Logo
Logo
×

বিশেষ সংবাদ

দুর্নীতির বরপুত্র মতির যেভাবে উত্থান

Icon

যুগের চিন্তা রিপোর্ট

প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০২৩, ০৮:৫৯ পিএম

দুর্নীতির বরপুত্র মতির যেভাবে উত্থান
Swapno

 

# সিদ্ধিরগঞ্জে তার নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে অপরাধীদের সাম্রাজ্য

 

 

সিদ্ধিরগঞ্জের আদমজী সুমিলপাড়ার আইলপাড়া এলাকার মৃত বাদশা মিয়ার ছেলে মতিউর রহমান মতি। আশির দশকের ৮৪/৮৫ সালে তিনি শিমুলপাড়া এলাকায় মুনলাইট সিনেমা হলের টিকিট ব্লাকে বিক্রি করতেন। তৎকালীন জাতীয় পার্টির নেতা সফর আলী ভুঁইয়ার হাত ধরে নাম লেখায় রাজনীতিতে। মজিবুর রহমান জজ, আতাউর রহমান ও মতিউর রহমান মতি, তারা তিন ভাই সফর আলী ভুঁইয়ার ক্যাডার হিসেবে হল গ্রুপ নামে একটি দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী গ্রুপের নেতৃত্ব দিত। 

 

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ৮৬/৮৭ সালের দিকে বিএনপির সাবেক সভানেত্রী আদমজী জুট মিলের ফুটবল মাঠে জনসভা করতে আসলে সফর আলী ভুঁইয়ার নির্দেশে তারা তিনজনসহ মোটা সামাদ মিলে সভা পন্ডুল করে দেয়। তখন তারা খালেদা জিয়াকে প্রবেশ করতে দেয়নি। সে সময় তারা বিপুল পরিমান ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায় এবং টেটা, ভল্লম ও রামদা সহ দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। এতে বিএনপির অসংখ্য নেতাকর্মী আহত হয়।

 

এছাড়াও নব্বই দশকে এসও রোড এলাকায় বিএনপির মিছিলে বোমা হামলা করে আলোচনায় আসেন মতি। ওই বোমা হামলায় মনা নামে এক পথচারী নিহত হয়েছিলেন। তার দুই বছর পর নিজ বাড়িসংলগ্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাদের উপর শাহ আলম বাবু নামে এক যুবককে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যা করার পর থেকেই তিনি বনে যান এলাকার ত্রাস।

 

জাতীয় পার্টি ছেড়ে যোগ দেন যুবলীগে। এলাকায় শুরু করেন বেপরোয়া চাঁদাবাজি। গড়ে তুলেন অপরাধ জগতের সাম্রাজ্য। ২০০১ সালে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান বিদেশে। পালিয়ে থাকা অবস্থায় ২০০৩ সালে কোন সম্মেলন ছাড়াই নারায়ণগঞ্জের এক প্রভাবশালী ব্যক্তির সুপারিশে ঘোষনার মাধ্যমে মতিকে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা যুবলীগের আহ্বায়ক করা হয়।

 

২০০৯ সালে আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসার পর দেশে এসে নারায়ণগঞ্জ আদালতে আত্নসমর্পন করে প্রায় ১ বছর জেল হাজত বাস করে জামিনে বের হয়ে ফিরে আসে এলাকায়। এরপর থেকেই বদলাতে থাকে তার ভাগ্য। গড়তে থাকেন অর্থের পাহাড়। ২০১৬ সালে নাসিকের দ্বিতীয় নির্বাচনে হন ৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর এবং প্যানেল মেয়র-২। তৃতীয় নির্বাচনেও তিনি বিজয়ী হন।

 

একদিকে জনপ্রতিনিধি অপরদিকে থানা যুবলীগের আহ্বায়ক হওয়ায় ক্ষমতাধর হয়ে উঠেন মতি। এলাকার অবৈধ আয়ের উৎস নিয়ন্ত্রনসহ বিভিন্ন খাত থেকে অবৈধ পন্থায় হাজার কোটি টাকার মলিক হয় মতি। ভারতে বাড়ি, মালয়েশিয়ায় বাড়ি, দুবাইতে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সহ শতকোটি টাকার সম্পদ গড়ে তুলেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

 

নব্বই দশক থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে হত্যা, বিস্ফোরক, দাঙ্গা-হাঙ্গামাসহ সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় ২৪টি মামলা হয়। যার মধ্যে ৩টি মামলা বিচারাধীন, ১টি হাইকোর্ট হতে স্থগিত আর বাকিগুলো খালাস ও আপোষ মিমাংশায় অব্যাহতি পায়। দুদকের মামলা চলমান থাকার পরও থেমে থাকেনি মতির অবৈধ সম্পদ অর্জনের গতি।

 

অবশেষে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়েরকৃত জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচার মামলায় নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের (নাসিক) ৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও সিদ্ধিরগঞ্জ থানা যুবলীগের আহ্বায়ক মোঃ মতিউর রহমান মতিকে জেল হাজতে প্রেরণ করেছে আদালত।

 

সোমবার (৬) সকালে মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ মোঃ আছাদুজ্জামানের আদালত শুনানি শেষে তাকে জেল হাজতে প্রেরণের নির্দেশ দেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দুদকের ঢাকা সমন্বিত জেলা কার্যালয় ১- নারায়ণগঞ্জ এর উপ-পরিচালক মঈনুল হাসান রওশনী।

 

আদালত সূত্র জানায়, কাউন্সিলর মতি মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত, ঢাকায় জামিনের জন্য আবেদন করেন। দীর্ঘ শুনানি শেষে মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ মো. আছাদুজ্জামান কাউন্সিলর মতির আবেদন না মঞ্জুর করে তাকে জেল হাজতে প্রেরণের নির্দেশ প্রদান করেন। দুদকের পক্ষে মোশাররফ হোসেন কাজল শুনানিতে অংশগ্রহণ করেন। ইতোপূর্বে আদালত কাউন্সিলর মতির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিল।

 

জানা যায়, ১৬ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো: মতিউর রহমান (মতি) ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের ঢাকা সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১ এর উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ইব্রাহিম বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। ২০২২ সালের ২২ ডিসেম্বর দুদকের তদন্তকারী কর্মকর্তা উপ-পরিচালক মোঃ ইব্রাহীম আদালতে মতি ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে পৃথক চার্জশিট দাখিল করেন।

 

আদালত সূত্র জানায়, তদন্তকালে আসামি মতিউর রহমান মতির নামে ১১ কোটি ৩৫ লাখ ৬৭ হাজার টাকা ও তার স্ত্রী রোকেয়া রহমানের নামে ৮ কোটি ১৪ লাখ ৮৫ হাজার টাকার অবৈধ সম্পদের তথ্য পায় দুদক। এর আগে ২০২১ সালের ৭ সেপ্টেম্বর দুদকে দাখিল করা সম্পদ বিবরণীতে মতিউর রহমান ৬ কোটি ৬২ লাখ ৮২ হাজার টাকা ও তার স্ত্রী রোকেয়া রহমান ২ কোটি ৪২ লাখ ৫৯ হাজার টাকার সম্পদের হিসাব প্রদর্শন না করে মিথ্যা তথ্য দেন।

 

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, প্রথম মামলায় কাউন্সিলর মো. মতিউর রহমানের (মতি) বিরুদ্ধে ৬ কোটি ১ লাখ ৭২ হাজার ২৬৫ টাকার সম্পদের তথ্য গোপনসহ ১০ কোটি ৮৬ লাখ ৫ হাজার ৬৩৯ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে। অন্যদিকে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ব্যাংকে ৮২ কোটি ৫১ লাখ ৪২৪ টাকা জমা করে পরবর্তীতে ৭৪ কোটি ১৩ লাখ ৮৮ হাজার ৬৮৯ টাকা উত্তোলন করে স্থানান্তর, রূপান্তর ও হস্তান্তর করে অবস্থান গোপন করার অভিযোগ আনা হয়েছে।

 

অন্যদিকে, অপর মামলার এজাহারে কাউন্সিলর মতির স্ত্রী রোকেয়া রহমানের বিরুদ্ধে ৫ কোটি ৬১ লাখ ১৮ হাজার ৩৯৭ টাকার জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও বিভিন্ন ব্যাংকে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় ১ কোটি ৮৬ লাখ ৬৭ হাজার ৩৯৫ টাকা জমা করে সেখান থেকে ১ কোটি ৮৫ লাখ ৭৬ হাজার ৩৯৮ টাকা উত্তোলন করে তা স্থানান্তর, রূপান্তর ও হস্তান্তরপূর্বক অবস্থান গোপন করার অভিযোগ আনা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪ এর ২৬ (২) ও ২৭ (১) ধারা ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ এর ৪ (২) ধারায় মামলাটি দায়ের করা হয়। এস.এ/জেসি

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন