Logo
Logo
×

বিশেষ সংবাদ

হেলপার থেকে শত কোটি টাকার মালিক এস.এম রানা

Icon

যুগের চিন্তা রিপোর্ট

প্রকাশ: ২৫ জানুয়ারি ২০২৪, ০৮:০১ পিএম

হেলপার থেকে শত কোটি টাকার মালিক এস.এম রানা
Swapno

 

সদ্য জাতীয় দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে টানা তৃতীয় বারের মত নারায়ণগঞ্জ-৪ আসন থেকে শামীম ওসমান এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে তিনি ভূমিদস্যু, সন্ত্রাস, মাদক কারবারীদের বিরুদ্ধে মাঠে নামবেন। তৃতীয় মেয়াদে ১৯ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দায়িত্ব গ্রহণের পর দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেন। গুটি কয়েক ব্যক্তি আইনের আওতায় আসলেও বেশির ভাগই ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকেন।

 

অভিযোগ রয়েছে দুর্নীতির সাথে জড়িত এবং তাদের পিছনে শেল্টার দাতারা ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে যান। সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার সার্ভেয়ার কাউসার ৪২ লাখ টাকাসহ দুদকের জালে গ্রেপ্তার হওয়ার পর তা নিয়ে শহর ছাড়িয়ে পুরো জেলা সহ ঢাকায় ব্যfপক হৈ চৈ শুরু হয়ে গেছে। গ্রেপ্তার হওয়া কাউসারের সাথে জরিত থাকা সিদ্ধিরগঞ্জ রাজস্ব সার্কেলের সাবেক আউট সোর্সিং কর্মচারি জাহিদুল ইসলাম সুমনকেও এই ঘটনায় আসামী করা হয়।

 

কিন্তু এই সুমন ব্যবসায়ী রানার নাম বললেও তিনি এই ঘটনায় আসামী নেই। মামলা থেকে কেন তার নাম বাদ দেয়া হয়েছে তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে সচেতন মহলের। এই রানার পরিচয় এতোদিন আড়ালে থাকলেও এখন তা প্রকাশ হয়ে গেছে।

 

কাশিপুর গোগনগর ইউনিয়নের গিয়ে মানুষের সাথে কথা বললে তারা জানান, এসএম রানা মাদার প্রিন্টের মালিক। শীতলক্ষ্যা কদমতলীতে তার ফ্যাক্টরী। তিনি নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের সহ-সভাপতি হিসেবে রয়েছেন। এছাড়া তিনি শীতলক্ষ্যা একাডেমীর মাধ্যমে জেলা ক্রীড়া সংস্থার সেক্রেটারির সাথে ভালো সখ্যতা গড়ে তুলেন। তবে এই রানাকে গোগনগর কাশিপুর এলাকার মানুষ ভুমি দস্যু হিসেবে চিনেন।

 

কেননা তার বিরুদ্ধে জোর করে জায়গা দখলের অভিযোগ রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগি জানান, গোগনগর এলাকার ইয়াদ আলী নামের এক ব্যক্তির ৬২ শতাংশ জায়গা দখল করে রেখেছে মাদার প্রিন্টের মালিক এস এম রানা। ভুক্তভোগী জায়গার মালিক ওয়ারিশদের আইডি কার্ড নিয়ে তাদের জায়গা জাল দলিল করে নেন বলে জানান। এই জায়গার মূল্য আছে প্রায় পাচঁ কোটি টাকার মত হবে। গোগনগরবাসী বলছে দুদকের জালে গ্রেপ্তারকৃত সার্ভেয়ার কাউসার ও মামলার আসামী সুমনের মুখে নাম প্রকাশ হওয়াই হলো এই এস এম রানা।

 

একাধিক ব্যক্তি জানান, এই রানা ডিক্রিরচর ঘাট এলাকায় কোষ্ট গার্ড একোয়ারের জায়গা থেকে দুর্নীতি করে বেশি বিল নিয়েছে কিছু সার্ভেয়ার কাউসারের মত কিছু অসাধু সরকারি কর্মচারির সহযোগিতায়। কাশিপুরের ডাকাত গিয়াস ও তার ছেলে শামীমের মাধ্যমে সেখানে তিনি অসহায় ভূমি মালিকদের জায়াগা জোর করে কিনে নেন। এছাড়া পঞ্চবটি প্রধান পাম্পের বিল থেকে রানার সিন্ডিকেট চক্র ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেন।

 

এছাড়া গোগনগর ইউনিয়নের সৈয়দপুর ফকিরবাড়ি এলাকার ২১৬ নং দাগে প্রায় ১৮ শতাংশ জমির বিল রানার সহযোগি রনির মাধ্যমে হাতিয়ে নেন। ৪২ লাখ টাকাও তাদের মাধ্যমে লেনদেন হয়েছে বলে গুঞ্জন রয়েছে গোগনগর এলাকার মানুষের মাঝে। সিদ্ধিরগঞ্জ রাজস্ব সার্কেলের সাবেক সাভেয়ার ইকবাল, অস্থায়ী নিয়োগকৃত রানার সহযোগি রনি, কামালও তার এই অপকর্মের সিন্ডিকেট চক্রের সাথে জড়িত। তাদের হাত না কি অনেক উপরে এজন্য তাদের তেমন কিছু হয় না।  

 

অপরদিকে জেলার পঞ্চবটি মুক্তারপর ফ্লাইওভার নির্মাণের জন্য একোয়ার করেছে সেখানে ভুমি মালিকদের নানা ভাবে ভুল বুঝিয়ে তাদের থেকে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। যাদের জমি বাণিজ্য নয় অসাধু কর্মকর্তার সাথে যোগসাজশে তা বাণিজ্য দেখিয়ে বেশি বিল তৈরী করে বিশাল অর্থ নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া জায়গা একোয়ার হওয়া ভুমি মালিকদের গাছের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বেশি গাছ দেখিয়ে বিল তৈরী করেছেন।

 

কারো জায়গা তার নামে বায়না করে দিলে তাদেরকে  বেশি বিল পাইয়ের দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে তাদের থেকেও বিশাল টাকা হাতিয়ে নেন। আর এই ভাবে মানুষের সাথে প্রতারণা করে টাকা আত্মসাত করে নেয়ার অভিযোগ উঠে। যদি কেউ তার কথা না শুনে তাকে বাধ্য করা হত। তার ভুমি দস্যুতার লাগাম টানবে কে তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। জেলার প্রভাবশালী এমপির প্রভাবশালী শ্যালকের সাথে তার গভীর সম্পর্ক থাকায় তিনি এই অপকর্ম থেকেও রেহাই পেয়ে যাচ্ছেন।

 

তবে দুদক যারে ধরে, তিনি সহজে ছাড় পান না। তাই তাকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার দাবী জানান এলাকাবাসী। আর এই ভাবে পার পেয়ে গেলে তাদের অপকর্মের লাগাম টানা হয়কো হবে না।

 

প্রসঙ্গত, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে থেকে ঘুষের ৪২ লাখ টাকা ভর্তি কার্টন উদ্ধার করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। একই সঙ্গে ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত ডিসি অফিসের সার্ভেয়ার মো. কাওসার আহমেদকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৮ জানুয়ারি দুপুরে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

 

পরে তাকে আদালতে হস্তান্তর করা হয়। এই মামলায় সিদ্ধিরগঞ্জ রাজস্বের সাবেক আউট সোর্সিং কর্মচারি জাহিদুল ইসলাম সুমনকে আসামী করা হয়। ৪২ লাখ কার্টুন ভর্তি টাকা তার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়। ওই টাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ট্রেজারিতে জমা রাখা হয়। পরে গত ১৪ জানুয়ারি এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাহমুদুল হক দুদকে চিঠি দেন।

 

ইতোমধ্যে এই ঘটনার বিষয়ে তদন্তের জন্য অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট মৌসুমি বাইন হীরার নেতৃত্বে কমিটি গঠন করা হয়। তিনি যুগের চিন্তাকে জানান, ‘এই ঘটনায় তদন্ত চলমান রয়েছে। কোন ঘটনার বিষয়ে তদন্ত চলমান থাকলে তা নিয়ে কিছু বলা যায় না। কিন্তু কিছু জানতে হয় তাহলে জেলা প্রশাসকের সাথে কথা বলে জানতে পারেন। তদন্ত শেষ হলে আমরা বলতে পারবো।’

 

এ বিষয়ে এস এম রানার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমার নামে অভিযোগ থাকলে সেটা নেন। আপনি যা করার করেন বলে ফোনকল কেটে দেন।’

 

এদিকে সর্বশেষ রানার পরিচয় ও উত্থান সম্পর্কে জানা গেছে, রানা নামের এই ব্যবসায়ীর পুরো নাম হলো এস.এম রানা। তিনি নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের সহ-সভাপতি পদে রয়েছেন। নাসিক ১৮নং ওয়ার্ড সুলতান গিয়াস উদ্দিন রোড় শীতলক্ষ্যা কদমতলী এলাকায় তার একটি মালিকাধীন প্রিন্ট কারখানা রয়েছে। সেটি মাদার প্রিন্ট নামে পরিচিত। তাকে সেই এলাকার লোকজন মাদার প্রিন্টের রানা নামে চিনেন। তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থাকলেও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে ভূমি অধিগ্রহণ শাখার চিহ্নিত দালাল। এছাড়াও রানার বিরুদ্ধে রয়েছে ভূমিদস্যুতার অভিযোগ।

 

এ বিষয়ে নাসিক ১৮নং ওয়ার্ড ও গোগনগরে নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক অনেকেই জানান, এক সময় কান্ট্রি প্রিন্ট নামে একটি ছাপা কারখানায় হেলপারি করতো এস.এম রানা। তিন ভাইয়ের মধ্যে রানা ছিলেন সবার বড়। তার পিতা মো.কমল মিয়া পেশায় একজন বাস চালক ছিলেন। সংসারের অভাবের কারণে তেমন একটা লেখাপড়া করতে পারেননি রানা। সেই সময় তারা গোগনগর এলাকায় একটি টিন শেড বাসায় থাকতেন।

 

পরে রানা প্রিন্ট কারখানার হেলপার থেকে রং মাস্টার হয়। কয়েক বছর সেই কারখানায় রং মাস্টার হিসেবে কাজ করেন রানা। পরবর্তীতে নিজের মালিকানাধীন একটি প্রিন্ট কারখানা দেন। সেই কারখানাটির নাম ছিলো মাদার প্রিন্ট। সেই মাদার প্রিন্ট থেকেই রানার উথান। খেলাধুলার আড়ালে মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগও উঠেছিল তার বিরুদ্ধে। তার দুই ভাই দেশের বাহিরে রয়েছে। এছাড়া কয়েক বছর আগে মাদার প্রিন্টের একটি গাড়ি মাদক সহ ডিবি’র হাতে আটক হয়।

 

সূত্রে আরও জানা যায়, এক সময়ের হেলপার থেকে এখন অর্ধশত কোটি টাকার মালিক এই এস.এম রানা। বর্তমানে তার রয়েছে কয়েক কোটি টাকা সম্পত্তি। এক সময় ভাড়া বাসায় থাকলেও এখন তামাকপট্টি মসজিদ এর সাথে তার রয়েছে একটি ডুপ্লেক্স বাড়ি। এছাড়াও বাপ্পী চত্ত্বর এলাকায় রয়েছে তার বিশাল একটি মার্কেট। এছাড়াও বিভিন্ন এলাকায় একোয়ারে মাধ্যমে জায়গা আত্মসাৎ করেছেন রানা।

 

সৈয়দপুর আল আমিন নগর এলাকায় রয়েছে প্রায় ১৫ শতাংশ জায়গা, কাশিপুর পার হাউজের সামনে রয়েছে প্রায় ২০ শতাংশ জায়গা, গোগনগর কবরস্থানের অপর পাশে একোয়ারে রয়েছে প্রায় ১০০ শতাংশ জায়গা, বাপ্পী সড়ক আবাসিক এলাকায়ও রয়েছে তার জায়গা। বিভিন্ন জায়গায় মানুষের সাথে ভূমিদস্যুতা করে তিনি অনেকের জায়গা আত্মসাৎ করেন বলে অভিযোগ উঠে।

 

জানা যায়, ২০০৯ সালে এক প্রভাবশালী এমপির আস্থাভাজন মেহেবুর রহমানের হাত ধরে এস.এম রানা নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের সদস্য হন। পরে খেলাধুলার কারণে সেই এমপির শ্যালকের কাছের লোক হয়। গত তিন টার্ম আগে ক্লাবের নির্বাচনে পরিচালনা পর্ষদে পদে নির্বাচিত হন। এবার তিনি সহ-সভাপতি পদে নির্বাচিত হন।

 

এমনকি ওই এমপির শ্যালকের সাথে বিভিন্ন সময় ছবি তোলা ব্যানার ফেন্টুন করে নিজে পরিচয় দেন তিনি এমপি সাহেব এর কাছের লোক। তার এলাকা ১৮নং ওয়ার্ডেও ওই এমপির শ্যালকের সাথে ছবি দিয়ে টাঙানো হয়েছিলো বিশাল ফেস্টুন। গত কয়েকদিন আগে রাতের আধারে সেই ব্যানার ফেস্টুন সরিয়ে ফেলেন রানার লোকজন।

 

এ বিষয়ে ঐ এলাকার অনেকেই জানান, রানা একজন ভূমিদস্যু, সে অনেকের সাথে প্রতারণা করে জায়গা জমি নিজের নামে করে নিয়েছে। এস.এ/জেসি
 

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন