বিভীষিকাময় সেই তল্লা বিস্ফোরণের তিনবছর পূর্তি আজ
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ১০:৫৬ পিএম
৪ সেপ্টেম্বর, ২০২০ সালের ঠিক এই দিন রাতেই ফতুল্লা থানার নারায়ণগঞ্জ শহর সংলগ্ন পশ্চিম তল্লা এলাকায় পশ্চিম তল্লা বাইতুস সালাত জামে মসজিদে ঘটেছিল এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডি। যার কারণে নিভে গেছে শিশুসহ ৩৪টি তাজা প্রাণ। দগ্ধ হয়ে আহত হয়েছেন আরও চারজন। নিজেদের বাঁচাতে নর্দমার পানিতে ঝাঁপ দিয়েও শেষ রক্ষা হয়নি তাদের।
এখনও সেই ঘটনার কথা মনে করে আঁতকে ওঠেন অনেকে। সেই ঘটনায় স্থানীয়দের কাছ থেকে অভিযোগের আঙ্গুল ওঠে তিতাস ও বিদ্যুতের কিছু অসাধু কমকর্তা ও কর্মচারীর বিরুদ্ধে। মসজিদ কমিটির ব্যবস্থপনা কমিটিকেও দায়ী করেন কেউ কেউ।
বিস্ফোরণের ওই ঘটনায় ফতুল্লা মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) হুমায়ুন কবির বাদী হয়ে তিতাস গ্যাস, ডিপিডিসি, মসজিদ কমিটিসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে মামলা করেন। সেই ঘটনায় ফায়ার সার্ভিস, জেলা প্রশাসন, তিতাস গ্যাস, ডিপিডিসি ও সিটি করপোরেশনের পক্ষ হতে পৃথক পাঁচটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
আদালতের নির্দেশে অভিযুক্তের তালিকায় তিতাস গ্যাসের আট কর্মকর্তা-কর্মচারীর নামও অন্তর্ভূক্ত করা হয়। সেই ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনার পর দীর্ঘ এক বছর মসজিদটি বন্ধ থাকে পরের বছর ২৯ আগষ্ট ৬টি শর্তে জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছিল।
ঘটনার বিবরণে জানা যায়, প্রতিদিনের মতো সেদিন রাতেও বাইতুস সালাত জামে মসজিদে এশার নামাজ পড়তে আসেন মুসুল্লিরা। ইমামের পেছনে ৪ রাকাত ফরজ নামাজ আদায় করে কেউ কেউ বেরিয়ে যান। তবে বেশিরভাগ মুসুল্লিই ভেতরে সুন্নত নামাজ আদায় করছিলেন। এসি চালানো থাকায় গ্যাসের দরজা ও জানালাগুলো ছিল বন্ধ।
এই সময়ের মধ্যে মসজিদের ভিতরে তিতাসের গ্যাস জমে পুরো মসজিদই পরিণত হয় গ্যাস চেম্বারে। তাই যখন বিদ্যুৎ চলে যায় তখন বিদ্যুতের ফেজ পরিবর্তন করার জন্য চেঞ্জওভার সুইচের মাধ্যমে ফেজ চেঞ্জ করার সাথে সাথেই সেই সুইচ থেকে সৃষ্ঠ স্পার্ক থেকে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে।
সঙ্গে সঙ্গে মসজিদের ভেতরে থাকা মানুষগুলোর শরীর ঝলসে যায়। কারও কারও শরীরে কোনো কাপড়ই ছিল না। এরপরেই এলাকাজুড়ে শুরু হয় হুড়োহুড়ি। ঝলসে যাওয়া মানুষগুলোকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতাল থেকে কয়েকজন সুস্থ হয়ে ফিরে আসতে পারলেও সেদিনে সেই ঘটনায় ৩৪ জনের জীবন প্রদীপ নিভে যায়।
সেই ঘটনায় নিহতদের মধ্যে ছিলেন পশ্চিম তল্লা বাইতুস সালাত জামে মসজিদের ইমাম আবদুল মালেক নেসারি (৪৮), মুয়াজ্জিন দেলোয়ার হোসেন (৪৫) ও তার ছেলে কুমিল্লার নাঙ্গলকোটের বাসিন্দা জুনায়েদ হোসেন (১৬), মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবদুল হান্নান (৫০), স্থানীয় ফটো সাংবাদিক মোহাম্মদ নাদিম (৪৫)।
তল্লার বাসিন্দা নূর উদ্দিনের বড় ছেলে নারায়ণগঞ্জ কলেজের ছাত্র সাব্বির (২১) ও মেজ ছেলে তোলারাম ডিগ্রি কলেজের উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্র জোবায়ের (১৮), জুলহাস উদ্দিন (৩০), মুন্সিগঞ্জের লৌহজং উপজেলার হাটবুকদিয়া গ্রামের কুদ্দুস ব্যাপারী (৭২), ইমরান (৩০), আবুল বাশার (৫১), মোহাম্মদ আলী মাস্টার (৫৫)।
জেলা প্রশাসনের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী শামীম হাসান (৪৫), পশ্চিম তল্লার বাসিন্দা হুমায়ুন কবির (৭২), চাঁদপুর সদর উপজেলার করিম মিজির ছেলে মোস্তফা কামাল (৩৪), ফতুল্লার পোশাক কারখানার শ্রমিক জুলহাস ফরাজীর ছেলে জুবায়ের ফরাজী (৭), পটুয়াখালীর গলাচিপার আবদুল খালেক হাওলাদারের ছেলে পোশাক শ্রমিক মো. রাশেদ (৩০)।
পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার কাউখালী গ্রামের জামাল আবেদিন (৪০), পোশাক শ্রমিক ইব্রাহিম বিশ্বাস (৪৩), নারায়ণগঞ্জ কলেজের উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষার্থী রিফাত (১৮), চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী মাইন উদ্দিন (১২), নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার মো. জয়নাল (৩৮)।
লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার তালুকপলাশী গ্রামের মেহের আলীর ছেলে পোশাক শ্রমিক মো. নয়ন (২৭), ফতুল্লার ওয়ার্কশপের শ্রমিক কাঞ্চন হাওলাদার (৫০), শ্রমিক মো. রাসেল (৩৪), বাহার উদ্দিন (৫৫), নিজাম ওরফে মিজান (৪০), আবদুস সাত্তার (৪০), শেখ ফরিদ (২১), নজরুল ইসলাম (৫০), ফতুল্লার নিউখানপুর ব্যাংক কলোনির আনোয়ার হোসেনের ছেলে রিফাত (১৮)।
অভিযোগপত্রে মসজিদ পরিচালনায় কমিটির অবহেলা-অব্যবস্থাপনা, উদাসীনতা, সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ না করা, কারিগরি দিক বিবেচনা না করে অবৈধ বিদ্যুৎসংযোগ ঝুঁকিপূর্ণভাবে লাগানো, গ্যাসের উপস্থিতি পেয়েও মুসল্লিদের জীবনের নিরাপত্তায় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা না নেওয়া, ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির মিটার রিডার কালেক্টর ও ইলেক্ট্রিশিয়ানদের মসজিদে অবৈধ বিদ্যুসংযোগ দেওয়াসহ তিতাস গ্যাসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্বে অবহেলা, গ্যাসলাইন সঠিকভাবে তদারকি না করা, পাইপের লিকেজ মেরামত না করা, গ্যাসলাইন ঝুঁকিপূর্ণভাবে স্থাপন এবং স্থানান্তর না করাকে এি দুর্ঘটনার কারণ বলে চিহ্নিত করা হয়।
জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটির ৪০ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন রিপোর্টেও দায়ী করা হয় তিতাস, ডিপিডিসি ও মসজিদ কমিটিকে। তদন্তে গ্যাস লাইনে লিকেজ, বিদ্যুতের সর্ট সার্কিট, মসজিদ কমিটির অবহেলা ও রাজউকের অব্যবস্থাপনাকে বিস্ফোরণের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।
প্রতিবেদন দাখিলের পর তদন্ত কমিটির প্রধান খাদিজা তাহেরা ববি জানিয়েছিলেন, তদন্ত প্রতিবেদনে তিতাস গ্যাস পাইপের লিকেজ, বিদ্যুৎ বিভাগের ত্রæটি, মসজিদ কমিটির গাফিলতি, ভবন নির্মাণে রাজউকের অব্যবস্থাপনা এবং মসজিদের সামনের রাস্তা নির্মাণে সংশ্লিষ্টদের অবহেলার বিষয়টি এসেছে।
এছাড়া এসব অনিয়ম রোধে তদন্ত কমিটি জেলা প্রশাসকের কাছে ১৮টি সুপারিশ পেশ করেছে। এর মধ্যে মসজিদ নির্মাণের আগে আর্কিটেক্ট দিয়ে নকশা ডিজাইন করা, মসজিদ বা সরকারি প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ ও গ্যাস লাইন সংযোগের ব্যাপারে ম্যাপ আকারে বিভিন্ন দিক নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে।
সেই বিভীষিকাময় রাতের কথা মনে হলে এখনও বুক কাঁপে বলে জানান তল্লাবাসি আনিসুর রহমান। তিনি বলেন, বিস্ফোরণের শব্দের পর মানুষের আর্তনাদের সেই করুন সুর এখন তল্লাবাসির কানে বাজে। সেই ঘটনায় যারা প্রাণ হারিয়েছেন শুধু তাদের পরিবারের সদস্যরাই না, সেই দুঃসহ স্মৃতি ভুলতে পারেননি তল্লাবসি তথা নারায়ণগঞ্জবাসী। এন.হুসেইন রনী /জেসি


