ভোট কেন্দ্রে যাওয়া নিয়ে যেসব কারণে ভোটারদের অনীহা
তানজিলা তিন্নি
প্রকাশ: ০৪ জানুয়ারি ২০২৪, ০৮:৫২ পিএম
নারায়ণগঞ্জ সহ পুরো দেশেই চলছে দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি। প্রার্থীদের মধ্যে ব্যস্ততা তবে নির্বাচনের ভোট গ্রহণের দিন ভোট কেন্দ্র যাওয়া নিয়ে মানুষ প্রকাশ করছেন অনিহা। মাঠ পর্যায়ের প্রচারণায় নির্বাচনে ক্ষমতাশীন দলের বিপক্ষে তেমন কানো শক্তিশালী দল মাঠে না থাকায় ভোটারদের ভোট দিতে যাওয়া নিয়ে তেমন কোনো আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। ভোটারদের ভোট কেন্দ্রে যাওয়া নিয়ে অনাগ্রহের সবচেয়ে বড় কারণ ভোটের সময় অনেক জায়গায় মারামারি, হামলা-ভাংচুর করা হয়।
ভোট এলেই এসব সহিংসতার মাত্র তুলনামূলকভাবেই বেড়ে যায় বলে মনে করেণ ভোটাররা। এছাড়াও রাজনৈতিক সহিংসতা, কোন্দল, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী প্রতিনিধি দিয়ে দেশ চালানোর প্রক্রিয়ায় ভোটাররা বেশ একটা খুশি নয়। সাধারণ ভোটাররা বলছেন যোগ্য প্রার্থী নিবার্চনে ভোটারদের উপস্থিতি বাড়ানো এবং ভোটের পরিবেশ সুরক্ষিত করা দরকার। তাহলেই ভোটারদের ভোট দিতে যাওয়া নিয়ে সংশয় থাকবেনা। অতীতের অভিজ্ঞতা ভালো না হওয়ায় ভোট দিতে যাওয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন অনেকেই।
ভোটের দেওয়ার সময় এসব অনিশ্চয়তার কারণে ভোটাররা ভোট কেন্দ্রে যেতে ভয় ভীত প্রকাশ করেণ। ভোটর আগের পরিবেশের সঙ্গে এখনকার পরিবেশের তুলনা করে অনেকেই বলেছেন, আগে ভোট আসলে মানুষ আনন্দের সাথে ভোট দিতে যেত। গ্রাম অঞ্চলে যোট বেধে সবাই ভোট দিতে গিয়ে নিজের পছন্দসই প্রার্থীকে ভোট দিতেন। আর এখন ভোটের দিন বাসা থেকে বের হবেন কিনা এ নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন। ভোটের আগেই মারামারি, হামলা, ভাংচুর লেগেই থাকে। ভোটের দিন তো বাসা থেকে বের হওয়াই মুশকিল হয়ে পরবে।
নারায়ণগঞ্জ জেলা নির্বাচন কমিশন কার্যলয় থেকে জানা যায়, বর্তমানে নারায়ণগঞ্জে মোট ভোটার সংখ্যা ২২ লাখ ৫০ হাজার ৬৯১ জন। ভোটারদের মধ্যে পুরুষ ১১ লাখ ৪৪ হাজার ৪৪৯ জন ও নারী ১১ লাখ ৬ হাজার ২২৫ জন। আগামী ৭ জানুয়ারী অনুষ্ঠিত হবে দ্বাদশ জাতীয় নিবার্চন। গত বছর ১৫ নভেম্বর সন্ধা ৭টায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার এই তফসিল ঘোষণা করেন। নারায়ণগঞ্জ-১ আসনে এবার ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৮৫ হাজার ৬৬৫ জন।
নারায়ণগঞ্জ-২ আসনে ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৩১ হাজার ৭৭৯ জন। নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে ভোটার রয়েছে ৩ লাখ ৪৪ হাজার ৭২০ জন। নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৬ লাখ ৯৪ হাজার ২০৭ জন এবং নারায়নগঞ্জ-৫ আসনে বর্তমান ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৯৪ হাজার ৩২০ জন। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জের পাচঁটি সংসদীয় আসনে নতুন ভোটার বেড়েছে ২ লাখ ৩৭ হাজার ৮৫ জন।
এদিকে নতুন ভোটার যারা আছেন তারা জীবনের প্রথম ভোটাধিকার এখনো প্রয়োগ করবে বলে তাদের মধ্যে আলাদা একটা আগ্রহের দেখা মিলছে। তবে অনেকেই আতংকও প্রকাশ করেছন। তরুন ভোটারদের মধ্যে অনেকেই বলছেন, এলাকার সুবিধা-অসুবিধাগুলো দেখবে যারা, সন্ত্রাস, দুর্নীতির বিরুদ্ধে থাকবে নির্যাতনের প্রতিরোধ করবে এমন প্রার্থীকেই আমরা ভোট দিয়ে বেছে নিবো। তবে ভোটের দিন কোনো সহিংসতার কবলে পড়তে চাই না। নিজের ভোটটা যেন শান্তিপূর্ন ভাবে দিতে পারি এটাই কামনা করছি।
২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময় নারায়ণগঞ্জ এ অনেক ভোট কেন্দ্রে মারামারির কবলে পড়া অনেক ভোটারাই এবছর ভোট কেন্দ্রে না যাওয়াই মঙ্গল বলে মনে করেছেন। এদের মধ্যে বাবুরাইল বউবাজারের জাহাঙ্গির নামের একজন মুদি দোকান ব্যবসায়ী যুগের চিন্তার প্রতিবেদকের সাথে ২০১৮ সালের ভোট দিতে যাওয়ার অভিজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, আগে তো ভোটের দিন সকালে উঠেই ভোট দিতে চলে যেতাম কিন্তু গত বার ভোটের সময় ভোট দিতে গিয়ে নিজের জীবনটাই ঝুঁকির মুখে ফেলেছিলাম।
বাসার সবাইকে সাথে নিয়ে ভোট দিতে গিয়ে মারামারির মধ্যে পড়েছিলাম। আর একবার যদি প্রান হারাই তো ভোট দিয়ে কী করবো? ভোটারদের কাছে নির্বাচন উৎসবের আনন্দের। প্রতি ৫ বছর পর পর মানুষ ভোটের আমেজটা উপভোগ করেণ তবে সেখানে ভোট দিতে গিয়ে নিজের ভোট দেওয়ার নিশ্চয়তাই থাকে না। প্রানের ভয়ে শেষে ভোট কেন্দ্র থেকে এক প্রকার পালাতে হয়। এমন অবস্থায় কাইরা ভোট দিতে যেতে মন চায় বলেন?
কাশিপুর এলাকার ভোটার জনাব নুরুল ইসলামের কাছে ভোট দিতে যাবেন কিনা এমন প্রশ্ন করলে তিনি জবাবে বলেন, ভোট দিতে যাব কিনা সেটা এখোনো বলতে পারছিনা। ভোটের দিন বাসায় থেকে এলাকার মানুষের কাছে আগে শুনবো যে ভোট কেন্দ্রে কোনো ঝামেলা হয়েছে কিনা। যদি শুনি তেমন কোনো গন্ডগোল হয়নি তাহলে যাব ভোট দিতে আর নয়তো না। আবার ভোট কেন্দ্রে তো ভোট দিতে যাওয়ার আগেই ভোট শেষ হয়ে যাওয়ার ইতিহাস রয়েছে। তাই কষ্ট করে না গিয়ে আগে দখবো ভোটের দিন পরিস্থিতি কেমন তার পর না হয় যাব!
এ বছর নতুন ভোটার হওয়া কলেজ পড়ুয়া ছাত্র, ফারহান আহম্মেদ যুগের চিন্তাকে এবিষয় বলে, ভোটের দিন ভোট কেন্দ্রে যাব। এবছর জীবনের প্রথম ভোটটা উপভোগ করবো। বাবার কাছে শুনেছি আগের ভোটের সময় নাকি অনেক মজা হতো সবাই অনেক আনন্দ করতো। তবে এখন আমাদের এই সময় ভোট নিয়ে তেমন কোনো কিছুই লক্ষ্য করছি না। আমাদের এলাকায় নৌকার প্রার্থীর প্রচারণা ছাড়া আর কোনো প্রার্থীকেই নজরে পড়েনি। কাউকে তেমন চিনিও না। তাই দেখি ভোটের দিন ভোটের পরিবেশ সুষ্ঠ থাকলে ভোট দিতে যাব অবশ্যই। জীবনের নতুন একটা অভিজ্ঞতা হবে আমার প্রথম ভোট দেওয়া।
নারায়ণগঞ্জ নিতাইগঞ্জ এলাকার এক নারী ভোটার বলেন, ২০১৮ সালে ভোট দিতে পারিনি। ভোট না দিয়েই এমপি পেয়েছি। আগামী নিবার্চনে নিজের ভোটটা নিজেই দিতে চাই। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট কেন্দ্রে গিয়ে নিরাপদে ভোট দিতে চাই। কিন্তু বর্তমানে ভোট দেওয়ার মতো পরিবেশ নেই বললেই চলে। ভোটের সময় বিভিন্ন গনমাধ্যমে প্রতিদিন কোনো না কোনা সংহিসতার খবর চোখে পড়বেই। এই অবস্থায় মানুষ ভোট দেওয়ার ইচ্ছাই হারিয়ে ফেলে। এস.এ/জেসি


