Logo
Logo
×

বিশেষ সংবাদ

বিক্রিতে মালিকানা চেঞ্জ হলেও ‘বোস কেবিন’ রাখার দাবি

Icon

যুগের চিন্তা রিপোর্ট

প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৩, ০৮:২৯ পিএম

বিক্রিতে মালিকানা চেঞ্জ হলেও ‘বোস কেবিন’ রাখার দাবি
Swapno

 

নারায়ণগঞ্জের শত বছেরর ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান ‘বোস কেবিন’ যাকে ঘিরে রয়েছে পুরোনো দিনের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নানা কাহিনী। নগরীর এই একটি প্রতিষ্ঠান থেকেই বলা চলে নারায়ণগঞ্জের বিগত দিনে বা বর্তমানে রাজনৈতিক আলোচনা বা শহরের নিয়ে নানা পরিকল্পনা হয় এই ‘বোস কেবিনের’ চায়ের টেবিলে। কিন্তু বর্তমানে এই ‘বোস কেবিনকে’ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা শহরের অনেকের মুখে মুখে শোনা যাচ্ছে এই প্রতিষ্ঠানটির বিক্রির কথা।

 

অনেকের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এই প্রতিষ্ঠান যিনি তৈরি করেছেন বসু তিনি অনেক আগেই মারা গেছেন আর দীর্ঘদিন যাবৎ তারই ছেলে এই ‘বোস কেবিন’ পরিচালনা করে যাচ্ছেন। কিন্তু দীর্ঘ ৫/৬ মাস যাবৎ সে আর এই প্রতিষ্ঠানে আসে না। তাই শোনা যাচ্ছে অবস্থান ও স্থায়ী হওয়ার কারণে তিনি আর দেশে আসছেন না। সে কারণেই এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটি বিক্রি করে দিয়েছেন।

 

কিন্তু বর্তমানে যারা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে যাচ্ছে ম্যনেজার সুজিত কুমার তাদের ভাষায় তারা বলছে এই প্রতিষ্ঠান বিক্রি হয়েছে কিনা আমি অবগত না। যার কারণ হলো বর্তমানে ও মালিকের মা এসে প্রতিষ্ঠানে বিক্রিকৃত টাকা নিয়ে যায়। আর আমাদের মালিক ও আমাদের কিছু বলেনি আর তিনি বর্তমানে দেশের বাহিরে আছেন তার কাজে তার স্ত্রীর অসুস্থতা নিয়ে আর কিছু না।

 

জানা গেছে, এই ‘বোস কেবিনের’ বিক্রির কাহিনী নিয়ে বর্তমানে রাজনৈতিক অঙ্গণে ও এটার প্রভাব দেখা যাচ্ছে। অনেক নেতৃবৃন্দ অনেক কথায় বলছে এই ‘বোস কেবিনকে’ কিন্তু মালিকাধীন প্রতিষ্ঠান হওয়ার কারণে কেউ জোর করতে পারছে না। কিন্তু সকলেরই দাবি রয়েছে একটি এই প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে। সেই দাবি হলো প্রতিষ্ঠান যার হাতেই পরিচালনা হোক এই ঐতিহ্যবাহী ‘বোস কেবিন’ নাম যেন না মুছা হয়।

 

সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন শহরগুলোর মধ্যে নারায়ণগঞ্জ অন্যতম। সবচেয়ে ছোট্ট জেলা হলেও প্রাচ্যের ড্যান্ডি খ্যাত এ নারায়ণগঞ্জের ইতিহাস শত শত বছরের। হাজারো ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ এ নগরী। এক কাপ চায়েও মেলে এ নগরীর ইতিহাসের কথন। আর তারই অন্যতম উদাহরণ নারায়ণগঞ্জের নিউ ‘বোস কেবিন'। বিট্রিশ আন্দোলন থেকে শুরু করে ৫২-এর ভাষা আন্দোলন,৭১'র মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তৎকালীন জাতীয় রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে অনেক গুণীজনের আড্ডাস্থল হিসেবে ৯৯ বছর ধরে জনপ্রিয় হয়ে আছে।

 

নারায়ণগঞ্জ শহরের ১ ও ২ নং রেলগেটের মধ্যবর্তী ফলপট্টি এলাকায় এর অবস্থান। সময়ের আবর্তনে বোস কেবিনে আনা হয়েছে আধুনিকতার ছোঁয়া। ছোট্ট টঙ ঘর (চালাঘর) থেকে রুপান্তর করা হয়েছে পাকাঘরে। টুল সরিয়ে বসানো হয়েছে সারি সারি চেয়ার টেবিল। সেখানেই কথা হয় বোস কেবিনের তৃতীয় প্রজন্ম ও বর্তমান মালিক তারক চন্দ্র বসু’র সাথে। দাদা নৃপেন্দ্রচন্দ্র বসু ও বাবার মারা যাওয়ার পর বোস কেবিনের হাল ধরতে হয় তাকেই।

 

বোস কেবিনের যাত্রা : এন্ট্রাস (বর্তমানে এসএসসি) পাশ করার পর চাকরী করবে না বলে ২০ বছর বয়সেই বাড়ি থেকে বের হয়ে যান বিক্রমপুরের ষোলঘরের বাসিন্দা নৃপেন্দ চন্দ্র বসু। জীবিকার উদ্দেশ্যে নারায়ণগঞ্জে আসেন। প্রথমে পাটের সাথে জড়িত হলেও তারপর অসুস্থতার ফলে তা আর সম্ভব হয়ে উঠেনি। পরে ১৯২১ সালে নারায়ণগঞ্জের ১নং রেল গেটের পাশেই একটি ছোট্ট টঙ ঘরে কড়া লিকারের চাকে সম্বল কওে বিস্কুট, রুটি নিয়ে ছোট্ট রেঁস্তোরা শুরু করেন নৃপেন্দ ওরফে ভুলুবাবু।

 

পারিবারিক পদবির সাথে সামঞ্জস্য রেখে রেস্তোরাটির নাম দেয়া হয় নিউ বোস কেবিন। শুরু থেকেই তার কড়া লিকারের সুগন্ধি চা বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠে নারায়ণগঞ্জে। এমনকি এই কড়া লিকারের চায়ের চুমুক দিয়ে আকৃষ্ট হয়েছিলেন নেতা সুভাষ চন্দ্র বসুও। আরো জানা গেছে, ‘১৯৩৭ সালে একবার নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু নারায়ণগঞ্জে এসেছিলেন। পুলিশ নারায়ণগঞ্জের সেন্ট্রাল বন্দর ঘাট থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে যায়। খবর পেয়ে ভুলুবাবু নেতাজির জন্য কড়া ও হালকা লিকারের দুই কেটলি চা বানিয়ে থানায় ছুটে যান।

 

সেই চা খেয়ে খুশি হয়ে দাদাকে আশীর্বাদ করেছিলেন। বোস কেবিনে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, সাহিত্যিক সৈয়দ শামসুল হকসহ ব্রিটিশ শাসনামল ও পাকিস্তান শাসনামলে রাজনৈতিক আন্দোলনের সময় নারায়ণগঞ্জসহ অন্যান্য অঞ্চলের তৎকালীন জাতীয় রাজনীতিবিদ, কবিসাহিত্যিক, সাংবাদিক ও নানা গুণীজনের আড্ডাস্থল ছিলো এখানে। ধীরে ধীরে বোস কেবিন আরো পরিচিত ও জনপ্রিয় হয়ে উঠে।

 

এছাড়াও নানা দিক থেকে সব থেকে বেশি জনপ্রিয়তা লাভ করেছে এই বোস কেবিনের আড্ডা। কিন্তু এই নগরীর প্রাণের নিশ্বাসের আড্ডটাকে বন্ধ করতে চলছে নানা ছলনা ঘটনা। দীর্ঘদিন যাবৎ দেশের বাহিরে এই ‘বোস কেবিনের মালিক অবস্থান করায় সম্প্রতি এটা বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে এমনি দেখা যাচ্ছে পত্রপত্রিকা ও শোনা যাচ্ছে মানুষের মুখে মুখে হাটেল কর্মচারীরা জানায়, ১০ বছর পূর্বে তারক বোস তার স্ত্রী ও সন্তানদের ভারতের কলকাতায় পাঠিয়ে দেন। পরবর্তীতে ৫/৬ মাস পূর্বে তার স্ত্রী অসুস্থ বলে সে ও ভারত যায়।

 

কিন্তু এখানো আসেনি যার কারণে তারক বোস সাহেবের মা বর্তমানে এসে আমাদের দোকানের বিক্রিকৃত টাকা নিয়ে যায়। আর কলকাতা থেকে তারক বোস সাহেব ও মাঝে মাঝে ম্যানেজার সাহেবকে কল দেয় কিন্তু কখনো বলে নাই এই প্রতিষ্ঠান বিক্রি হয়েছে। এ দিকে বোস কেবিনের ম্যানেজার সুজিত কুমার যুগের চিন্তাকে বলেন, আমরা এখনো শুনি নাই যে আমাদের এই ‘বোস কেবিন’ বিক্রি করা হয়েছে। আমরা ও নানা পত্র পত্রিকা মাধ্যমে দেখতে পাচ্ছি যে এই বোস কেবিন বিক্রি হয়ে গেছে।

 

আর এখানো পর্যন্ত আমাদের প্রতিষ্ঠানের মালিক আমাদের বলে নাই যে প্রতিষ্ঠান বিক্রি হয়েছে। এখনো তার মা নিয়মিত এসে দোকানের বিক্রিয়কৃত টাকা নিয়ে যায়। আর বর্তমানে ‘বোস কেবিনের’ মালিক দেশের বাহিরে রয়েছে প্রায় ৫/৬ মাস যাবৎ কারণ  তার স্ত্রী গুরুত্বর অসুস্থ তাকে নিয়ে সেখানে তার স্ত্রী চিকিৎসাধীন রয়েছে।

 

আর যদি কোন সময় বা এখানো সে বিক্রি করে দেয় এই প্রতিষ্ঠান তা হলে তো আমাদের কিছু বলার নেই কারণ আমরা তো এখানকার পাটর্নার বা মালিক নই আমরা কর্মচারী। এদিকে বিক্রির আলোচনাকে ঘিরে নেতাকর্মীদের মাঝে ক্ষোভের ঝড় বইলে ও বলতে পারছে না প্রতিষ্ঠানটি মালিকানাধীন হওয়ার কারণে। কিন্তু দাবি জানিয়েছে বর্তমানে যে ‘বোস কেবিন’ নাম রয়েছে আগামীতে ও যেন এই একই নাম দ্বারা এটা পরিচালনা করা হয়।

 

এ বিষয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল হাই যুগের চিন্তাকে বলেন, এই বোস কেবিন একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান। বিগত দিনে এই প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিকসহ বিভিন্ন কবি সাহিত্যেরা আড্ডা দিয়েছেন। এই বোস কেবিনকে ঘিরে নানা কাহিনী রয়েছে রচিত রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে এটা বিক্রি হয়ে গেছে এমন কথা আমরা ও শুনতে পারছি।

 

কিন্তু কতটুকু সত্য তা আমরা ও জানি না। আর যেহেতু এটা মালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠান তাহলে এটা সেই মালিক বিক্রি করতেই পারে এখানে অনীহা করার কিছু‚ নেই। শুধূ এটাই বলতে চাই যার হাতেই এই প্রতিষ্ঠান পরিচালনা হোক না কেন। এই ঐতিহাসিক নাম বোস কেবিন এই নামেই যাতে আগামী দিনগুলোতে চলে। তাই আমি জোরদার দাবি জানাচ্ছি।

 

এ বিষয়ে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন যুগের চিন্তাকে বলেন, এই বোস কেবিন একটি মালিকানা প্রতিষ্ঠান আর এটার মালিক যদি ব্যবসা না করে তাহলে তো বিক্রি করে দিবেই মলিকতো ঐতিহ্য বুঝবে না। কারণ এটার মেইন মালিক ছিল বসু সাহেব যিনি এখন আর বেঁচে নেই। আর এই বোস কেবিন যে বিক্রি হয়ে গেছে। এটা তো আমরা নারায়ণগঞ্জবাসী জানি ও না। পরে নানা পত্র পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পেলাম।

 

আর আমি ও সেখানে কোভিডের পর থেকে আর যাতায়াত করি না। আর এটাকে ঘিরে নানা ঐতিহ্যর ঘটনা রয়েছে যা বলে শেষ করা যাবে না। কিন্তু বর্তমানে আমাদের একটাই চাওয়া এই বোস কেবিনের দায়িত্ব যার হাতেই যায়। দীর্ঘদিন যাবৎ যেভাবে পরিচালনা করা হচ্ছে এভাবেই যাতে পরিচালনা হয়।

 

এ বিষয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম যুগের চিন্তাকে বলেন, এই বোস কেবিনকে ঘিরে নানা ঐতিহ্য রয়েছে যার কারণে আমি জোরদার দাবি জানাচ্ছি যে, এই বোস কেবিনের মালিকানা চেঞ্জ হোক কিন্তু নাম যাতে চেঞ্জ না হয়। আমরা বাপ-দাদার আমল থেকে যে নাম দেখে আসছি আগামীতে ও যে মালিকের হাতেই এই প্রতিষ্ঠান থাকুক না কেন। নাম যেন ‘বোস কেবিন’ থাকে।

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন