মাদকের বিরুদ্ধে জিহাদ শামীম-বদির
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ২৮ জানুয়ারি ২০২৪, ০৮:০৭ পিএম
# কক্সবাজারের সিংহপুরুষ বদি, নারায়ণগঞ্জের সিংহপুরুষ শামীম ওসমান
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষে দায়িত্ব গ্রহণের শুরুতেই মাদকমুক্ত জেলা করার ঘোষণা দিয়েছেন দেশের আলোচিত দুই নেতা। কক্সবাজারের টেকনাফে মাদকমুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছেন আলোচিত ও সমালোচিত কক্সবাজার-৪ আসনের সাবেক সাংসদ ও একই আসনের বর্তমান সাংসদ শাহীন আক্তারের স্বামী আব্দুর রহমান বদি, অপরদিকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজদের নির্মূলের ঘোষণা দেন বহুল আলোচিত সমালোচিত নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য একেএম শামীম ওসমান।
কক্সবাজারের টেকনাফকে যেখানে ইয়াবা ও মাদকের ট্রানজিট হিসেবে ধরা হয় অপরদিকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লাকে মাদকের গোডাউন বলা হয়। বদির এলাকায় বদির নিজস্ব লোকজনের মাধ্যমে মাদকের ট্রানজিট পরিচালনা করার অভিযোগ নানা সময়ে উত্থাপিত হয়েছে। অপরদিকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠ ও আস্থাভাজন অনেকের বিরুদ্ধেই মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি ও ভূমিদস্যুতার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে।
কখনো শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ব্যক্তির মাদক সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ফোনকল ফাঁস হয়েছে, আবার এসপি হারুনের সময় শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠ বেশ কয়েকজন মাদক নিয়েও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়েছেন। নির্বাচনের পর জাদরেল দুই নেতা একদিনেরও কম ব্যবধানে মাদক নির্মূলের ঘোষণা দেয়ায় অনেকে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি বদির ঘোষণানুযায়ী মাদকের ট্রানজিট হিসেবে পরিচিত টেকনাফে মাদক নির্মূল সম্ভব হয় তাহলে সারাদেশে মাদকের সাপ্লাই হ্রাস পাবে, অপরদিকে মাদকের গোডাউন হিসেবে পরিচিত ফতুল্লায় যদি শামীম ওসমানের ঘোষণার পরে মাদক নির্মূল হয় তাহলে মাদকের সয়লাব পুরো জেলায় হ্রাস পাবে।
শনিবার বিকেলে নারায়ণগঞ্জের ইসদাইরে ওসমানী পৌরস্টেডিয়ামে নারায়ণগঞ্জ থেকে মাদক নির্মূলের ঘোষণা দেন শামীম ওসমান। তিনি বলেন, ‘আপনাদের দোয়ায় আমরা নিষিদ্ধ পল্লী উচ্ছেদ করেছি। অনেকে ভেবেছিলেন এর পেছনে কোনো উদ্দেশ্য আছে। পবিত্র কাবা শরিফ ছুঁয়ে এবার আমি ওয়াদা করেছি মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ভূমিদস্যুতা ও ইভটিজিং বন্ধ করব। মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক, আলেম, জনপ্রতিনিধি, আইনজীবী, ছাত্রছাত্রীরা এসেছেন এখানে।
আমরা একটা সুন্দর বাংলাদেশ চাই, একটা সুন্দর নারায়ণগঞ্জ চাই। যখন আমরা শুনি একটা মেয়ের সংসার ভেঙে যাচ্ছে স্বামীর মাদকের কারণে, একটা ১৮ বছরের ছেলে রাত ১২টায় বের হতে পারলেও মেয়েরা পারে না কেন? এই রাস্তায় কি নরপশু থাকে? জীবজন্তু থাকে? আমি জানি আজকের পর থেকে মাদক বিক্রির টাকা দিয়ে বিভিন্ন ভাবে আমাদের বিভক্ত করার চেষ্টা করবে।’
মাদক বিক্রেতাদের ইবলিশ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘ওরা অনেক শক্তিশালী। ওদেরকে দুর্বল ভাববেন না। আমি কাল নাও থাকতে পারি। অনুরোধ থাকবে আপনারা বিষয়টি চলমান রাখবেন। ছিঁচকে সন্ত্রাসীদের কারণে ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করতে পারেন না। মাদক থেকেই আসে সন্ত্রাস, কিশোর গ্যাং। ৯০টি ওয়ার্ডের সাংবাদিক, আলেম, নারী, শিক্ষকদের নিয়ে একটা করে কমিটি করা হবে। যে মাদক খায় সে অসুস্থ, যে বেচে সে ইবলিশ শয়তান।
২৬ মার্চের আগে এক হাজার করে ভালো মানুষ চাই। এতে ৯০টি ওয়ার্ডে ৯০ হাজার লোক। প্রতিজনের সঙ্গে পরিবারের ৫ জন সদস্য যুক্ত হলে সাড়ে ৪ লাখ লোক হয়। লোক আরও বাড়বে। আর এই সাড়ে লাখ লোক যখন একসঙ্গে অনুষ্ঠান করবে। যদি বলে আমরা এখানে কাউকে চাই না। আমাদের নারায়ণগঞ্জ আমরাই ঠিক করবো। তখন কি করবেন? আগের মতো বক্তব্য দিতে চাই না। বয়স হয়েছে। ৬২ বছর বয়সের বক্তব্য দিলাম। ২৬ বছরের বক্তব্যে নিয়েন না। সাবধান।
তিনি আরও বলেন, আলেমরা অন্তত জুম্মার নামাজের খুৎবার আগে মাদকের বিরুদ্ধে দুই মিনিট কথা বলবেন, শিক্ষকেরা ক্লাস শুরু করার আগে দুইমিনিট কথা বলবেন। সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা চাই সাংবাদিকদের কাছে। তাদের মধ্যেও ভালো মন্দ আছে। যারা মেইনস্ট্রিম সাংবাদিক তারা কখনোই মাদককে সমর্থন করবে না। এরা সবাই চাইলে জেলায় মাদক, সন্ত্রাস থাকবে না। আমরা মেডিকেল ক্যাম্প করবো ঢাকা থেকে বড় বড় চিকিৎসক নিয়ে এসে।’
এর আগের দিন শুক্রবার টেকনাফ পৌরসভার উপজেলা আদর্শ কমপ্লেক্স মাঠে আয়োজিত এক মাহফিল ও শুকরিয়া সভায় আলোচিত ও সমালোচিত কক্সবাজার-৪ আসনের সাবেক সাংসদ ও একই আসনের বর্তমান সাংসদ শাহীন আক্তারের স্বামী আব্দুর রহমান বদি শামীম ওসমানের বক্তব্যের ন্যায় কক্সবাজারের টেকনাফকে ইয়াবার গজব থেকে মুক্ত করতে দোয়া ও সহযোগিতা চান।
বদি বলেন, ‘কক্সবাজার বা অন্য কোথাও গেলে ইয়াবার বদনাম নিয়ে লজ্জায় মাথা নিচু করে থাকতে হয়। আমরা এ বদনামের ভাগি হচ্ছি। ইয়াবা যুব সমাজকে নষ্ট করছে, দেশ ও জাতিকে ধ্বংস করছে। ইয়াবার কারণে অনেক পরিবারের মা, বাবা, স্ত্রী, সন্তান শান্তিতে ঘুমাতে পারছে না। অনেক তাজাপ্রাণ বিসর্জন দিতে হয়েছে। ইয়াবা নিয়ে সরকার হার্ড লাইনে আছে। টেকনাফকে ইয়াবামুক্ত করার জন্য আমরাও আপ্রাণ চেষ্টা করছি। সরকার ও প্রশাসন চেষ্টা করছে।
কিন্তু কী কারণে সম্পূর্ণভাবে ইয়াবা বন্ধ হচ্ছে না, কেন জানি না। তাই টেকনাফকে ইয়াবামুক্ত করতে আলেম সমাজের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে দোয়া কামনা করছি। আমাদের একটিমাত্র কলঙ্ক সেটা হচ্ছে ইয়াবা। এ ইয়াবার কারণে এতো বদনাম। এই বদনাম মুছতে সবাইকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যারা এখনও ইয়াবা চোরাচালানের সঙ্গে সম্পৃর্ক্ত তাদের অনুরোধ করছি, এটি বন্ধ করে সরকারের কাছে আত্মসমর্পণ করুন। কোনও ইয়াবা চোরাচালানকারী যদি দ্বীনি মাহফিলে গরু, ছাগল ও অনুদান দেয় সেটি গ্রহণ করবেন না। ইয়াবা পাচারকারীকে সমাজ থেকে ধিক্কার জানায়। প্রত্যেক মসজিদ ও মাদ্রাসায় ইয়াবা প্রতিরোধের কথা বলি। ইয়াবা থেকে মুক্ত করতে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি। গ্রামে গ্রামে যেসব ইয়াবা পাচারকারী রয়েছে, তাদের তালিকা করে প্রশাসনকে দেওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি।’ এস.এ/জেসি


