনটা কেমন যে করছে, কোথায়ও তাকে পাচ্ছি না। তিনবার রাস্তায় গিয়ে দাঁড়িয়ে আছিলাম, স্বপন আসে কিনা, কিন্তু দেখি না, স্বপনের এক বন্ধুকে স্বপনের কথা জিজ্ঞাসা করলাম, সে বলল আপনি বাসায় যান ও এসে পরবে।

 

 

পরে আমি বাসায় গিয়ে টিভি দেখছি, এমন সময় একজনে আসে বললো বাপ্পীকে ত বোম মারছে। সেই কথা শোনে আমি জিজ্ঞাস করলাম কই বোমা মারছে? সে বললো চাষাঢ়ায়, সেই সময় আমার মাথায় বাঁশ পরল, আমার ছেলে না চাষাঢ়ায় গেছে। তখন স্বপনের ভাই তপন তাকে খুঁজতে বাসা থেকে বের হলো, কিন্তু স্বপনকে সেখানে পাওয়া যায়না, অনেকে বলছে আহত সবাইকে খানপুর হাসপাতালে  নেওয়া হয়েছে, কিন্তু আমার মেজো ছেলে সেখানেও গিয়ে তাকে পায়নাই।

 

 

পরে একজনে বলে ঢাকায় নিয়ে গেছে, ঢাকায় গিয়ে ডাক্তারকে ছেলে জিজ্ঞাস করল বোমা হামলার লোক কই? ডাক্তার বলল মরগের সামনে গিয়ে দেখেন। তখন সেখানে গিয়ে দেখে আমার স্বপন আর নেই। তখন আমার ভাইয়ের ছেলে রাত আড়াইটা বাজে বাসায় এসে বলে জেটি স্বপন ভাইরে পাইছি, তখন আমি বলি আমার ছেলে কি করে, কিন্তু আমার ভাইয়ের ছেলে আর কথা বলে না।

 

 

তখন আমি বুজে যাই আমার ছেলে আর নেই। যদি বেঁচে থাকত তাহলে ত সে বলত আমার মাকে-বাবাকে আসতে বলো। তখন আমি বুজতে পারি আমার বাবা (ছেলে) আর নেই। পরের দিন বিকেলে ট্রাক দিয়ে লাশ নিয়ে আসে। স্বপনকে দেখে আমি পাগলের মতো হয়ে যায়। সে মারা যাবার পর থেকে আমি এখন পাগলের মতো রাস্তা রাস্তায় বসে থাকি, ঘরে একা একা বসে থাকি।

 

 

২২টি বছর ধরে আজও স্বপনের কথা মনে পরলে কষ্টে বুকটা ফেটে যায়। তিনি আরও বলেন, জীবনে সব অর্থ স্বপনের পড়া-শোনা কাজে ব্যয় করেছি, কিন্তু আমাদের স্বপন আর পূরণ হলো না। ২২ বছর আগে বোমা হামলায় স্বপন মারা যায় কিন্তু আজও আমাদের খবর কেউ নেই নাই। আমরা গরীর বলে কেউ আমাদের খবর নেই না।

 

 

প্রথম বছর প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা দিয়েছে ১ লক্ষ টাকা আরও মন্টু ঘোষ দিয়েছে ১ লক্ষ টাকা এবং শেখ রেহানা দিয়েছে ৫ হাজার টাকা। এর পর থেকে কেউ আর আমাদের খবর নেই নাই। আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় আছে ১৫ বছর ধরে, কিন্তু শামীম ওসমান আমাদের খোঁজ-খবর নেই নাই।

 

 

প্রথম বছর শামীম ওসমান এসে আমাকে বুকে নিয়ে বলেছিলো, মা স্বপন নেই তো কি হয়েছে আমি তো আছি, আমি আপনার ছেলে স্বপন। কিন্তু এর পরে আমরা আর তার দেখা পায় নাই। তিনি আরও বলেন, নাসিক ১৮নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর কামরুল হাসান মুন্না আমাদের দিকে একটু দেখেন না, তার ভাইয়ের সাথে আমার ছেলেটা গিয়ে মারা গেছে, তিনি আমাদের খোঁজ-খবর রাখেন না।

 

 

ছেলেটা মারা গেছে ২২বছর হবে, টাকা জন্য তার দিবসী করতে পারি না। এক প্রশ্নে তিনি জানান, চন্দনশীল জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হয়েছে, কিন্তু সেও তো দু’পা হারিয়েছে। আজ সে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কিন্তু সে আমাদের দেখে না। আজ গরীব বলে শামীম ওসমান এমপি, চন্দন শীল আমাদের ভুলে গেছে। আজ ছেলেটা হারিয়ে আমার সব শেষ, আমার স্বামী নাই।

 

 

বড় ছেলে জুতা সেলাই করে, প্রতিদিন ১৫০-২০০টাকার কাজ হয়। অনেক সময় হয়ও না, অনেক কষ্টে দিন কাটাচ্ছি। উল্লেখ্য, ২০০১ সালের ১৬জুন রাতে শহরের চাষাঢ়ায় আওয়ামী লীগ অফিসে সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের পূর্ণনির্ধারিত গণসংযোগ কর্মসূচি ছিল। রাত আনুমানিক পৌনে ৯টার দিকে গণসংযোগ কর্মসূচি চলাকালে বিকট শব্দে শক্তিশালী দুটি বোমা বিস্ফোরণে ২০ জন নিহত হন।

 

 

আহত হন সংসদ সদস্য শামীম ওসমানসহ শতাধিক। বিস্ফোরণে আওয়ামী লীগের অফিসের টিনের চালা উড়ে যায়। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে নিহত ব্যক্তিদের লাশ ও আহত ব্যক্তিদের রক্তাক্ত দেহ। বিকট শব্দে কেঁপে উঠে পুরো শহর। সেদিনের নৃশংস বোমা হামলায় ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় ৯ জনের আর হাসপাতালে মারা যায় বাকি ১১ জন।

 

 

সেদিনের নৃশংস বোমা হামলার ঘটনায় নিহত হয়েছিলেন- শহর ছাত্রলীগের সভাপতি সাইদুল হাসান বাপ্পী, সহোদর সরকারি তোলারাম কলেজ ছাত্র-ছাত্রী সংসদের জিএস আকতার হোসেন ও সঙ্গীত শিল্পী মোশাররফ হোসেন মশু, সঙ্গীত শিল্পী নজরুল  ইসলাম বাচ্চু, ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের তৎকালীন যুগ্ম সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন ভাসানী। 

 

 

নারায়ণগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এ বি এম নজরুল ইসলাম, স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা সাইদুর রহমান সবুজ মোল্লা, মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রী পলি বেগম, ছাত্রলীগ কর্মী স্বপন দাস, কবি শওকত হোসেন মোক্তার, পান সিগারেট বিক্রেতা হালিমা বেগম, সিদ্ধিরগঞ্জ ওয়ার্ড মেম্বর রাজিয়া বেগম। 

 

 

যুবলীগ কর্মী নিধু রাম বিশ্বাস, আব্দুস সাত্তার, আবু হানিফ, এনায়েতউল্লাহ স্বপন, আব্দুল আলীম, শুক্কুর আলী, স্বপন রায় ও অজ্ঞাত এক নারী। এছাড়াও শামীম ওসমানসহ আহত হন অর্ধশত ব্যক্তি। মহানগর আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি চন্দন শীল ও যুবলীগ কর্মী রতন দাস দুই পা হারিয়ে চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করেন।   এন .হুসেইন রনী  /জেসি

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন