Logo
Logo
×

বিশেষ সংবাদ

চালকদের ঔদ্ধত্য আচরণে বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনা

Icon

লতিফ রানা

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ০৯:১৮ পিএম

চালকদের ঔদ্ধত্য আচরণে বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনা
Swapno

 

# অতিরিক্ত লোডসহ উচ্চ গতির কারণে প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা
# এসব গাড়ির চালকগণ নিজেদেরকে রাস্তার রাজা মনে করে

 

 

সিমেন্ট কারখানার বিভিন্ন মালবাহী গাড়ির চালকদের অতিরিক্ত লোড ও অতিরিক্ত গতিসহ বেপরোয়া গাড়ি চালানোর কারণে নারায়ণগঞ্জ জেলার বিভিন্ন জায়গায় সংঘটিত একের পর এক দুর্ঘটনায় কেড়ে নিচ্ছে মানুষের প্রাণ। কিছুদিন পরপরই এসব যানবাহনের চাপায় পিষ্ট হয়ে পথচারী ও যাত্রীরা প্রাণ হারাচ্ছেন বলে খবর হচ্ছে মিডিয়ায়। এসব কোম্পানীর মালিকগণ খুবই প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের গাড়ি চালকদের দাপট কোন অবস্থায়ই কমানো সম্ভব হচ্ছে না।

 

এসব কোম্পানী ও চালকদের বিরুদ্ধে একাধিকবার আন্দোলন, মানববন্ধন ও অভিযোগ উঠলেও কোন এক অজানা কারণে প্রশাসনকে কোন কঠোর ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। একই সাথে এসব গাড়ি চালকদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় তারা দিনকে দিন আরও বেপরোয়া হয়ে যাচ্ছে বলে মনে করেন নারায়ণগঞ্জবাসী। এসব সিমেন্ট কারখানা শহর ও তার আশে পাশের এলাকায় হওয়াতে তাদের যানবাহনগুলোকে শহর ও তার আশেপাশের এলাকা দিয়েই চলাচল করতে হয়।

 

তাছাড়া এই গাড়িগুলো আকারে অনেক বড় হওয়ায় এবং কোম্পানীর মালিকগণ অনেক প্রভাবশালী হওয়ায় তারা রাস্তা দিয়ে চলার সময় অন্য কোন গাড়িকে কোন প্রকার পাত্তাই দিতে চায় না। যার ফলে এসব গাড়ির ভয়ে অন্যান্য গাড়িসহ এসব এলাকার যাত্রী ও পথচারীরা সব সময় আতঙ্কে থাকে।

 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নারায়ণগঞ্জের বন্দরে আকিজ সিমেন্ট, সিমেক্স সিমেন্ট (ইনসি), বসুন্ধরা সিমেন্ট, সিদ্ধিরগঞ্জে ইস্টার্ন (সেভেন হর্স) সিমেন্ট, সোনারগাঁয়ের আমান সিমেন্ট, লাফার্জ মোংলা সিমেন্ট, হোলসিম সিমেন্ট, ইউনিক সিমেন্ট, এমটিসি (মদিনা) সিমেন্ট ও আনোয়ার সিমেন্টর কারখানার অবস্থিত। এর বাইরে মুন্সীগঞ্জের মুক্তারপুরে রয়েছে শাহ সিমেন্ট, ক্রাউন্ট সিমেন্ট, প্রিমিয়ার সিমেন্ট, মেট্রোসেম সিমেন্ট ও ইমিরেটস সিমেন্ট কারখানা।

 

যদিও মুন্সীগঞ্জের কারখানাগুলো নারায়ণগঞ্জের বাইরে, তবুও এসব সিমেন্ট কারখানার ট্রাকগুলোও মুক্তারপুর থেকে নারায়ণগঞ্জের পঞ্চবটি-ফতুল্লার উপর দিয়ে চলাচল করে রাজধানী ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করে। কিন্তু এই সড়কটি খুবই সরু ও পুরানো হওয়াতে সিমেন্ট কোম্পানির ট্রাকগুলোর বেপরোয়া গতির কারণে এখানে প্রায়ই সড়ক দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটে। এরই মধ্যে তাদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ কেড়ে নিয়েছে বেশ কিছু প্রাণ।

 

আর মলিক পক্ষের আশকারাতে তাদের চালকগণ এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করার সাহস পায় বলে মনে করেন নারায়ণগঞ্জবাসী। যার কারণে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কর্মসূচীর মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জে সচেতন মহল প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেও কোন ফলাফল পায়নি বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। তাছাড়া এসব যানবাহনের অতিরিক্ত লোড ও বেপরোয়া গতির কারণে এখানকার রাস্তাগুলো খুব দ্রুত অর্থাৎ নির্দিষ্ট মেয়াদের আগেই ভেঙে পড়ে এবং দুর্ভোগসহ দুর্ঘটনার শিকার হয় সাধারণ জনগণ। গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যনেই তার চিত্র ফুটে ওঠে।

 

বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১ সেপ্টেম্বর সকালে ফতুল্লার বিসিক এলাকায় দ্রুতগামী শাহ সিমেন্টের কাভার্ড ভ্যানের চাপায় নিহত হয় মিশুক চালক সালাউদ্দিন (২২)। এই ঘটনায় গুরুতর আহত হয় মিশুকে থাকা তিনজন যাত্রী। তাদের উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। গত ১ জুলাই ফতুল্লার কাশিপুরে শাহ সিমেন্টের ট্রাকচাপায় নিহত হয় আসিফ ইকবাল হৃদয় (২৬)। হৃদয় মুন্সীগঞ্জের সরকারি হরগঙ্গা কলেজের অনার্স তৃতীয় বর্ষের (প্রাণি বিজ্ঞান) ছাত্র ছিল।

 

এ ঘটনায় আশপাশের লোকজন ট্রাক চালককে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে। ২০২১ সালের অক্টোবরে একই রাতে দুটি আলাদা ঘটনায় সিমেন্টের গাড়ির চাপায় মারা যায় দুজন। সাড়ে ১০টায় শাহ সিমেন্ট কারখানার ট্রাকচাপায় মারা যায় ফতুল্লা প্রেসক্লাবের সদস্য সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম জনি। একই রাত ৯টায় সিমেন্টের গাড়ির চাপায় সিমা বেগম (২৬) নামে এক গৃহিণীর মৃত্যু হয়। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে গোগনগর এলাকায় প্রিমিয়ার সিমেন্টের কাভার্ডভ্যানের চাপায় মারা যায় অটোরিকশা চালক জামাল হোসেন (৪০) ও যাত্রী মাসুদ মিয়া (৪২)।

 

একই বছরের আগস্টে বন্দরে আকিজ সিমেন্ট কারখানার ট্রাকের চাপায় নিহত হয় স্থানীয় কদম রসূল শিশুবাগ কিন্ডার গার্টেন স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র সাফায়াত। এই ঘটনার আগুন জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে এলাকাবাসী। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে বন্দরের বসুন্ধরা সিমেন্ট কারখানার গেটের সামনে সিমেন্টবোঝাই কভার্ডভ্যানের চাপায় ট্রাক হেলপার নিহত হয়। একই বছরের ফেব্রুয়ারিতে বন্দরের ফরাজীকান্দায় সিমেক্স (ইনসি) সিমেন্ট কারখানার ট্রাক চাপায় নিহত হয় অটোরিকশা চালক দুই সন্তানের জনক আপন (২৮)।

 

২০১৬ সালের জুনে বন্দরের হাজীপুর বাস স্ট্যান্ড এলাকায় বসুন্ধরা সিমেন্টবাহী ট্রাকের চাপায় নিহত হয় সিএনজি চালক সেকান্দর আলী (২৮)। পরের দিন সিএনজি চালকরা বন্দরের সকল সিএনজি বন্ধ রেখে বসুন্ধরা সিমেন্ট ফ্যাক্টরীর সামনে বিক্ষোভ করলে বসুন্ধরা কর্তৃপক্ষ নিহতের পরিবারকে ৫ লাখ ৫ হাজার টাকা ক্ষতি পূরণ দেয়ার ঘোষণা দিলে বিক্ষোভ বন্ধ হয়।

 

২০১২ সালের নভেম্বরে ফতুল্লার পঞ্চবটি মোড়ে ট্রাকের চাপায় পিষ্ট হয়ে নিহত হয় একটি রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মিতু সাহা (৩৮)। একই বছরের ৬ জুন নারায়ণগঞ্জে দায়িত্ব পালনের সময় কাশীপুর হাটখোলা এলাকায় সিমেন্ট ভর্তি একটি কাভার্ড ভ্যানের চাপায় নিহত হয় পুলিশের সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) আরিফুল হক আরিফ।

 

এর বাইরে গাড়ি উল্টে যাওয়া, খাদে পড়া ও রাস্তা ফেঁসে যাওয়াসহ বিভিন্ন দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে প্রতিনিয়ত। বন্দর ও ফতুল্লা এলাকার বিভিন্ন মানুষের সাথে আলাপ করে জানা যায়, সিমেন্ট কারখানার গাড়িগুলো আকারে অনেক বড় হয়। অন্যদিকে সিমেন্টের ব্যাগগুলো ওজনে অনেক ভারি হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসব গাড়িগুলোর ওজন মালসহ প্রায় ৪০ থেকে ৫০ টন। তাছাড়া এসব গাড়ির চালকরা যখন গাড়ি নিয়ে রাস্তায় নামে তখন তারা নিজেদেরকে রাস্তার রাজা মনে করে।

 

তারা মনে করে তারা কাউকে সাইড (পাশ দিয়ে যাওয়ার জায়গা করে দেওয়া) দিবে না। বরং তাদের ভয়েই সবাই তাদের সাইড দিবে। তাই রাস্তা সুরু নাকি প্রশস্ত, রাস্তায় গাড়ি বেশি নাকি কম তা নিয়ে এই চালকদের কোন মাথা ব্যথা নেই। তাছাড়া এই কোম্পানীগুলো অনেক টাকার মালিক ও প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের মানসিক একটি ঔদ্ধত্যভাব চলে আসে।

 

ফলে এমন হাই লোডের গাড়িগুলো যানবহুল এলাকায় চালানোর সময়ও তারা বেপরোয়া গতিতে চালায়। তাই হঠাৎ কোন প্রকার জরুরী অবস্থার সৃষ্টি হলে তারা ইচ্ছে করলেও গাড়ি দ্রুত থামাতে পারে না। এমনকি ইচ্ছে করলেই উচ্চ গতি ও অতিরিক্ত লোডের গাড়িগুলো হঠাৎ করে ডানে বা বামে নিতে পারে না। ফলে এ ধরণের দুর্ঘটনার ঘটনাগুলো ঘটছে বলে মনে করেন তারা। এস.এ/জেসি
 

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন