আমিনুরের হাতে ঐতিহ্যের রিকশার সৌন্দর্য
শ্রাবণী আক্তার
প্রকাশ: ২৪ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৮:৩৮ পিএম
বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের হাল ধরতে ১৪ বছর বয়সে পেইন্টিং এর কাজ শিখে রিকশা চিত্রের কাজ করে যাচ্ছেন আমিনুর রহমান। তিন চাকার ঐতিহ্যবাহী নান্দনিক যান রিকশা। রং তুলি ব্যবহার করে গ্রাম বাংলার নানা দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হয় রিকশায়। আমিনুর জানান, ফুল-পাতা, ঘর-বাড়ি, তাজমহল, পাখি, গ্রাম বাংলার দৈনন্দিন জীবনের নানা দৃশ্য ইত্যাদি এঁকে থাকেন রিকশায়।
জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কোর বিমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে ঢাকার ‘রিকশা ও রিকশাচিত্র’। গত ৬ ডিসেম্বর বুধবার ইউনেস্কোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের আন্তসরকার কমিটির ১৮তম অধিবেশনে এ ঘোষনা দেওয়া হয়। এই ঘোষনার মাধ্যমে রিকশা ও রিকশাচিত্র বৈশ্বিক বিমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পায়। তবে বর্তমানে রিকশা ও রিকশাচিত্রের চাহিদা আগের তুলনায় কিছুটা কম।
নগরীতে তল্লা আইসক্রিম ফেক্টেরি এলাকায় সবচেয়ে পুরনো রিকশা তৈরির তিনটি দোকান অবস্থিত। যা প্রায় ৫০ বছরের পুরোনো। আগে আব্দুল্লাহ নামে এক আর্টিস্ট এখানে রিকশা চিত্রের কাজ করতেন। এখন রিকশার পেইন্টিং করেন ২০ বছর বয়সী যুবক আমিনুর রহমান।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নগরীতে শুধু তিনিই রিকশার পেইন্টিং করে থাকেন। ৬ বছর ধরে এই কাজের সাথে যুক্ত আছেন বলে জানান তিনি। এক সময় তার বাবার রিকশার হুড-বডির কারখানা ছিলো। ৭ বছর আগে হঠাৎ বাবা মারা যাওয়ায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পরে। সে সময় ৮ম শ্রেনিতে পড়ুয়া ছাত্র আমিনুর পড়ালেখা বন্ধ করে সংসারের হাল ধরতে আব্দুল্লাহ নামে একব্যক্তি (যিনি নারায়ণগঞ্জে দীর্ঘদিন রিকশার পেইন্টিং এর কাজ করেছেন) তার কাছে ৬ মাস পেইন্টিং করা শিখে কাজ শুরু করেন পেইন্টিংয়ের। এরপর থেকেই তিনি এই কাজের সাথে নিযুক্ত আছেন।
তিনি জানান, মাঝে মধ্যে আব্দুল্লাহ কাকা কাজ করেন তার পরিচিতদের। তিনি আমাকে ভালোবেসে স্নেহের সাথে কাজ শিখিয়েছেন উনি আমার এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা। তিনি প্রায় ৪৫ বছর এই পেশায় কাজ করেছেন। আরও জানান, করোনায় একেবারেই কাজ ছিলো না তাই সংসারের হাল ধরতে একটি মুদি দোকান ভাড়া নিয়েছিলেন। এখনও চালাচ্ছেন সেই দোকান। রিকশার চাহিদা কম থাকায় দোকান চালানোর পাশাপাশি দুপুর ১ টা থেকে ৩ টা পর্যন্ত রিকশায় পেইন্টিং এর কাজ করেন।
তিনি বলেন, কিছুদিন আগে রিকশা ও রিকশা চিত্র ইউনেস্কোর সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থার তালিকাভুক্ত হয়েছে এই সুবাদে যদি আমি ভালো কোথাও সুযোগ পেতাম তাহলে আমার জন্য এটা অনেক বড় পাওয়া হতো। এবং আমার পরিবারের জন্যও বেশ ভালো হতো।
দোকান মালিক এস এম ইউনুছ আলী জানান, নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন জায়গায় ছোট ছোট কিছু রিকশা তৈরির দোকান থাকলেও তল্লায় ব্যাপক। গাড়ি তৈরির কাজ আমার আব্বা শিখেছিলেন আমেরিকার লোকদের কাছ থেকে। সে সময় আমেরিকা-ইরাক থেকে লোক এসে এখানে রিকশা বানাতো। তাদের কাছ থেকে আমার আব্বা শিখে নিজে ব্যবসা শুরু করে। সে সময় থেকে আমাদের এই ব্যবসা তখন আমার আব্বা করতো এখন আমি করছি। আমি কবে রিকশা বানানো শিখেছি আমার মনে নেই। ছোটবেলা থেকে দেখতে দেখতে নিজেও জানি না কবে যে শিখে ফেলেছি। আমার আরো চার ভাই আছে তবে আমিই এই ব্যবসা ধরে রেখেছি।
তিনি আরোও বলেন, রিকশার বর্তমান চাহিদা আগের তুলনায় কম। মিশুক বের হওয়ার পর থেকে রিকশার চাহিদা কিছুটা কমেছে। তবে এ নিয়ে তার তেমন কোনো আক্ষেপ নেই। কারণ তিনি রিকশার পাশাপাশি মিশুকের পার্টস লাগানোর ও রং করার সরঞ্জামও রেখেছেন তার দোকানে। এস.এ/জেসি


