Logo
Logo
×

বিশেষ সংবাদ

শীতলক্ষ্যায় সেতুর গ্যারান্টি চায় বন্দরবাসী

Icon

লতিফ রানা

প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৩, ০৪:২২ পিএম

শীতলক্ষ্যায় সেতুর গ্যারান্টি চায় বন্দরবাসী

ফাইল ফটো

Swapno

 

# আর অঙ্গীকার নয়, সেতু বানিয়ে বুক ফুলিয়ে প্রচারের দাবি বন্দরবাসীর
# শুধু বন্দর ঘাট দিয়েই প্রতিদিন ২ থেকে ৩ লাখ লোকের পারাপার
# ফেরির জন্য অপেক্ষা করতে হয় কমপক্ষে আধ ঘন্টা
# গত কয়েক বছরে এই নদীর শুধু রূপগঞ্জ এলাকায় তৈরি হয় তিনটি সেতু

 

 

নারায়ণগঞ্জের শিল্প ও বাণিজ্যের ইতিহাসের অন্যতম সাক্ষী বন্দর। নারায়ণগঞ্জ যখন প্রাচ্যের ডান্ডি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে তখন আন্তর্জাতিকভাবে সমৃদ্ধ নারায়ণগঞ্জের শিল্প ও বাণিজ্য এলাকা এবং যে স্থানকে কেন্দ্র করে এই সুনাম অর্জন সেই নদী বন্দরের অন্যতম সাক্ষীও বটে এই বন্দর এলাকা। বর্তমানে যা বন্দর উপজেলা নামে পরিচিত। এই এলকাটি এখনও নারায়ণগঞ্জ সদরের অন্তর্ভুক্ত।

 

অথচ শুধু মাত্র একটি নদীর কারণে এই এলাকাটি শহরের বেশিরভাগ সুবিধা থেকেই বঞ্চিত। তাই এত কাছাকাছি থাকার পরও নারায়ণগঞ্জ শহর ও বন্দর এলাকার মানুষের জীবন যাত্রার মানেও আছে ব্যাপক পার্থক্য। যেখানে সোনারগাঁও কিংবা রূপগঞ্জ থেকে নারায়ণগঞ্জ শহরে আসতে সময় আধ ঘন্টার মতো সেখানে বন্দরবাসীর শুধু ফেরির জন্যই অপেক্ষা করতে হয় ঘন্টার পর ঘন্টা।

 

গত ২০০০ সালের পর থেকে রূপগঞ্জের উন্নয়নে যেখানে শীতলক্ষ্যা নদীর উপর তৈরি করা হয় তিনটি সেতু সেখানে বন্দরবাসীর যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়নে কোন সেতু নির্মাণ করা হয়নি। গত বছর যে বীর মুক্তিযোদ্ধা নাসিম ওসমান সেতুর উদ্বোধন করা হয় তা-ও বন্দরবাসীর ভাগ্যের কোন পরিবর্তন আনতে পারেনি। কিছুদিন আগেও নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের হোল্ডিং টেক্স বৃদ্ধির প্রতিবাদে যে কর্মসূচী পালন করা হয় তাতেও ফুটে ওঠে সেই চিত্র।

 

সেখানে শহর এবং বন্দরের জমির দাম, একই সাইজের ফ্ল্যাট (একই নির্মাণ খরচেও বটে)-এ ভাড়ার পার্থক্যসহ বিভিন্ন বৈষম্য তুলে ধরেন। তাই বন্দরবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি বন্দরের সাথে শহরবাসীর মিলবন্ধনের একটি সেতু নির্মাণের। কিন্তু কাজীর গরু খাতায় দেখা গেলেও গোয়ালে  আর ঠাঁই পায় না।

 

বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী শুধু মাত্র বন্দর ১নং খেয়াঘাট দিয়েই প্রতিদিন প্রায় দুই থেকে তিন লাখ লোক পারাপার হয়। শহর সংলগ্ন অন্যান্য ঘাটের হিসেব মিলালে যা প্রায় দ্বিগুন হয়ে যাবে বন্দরবাসীর দাবি। তাছাড়া গুরুতর অসুস্থ কোন রোগীকে শহরের হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসার জন্য দ্রুত আনা নেওয়ার জন্য নেই কোন ব্যবস্থা। হয় কাঁচপুর সেতু ঘুরে কিংবা মদনগঞ্জ-সৈয়দপুর (প্রায় মুন্সীগঞ্জের কাছাকাছি) ঘুরে শহরে আসতে হয়তো রোগীর প্রাণ বায়ু বের হয়ে যায়।

 

এর মধ্যে কাঁচপুর সেতু তৈরির দীর্ঘদিন পর ২০০৬ সালের অক্টোবরে কাঞ্চন ও পূর্বাচল এলাকার মধ্যকার কাঞ্চন সেতুটি উদ্বোধন করে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। ২০১০ সালে ডেমরা ও রূপগঞ্জের তারাবো এলাকায় সুলতানা কামাল সেতু উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত ২০২০ সালে রূপগঞ্জের মুড়াপাড়া-দড়িকান্দি এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদীর উপর ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে গোলাম দস্তগীর গাজী বীর প্রতীক সেতু উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

 

অর্থাৎ প্রায় ১৫ বছরের মধ্যেই শীতলক্ষ্যা নদীর উপর তিনটি সেতু করা হয় শুধু রূপগঞ্জে। অবশেষে গত বছরের ১০ অক্টোবর শীতলক্ষ্যা নদীর উপর দিয়ে বন্দর এলাকায় বীর মুক্তিযোদ্ধা নাসিম ওসমান সেতু নামের একটি সেতুর উদ্বোধন করা হয় এবং সেতুকেই বন্দরবাসীর সেই আকাঙ্খিত সেতু বলে চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন কিছু লোক। তবে বন্দরবাসী কখনও তা মনে করেন না।

 

আজও সেই বন্দর ১নং খেয়াঘাটে কিংবা নবীগঞ্জ ফেরিঘাটে ও খেয়াঘাটে গেলে বীর মুক্তিযোদ্ধা নাসিম ওসমান সেতু যে বন্দরবাসীর কাঙ্খিত সেই সেতু নয় তা বুঝা যায়। যানবাহনসহ বন্দরবাসীর পারাপারের জন্য যে ফেরির ব্যবস্থা করা হয়েছে তা অনেকটা ‘নাই মামুর চেয়ে কানা মামু ভালো’র মতোই মনের করেন বন্দরের জনগণ।

 

গতকালের চিত্রও দেখা যায় জোয়ারের সময় যানবাহনগুলো পানি ভেঙ্গে ফেরিতে ওঠছে। যা এখানকার নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার বলে জানান যাত্রীগণ। শুধু-ই-কি তাই! ঘাটে আসার পর যদি দেখেন ফেরিটি মাত্র ছেড়ে যাচ্ছে, আর আপনি সেই ফেরিতে ওঠার সুযোগ পাননি, তাহলে আপনার কমপক্ষে আধ ঘন্টা অপেক্ষা করতে হবে। তাছাড়া শুধুমাত্র ফেরির জন্য অতিরিক্ত কতক্ষণ সময় নির্ধারণ করে বের হতে হবে তারও কোন হিসেব কষতে পারেন না তারা। কারণ ফেরির ইজারাদারগণ খুবই শক্তিশালী, তাদের বিরুদ্ধে কথা বলারও দুঃসাহসও দেখায় না কেউ।

 

এর মধ্যে যদি জেলার কোন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এই ফেরি দিয়ে পার হওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করেন (হোক সে এমপি, হোক পুলিশ সুপার, হোক জেলা প্রশাসক কিংবা অন্য কোনো ভিআইপি) তাহলে-তো যাত্রীদের ভোগান্তির মাত্রা আরও কয়েকগুন বেড়ে যায়। ফেরিতে ওঠাতো দূরের কথা সেই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি না আসা পর্যন্ত ফেরিতে ওঠার রাস্তা মারাও যেন অপরাধ এমনভাবে পুলিশ প্রশাসন ফেরি ও রাস্তা একবারে ফাঁকা করে রাখেন। এরপরও আছে শহরের বড় বড় ভাই ও তাদের লোকজন।

 

সন্তান সম্ভবা এক রোগীকে নিয়ে নৌকায় করে নদী পার হওয়ার পথে বন্দর উপজেলার পদুগর এলাকার রাশিদা আক্তার ক্ষোভের সাথে বলেন, নির্বাচন আসলে ওয়াদা করে, এমনভাবে বলে যে, না বিশ্বাস করে উপায় থাকে না। সেই বিশ্বাসে ভরসা করে তাদের জনপ্রতিনিধি বানায়। তারপর ক্ষমতার চেয়ার বসার পরেই সেই ওয়াদার কথা ভুলে যায়। তাদের মুখের কথা মুখেই থেকে গেল, ব্রিজ আর হলো না।

 

তিনি জানান, অটোতে করে রোগীকে নিয়ে আসছিলেন ফেরি ঘাটে। এসে দেখেন ফেরিটি মাত্র ছেড়ে যাচ্ছেন। তাই জরুরী রোগীকে নিয়ে আর ফেরিতে ওঠতে পারেননি। অটো চালক তাকে জানিয়েছে ফেরি ভিড়ানোর পর যেকোন একটি ফেরি ফুল লোড না হলে ফেরি ছাড়বে না। তাতে কমপক্ষে আধঘন্টা দেরি হবে। রোগীর চিৎকারে তাই বাধ্য হয়েই তিনি অনেক ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় ওঠেন তাড়াতাড়ি যাওয়ার আশায়।

 

সব কিছু মিলিয়ে বন্দরবাসী শহরের সাথে দ্রুত ও নিরাপদ যোগাযোগের জন্য হাজীগঞ্জ-নবীগঞ্জ কিংবা একরামপুর-৫নং ঘাট এলাকায় একটি সেতু নির্মাণের দাবী দীর্ঘদিনের। সেই জাতীয় পার্টির সরকারের আমলে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের তৎকালীন সাংসদ একেএম নাসিম ওসমানের আমলে সেই দাবিটি অনেকটাই প্রকাশ্যে আসে।

 

এরপর ১৯৯১ সালে ক্ষমতায় আসার আগে বিএনপির সাংসদ এডভোকেট আবুল কালাম এই ব্রিজের অঙ্গীকার করেন কিন্তু ক্ষমতায় এসে ভুলে যান এবং ২০০৬ সালে বিএনপির শেষ সময়ে নবীগঞ্জ হাজীগঞ্জ ঘাট এলাকায় ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এরপর ২০০৮ সালে নির্বাচনের পূর্বে এই ব্রিজের অঙ্গীকার করেন নাসিম ওসমান। ২০১৪ সাল এবং এরপর বেশ কয়েকবার এই সেতুর প্রতিশ্রুতি দেন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী।

 

২০১৬ এবং ২০২২ সালের সিটি নির্বাচনের আগেও এই সেতুর অঙ্গীকার করেন মেয়র আইভী। ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে এই সেতুর অঙ্গীকার করেন নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের বর্তমান সাংসদ একেএম সেলিম ওসমান। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আবারও সেই অঙ্গীকার করেছেন এই সাংসদ। তবে বন্দরবাসী বিষয়টি নিয়ে খুবই হতাশ। তাদের দাবি জনপ্রতিনিধিগণ তাই এই সেতু নিয়ে আর কোন অঙ্গীকার না করে তা বাস্তবায়নের পর জনগণকে বুক ফুলিয়ে জানালে তাতেই তারা কৃতার্থ হবেন। এস.এ/জেসি
 

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন