স্বেচ্ছাসেবক লীগের বিষফোঁড়া দুলাল
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৩, ০৯:০২ পিএম
# সম্মেলনকে ঘিরে শুদ্ধি অভিযানের দাবি তৃণমূলের
# মাদকসহ গ্রেফতার ও হাজতবাস করেন তিনি
# জাল দলিলের মাধ্যমে ভাড়া বাড়ি দখলের অভিযোগ
# দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে গিয়ে বিরোধী প্রার্থীর প্রচারণায় অংশগ্রহণ
আগামী ৩১ জুলাই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সম্মেলন। এই সম্মেলনের ভেন্যু হিসেবে ইতিমধ্যে শহরের শেখ রাসেল পার্ক এবং ওসমানী স্টেডিয়াম এই দুইটি স্থান প্রাথমিকভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। পরে কেন্দ্র ও স্থানীয় নীতিনির্ধারকদের সাথে আলাপ আলোচনা করে এই দুইটি স্থানের মধ্যে যেকোন একটি স্থানকে নির্ধারণ করা বলে জানা গেছে। তবে সম্মেলনকে ঘিরে শুদ্ধি অভিযানের দাবি উঠেছে তৃণমূল থেকে।
বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে থাকা বিতর্কিত নেতৃবৃন্দকে বাদ দিয়ে ক্লীন ইমেজের সমন্বয় ঘটানোর দাবি উঠেছে জোরালোভাবে। সূত্রমতে, এবারের সম্মেলনে মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের শীর্ষ পদে আলোচনায় রয়েছে একাধিক প্রার্থী। এরমধ্যে রয়েছেন মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক সভাপতি জুয়েল হোসেন, সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাইফুদ্দিন আহমেদ দুলাল প্রধান, সাবেক যুগ্ম সম্পাদক রফিকুল ইসলাম জয়, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা তাহের উদ্দিন আহমেদ সানিসহ আরও বেশ কয়েকজন।
যদিও এবারের সম্মেলনে নেতৃত্বে নতুন মুখ আসতে পারে বলে জানিয়েছে দলীয় একাধিক সূত্র। পুরানোদের মধ্যে বিতর্কিত এবং সংগঠনের ভাবমূর্তি নষ্ট হয় এমন নেতৃত্বকে বাদ দিয়ে প্রয়োজনে নতুন নেতৃত্বের মাধ্যমে কমিটিকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে কেন্দ্র সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদ প্রত্যাশীদের বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করছেন বলে জানা গেছে। কে কার লোক সে বিষয়ে গুরুত্ব না দিয়ে নেতৃত্বের জন্য যাচাই বাছাই করে সৎ, শিক্ষিত ও প্রকৃত আওয়ামী লীগের রাজপথের ত্যাগী নেতাকে মূল্যায়ন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
তাই এবার মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগে সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও নাসিকের সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর সাইফুদ্দিন আহমেদ দুলাল প্রধানের কপাল পুড়ছে বলে মনে করছেন মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের মাঠ পর্যায় থেকে শুরু করে শীর্ষ স্থানীয়দের নেতাকর্মীগণ। তাদের মতে সাবেক এই নেতার বিরুদ্ধে এরই মধ্যে মাদক বিক্রি, মাদক সেবন, ভূমি সন্ত্রাসী, ডিস সন্ত্রাসীসহ একাধিক অভিযোগ রয়েছে বলে জানান তারা।
এরই মধ্যে মাদকসহ গ্রেফতার, ভূমি সন্তাসের জন্য তার বিরুদ্ধে ওয়ারেন্টও বের হয়েছে বলে জানা যায়। এর আগে শহর স্বেচ্ছাসেবক লীগের কমিটি বিলুপ্ত করে ২০১৭ সালের ২০ জুলাই মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের কমিটি গঠন করা হয়। তখন বিলুপ্ত কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. জুয়েল হোসেনকে সভাপতি এবং সাইফুদ্দিন আহম্মেদ দুলাল প্রধানকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়।
তবে তাদের মধ্যে বনিবনা ছিল না বলে তাদের যৌথ উদ্যোগে বিভিন্ন থানা ও ওয়ার্ড কমিটি গঠনসহ দলের উন্নয়নে সম্মিলিত কোন কর্মকান্ড লক্ষ্য করা যায়নি। এরপর ২০২২ সালের ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগসহ এর অন্তর্গত সদর থানা, ফতুল্লা থানা, সিদ্ধিরগঞ্জ থানা, বন্দর থানা, রূপগঞ্জ থানা, সোনারগাঁ থানা কমিটি এবং মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের ২৭টি ওয়ার্ড কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়।
এর মধ্যে ২০১৯ সালের ২ আগষ্ট রাতে বন্দরের নবীগঞ্জ ফেরী ঘাট এলাকা থেকে মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক সাইফুদ্দিন আহমেদ দুলাল প্রধানকে মাদকসহ গ্রেফতার করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এসময় তার সহযোগী হিসেবে সাথে থাকা কামাল হাসান, মনির হোসেন মনু, তানভীর আহম্মেদ সোহেল ও মো. মজিবর রহমানসহ আরও ৫ জনকে গ্রেফতার ডিবি।
সে সময় পুলিশ জানায়, জেলা ডিবি পুলিশ সদস্যরা গোপন সূত্রে জানতে পারে একটি সাদা মাইক্রোবাসে কয়েকজন মাদক ব্যবসায়ী মাদক নিয়ে নবীগঞ্জ ঘাট পার হচ্ছে। পরে ডিবি পুলিশের এসআই মো. আবদুল জলিল মাতুব্বর, এসআই খোকন চন্দ্র সরকার, এএসআই আমিনুল ইসলাম নবীগঞ্জ খেয়াঘাটে অবস্থান নেন এবং গাড়িটি ঘাট অতিক্রম করার সময় তল্লাশী চালিয়ে ৫০ বোতল ফেন্সিডিল ও মাদক বিক্রির ৩২ হাজার টাকাসহ তাদের গ্রেফতার করে।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে দুলাল প্রধান মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদকের পরিচয়ের আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে ফেনসিডিলের ব্যবসা করাসহ মাদকের সাথে নিজের সংশ্লিষ্টতার কথা স্বীকার করেছেন বলেও জানায় পুলিশ। এই ঘটনায় দুলাল প্রধানকে জেলও খাটতে হয় বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে দুলাল প্রধানের বিরুদ্ধে তার ভাড়া থাকা বাড়ির মালিকের কাছ থেকে জোর পূর্বক বাড়ি দখল করে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই বিষয়ে বিভিন্ন মিডিয়ায় খবরও প্রকাশ পেয়েছে। ভূক্তভোগী বাড়ির মালিক হাওলাদার রহিম তার বাড়ি হারিয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে বড়ই মানবেতর জীবন যাপন করছেন বলে জানা গেছে।
হাওলাদার রহিমের ফেসবুকে দেওয়া এক স্ট্যাটাস ও বিভিন্ন মিডিয়া থেকে প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায়, বাড়ি ঘর ছাড়া হওয়ায় ঘরে উপযুক্ত মেয়ে নিয়ে খুবই যন্ত্রণায় ও কষ্টে আছেন। আর্থিক সংকটের কারণে মেয়ের বিয়েও দিতে পারছেন না বলে জানান তিনি। তিনি হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘প্রেস ক্লাবের সামনে গায়ে আগুন দিয়ে জ্বলে মরে গেলে হয়তো খবর প্রচার হবে, তখন হয়তো প্রশাসন বা নেতারা আমার সম্পদ আমার ছেলে মেয়েকে পাইয়ে দিবে।’
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে আরও উল্লেখ করে বলেন, ‘দুলাল প্রধান আমার বাড়িটা জাল দলিল বানিয়ে দখল নিয়েছে, ব্যবসা দখল করে নিয়ে ১ঘন্টার ভিতর এলাকা ছাড়তে বাধ্য করেছে। প্রতারণা করে ২১শতক জায়গা বিক্রি করে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে এখন আমাকে এলাকায় যেতে দেয় না। সাবেক কাউন্সিলর ও সাবেক মহানগর সেচ্ছাসেবক লীগের সেক্রেটারি সাইফুদ্দিন আহম্মেদ দুলাল প্রধান হতে মুক্তি চাই, এক সময় আমার বাড়ির ভাড়াটিয়া ছিল এই দুলাল।
আমি আমার বাড়িতে ফিরতে চাই। বউ বাচ্চা নিয়ে খুব কষ্টে জীবনযাপন করছি। নারায়ণগঞ্জসহ দেশের সকল জনগন, রাজনৈতিক নেতা, মিডিয়া ও আইনের লোকদের একটু সাহায্য আশা করছি। পিবিআই ও সিআইডি তদন্তকরে তাদের বিরূদ্ধে রিপোর্ট দিয়েছে তবুও ফিরতে পারছিনা। দয়াকরে একটা পরিবারকে বাঁচান।’ এই বিষয়ে গত বছরের আগস্ট মাসে দুলাল প্রধানের বিরুদ্ধে গ্রেফতারী ওয়ারেন্ট বের হয়েছে বলেও জানা যায়।
শুধু তাই নয়, বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ঘটনার মাধ্যমে সংবাদের শিরোনামে উঠে আসে সাইফুদ্দিন আহমেদ দুলাল প্রধান। ব্যবসায়ীক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিজ দলীয় নেতার সাথে দ্বন্দ্ব, ইউপি নির্বাচনে নিজ দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে গিয়ে প্রকাশ্যে বিরোধী দলীয় প্রার্থীর প্রচারণায় অংশগ্রহণ করা, তার বাহিনীর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে চাঁদা আদায়েরও অভিযোগসহ তার বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্ত নেই। তার চরিত্রের কারণে গত সিটি নির্বাচনে তার দলীয় সমর্থকগণও তার পক্ষ নিয়ে কাজ করেননি বলে তিনি নির্বাচনে পরাজয়ের লজ্জা নিতে হয়েছে বলে দলীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে। এস.এ/জেসি


