অনুষ্ঠিত হলো দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-২০২৪
লতিফ রানা
প্রকাশ: ০৮ জানুয়ারি ২০২৪, ০৭:৪২ পিএম
# কেন্দ্রের ভিতর ফাঁকা হলেও বাইরে ছিল ভীড়
# কেন্দ্রের ভিতর ছিল সমর্থকদের সেলফি তোলার হিড়িক
# ১০ বছর পর নৌকায় ভোট দিতে পারা অন্যরকম আবেগ : কায়সার
অনুষ্ঠিত হলো দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনে দেশের অন্যতম বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপি ও সমমনা দলগুলো অংশ না নেয়ায় সাধারণ জনগণের কাছে নির্বাচনের গুরুত্ব যে অনেকটাই কমে গেছে তার চিত্র দেখা গেছে গতকালে নির্বাচনের ভোটারদের উপস্থিতির হার দেখে।
অবশ্য নির্বাচন কমিশন থেকে এর আগেই বলা হয়েছিল যে, ‘যেহেতু এবার কিছু দল নির্বাচন বর্জন করেছে, তাই ভোটকেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি অবশ্যই কিছুটা চ্যালেঞ্জের।’ তবে ভোটারদের উপস্থিত করা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব নয় বলে কমিশন থেকে জানানো হয়। কমিশনের সেই ধারণারই প্রতিফলন ঘটেছে গতকাল অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়া নির্বাচনে।
সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত বেশ কয়েকটি কেন্দ্র পরিদর্শন করে ভোটারদের তেমন কোন উপস্থিতির দেখা মিলেনি। বিশেষ করে অন্যান্য নির্বাচনে এমনকি সাধারণ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও ভোট প্রদানের জন্য কেন্দ্রে ভোটারদের যে দীর্ঘ লাইন থাকে তার ছিটেফোঁটাও দেখা যায়নি গতকাল অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়া দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে।
তবে সেসব ভোটকেন্দ্রের দায়িত্ব থাকা প্রায় সকল অফিসারদের মুখে একই বক্তব্য ‘আপনারা আসার কিছুক্ষণ আগেও দীর্ঘ লাইন ছিল, কিন্তু এখন নেই।’ মজার বিষয় হলো সকল ভোট কেন্দ্রেই পর্যবেক্ষকদের উপস্থিত হওয়ার সময় ভোট কেন্দ্রে ভোটার সংখ্যা কমে যায় এবং এর কিছুক্ষণ আগেও দীর্ঘ লাইন ছিল বলে জানানো হয়। যা অন্যান্য নির্বাচনের ঠিক উল্টো চিত্র।
তবে কেন্দ্রের ভিতর ফাঁকা থাকলেও প্রতিটি কেন্দ্রের বাইরেই দেখা যায় স্থানীয় প্রভাশালীদের বিচরণ। কেন্দ্রের ভিতর ছিল না কোন নিয়ম কানুনের বালাই। কোন প্রভাবশালী প্রার্থী ভোট কেন্দ্রে ভোট প্রদান করতে আসলে তার সাথে ছিল সমর্থকদের ঢল।
কেন্দ্রের ভিতর প্রত্যেকের হাতেই ছিল মোবাইল ফোন; এবং ছিল নেতাদের সাথে সেলফি তোলার হিড়িক। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ছিল না কোন প্রকার বাধা। সেসব সেলফিবাজদের সাথে অনেকটা যুদ্ধ করে মিডিয়ার লোকদেরও ছবি নিতে হয়েছে। গতকাল নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের বিভিন্ন কেন্দ্র পরিদর্শনকালে এমন দৃশ্য চোখে পড়ে।
গতকাল সকাল সাড়ে নয়টার দিকে সোনারগাঁয়ের মোগরাপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের কেন্দ্রে স্বপরিবারে ভোট দিতে আসেন নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের নৌকা প্রার্থী আব্দুল্লাহ আল কায়সার। এ সময় তার সাথে কেন্দ্রের ভিতর ছিল নেতাকর্মীদের ঢল। ছিল মোবাইল ফোন দিয়ে সেলফি তোলার প্রতিযোগিতা। তবে সে সময় কেন্দ্রের বুথগুলোর সামনে ছিল না কোন ভোটার লাইন। এরমধ্যে হয়তো একজন দুজন আসছেন এবং ভোট দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছেন।
এর মাঝে বেশিরভাগ সময়ই নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের দেখা গেছে অলস সময় পার করতে। এ সময় এখানে দায়িত্ব থাকা নিরাপত্তা কর্মীদের কাছে ভোটার উপস্থিতি কম হওয়ার কারণ জানতে চাইলে তারা বলেন, বেলা বাড়ার সাথে সাথে হয়তো কিছু ভোটার আসবে। দুপুর বারোটার দিকে সোনারগাঁয়ের জামপুর ইউনিয়নের ৭ নং ওয়ার্ড এলাকার মহজমপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায় সেখানে কোন ভোটারদের কোন লাইনই নেই। হঠাৎ করে একজন দুজন আসছে ভোট দিতে।
সেই কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা প্রিজাইডিং অফিসার মো. এনামুল গণি জানান, এই কেন্দ্রে মোট ভোটার সংখ্যা ২ হাজার ১৭৮ জন। এখানে মোট ৫টি বুথে ভোট গ্রহণ করা হচ্ছে তাঁর দেওয়া তথ্য মতে এই কেন্দ্রে সকাল ১০ টা পর্যন্ত মোট ভোট সংগ্রহ করা হয়েছে ২৫৩টি এবং দুপুর ১২ টা নাগাদ সেখানে ভোট গ্রহণ করা হয়েছে ৭২১ জনের।
অর্থাৎ দুপুর ১২টার মধ্যেই ৩৩ শতাংশেরও বেশি ভোট গ্রহণ করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। কিন্তু এখানে ভোটারদের তেমন উপস্থিতি দেখতে না পাওয়ার সত্ত্বেও এত ভোট কিভাবে গ্রহণ করা হলো জিজ্ঞেস করলে কিছুক্ষণ আগেই এখানে দীর্ঘ লাইন ছিল বলে দাবি করেন তিনি।
সকাল সাড়ে দশটার দিকে মোগরাপাড়া বাড়িমজলিস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কেন্দ্রে গিয়েও কোন ভোটারদের লাইন দেখতে পাওয়া যায়নি। এসব কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা নিরাপত্তা কর্মীদের দেখা যায় অলস সময় পার করছেন। দুই-তিনজন এক সাথে বসে চা পান করাসহ আড্ডায় মেতেছেন। এখানে আরও বেশ কয়েকটি কেন্দ্র ঘুরে প্রায় একই চিত্র দেখা যায়।
এখানকার দায়িত্বে থাকা বেশিরভাগ অফিসারই জানান, না ভাই এখানে উপস্থিতি কম নয়, আপনারা আসার আগে এখানে দীর্ঘ লাইন ছিল। এমনকি এখানকার প্রায় সব কেন্দ্রের বাইরেই লোকজনের বেশ সমাগম দেখা যায়। ভিতরে কোন ভোটার নাই অথচ বাইরে এত লোক কেন জানতে চাইলে তারা সেই একই সুরে বলেন, ‘না ভাই, এখানে এতক্ষণ ভোটারদের দীর্ঘ লাইন ছিল।’
এ সময় নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতীকের প্রার্থী আব্দুল্লাহ আল কায়সার মিডিয়াকে বলেন, সকাল সকাল ভোট দেওয়ার অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। দীর্ঘ ১০ বছর পর নৌকা প্রতীকে ভোট দেওয়াতে একটি অন্যরকম আবেগ। আমরা এখানে যারা আছি (তার পরিবারের সদস্যগণ) তারা সবাই ১০ বছর পর নৌকা প্রতীকে ভোট দিয়েছি।
এজন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আমরা ধন্যবাদ জানাই। তিনি আরও বলেন, আমাদের সোনারগাঁয়ে এখন পর্যন্ত ভোট সুষ্ঠুভাবে হয়েছে এবং আমরা ভোটারদের ভালো উপস্থিতির খবর পাচ্ছি। ভোটারদের উপস্থিতি আশানুরূপ হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোন নাশকতা ছাড়া, সুষ্ঠু ভোটের আমাদের যে চ্যালেঞ্জটি ছিল, যাতে আমাদের এই আসনের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন না হয় আমরা সেদিকে এগিয়ে যাচ্ছি। এ বিষয়ে প্রশাসনের ভূমিকা প্রশংসনীয় বলেও জানান তিনি। এন. হুসেইন রনী /জেসি


