Logo
Logo
×

বিশেষ সংবাদ

একদিকে জুয়া অন্যদিকে সমাবেশ, বিভ্রান্ত মানুষ

Icon

যুগের চিন্তা রিপোর্ট

প্রকাশ: ২৯ জানুয়ারি ২০২৪, ০৯:০৫ পিএম

একদিকে জুয়া অন্যদিকে সমাবেশ, বিভ্রান্ত মানুষ
Swapno

 

# গত চার দিনেও আজমীর ওসমানের আপত্তিকে কর্ণপাতই করেননি শাহ নিজাম

 

 

গত কয়েকদিন যা ঘটে গেল তা নারায়ণগঞ্জে ঝড়ো হাওয়া বললে ভুল হবে না। একদিকে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে সার্ভেয়ার থেকে ৪২ লাখ টাকা উদ্ধার, তার রেশ কাটতে না কাটতেই বাবার নামে করা পার্কে অর্থাৎ ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডে অবস্থিত নাসিম ওসমান মেমোরিয়াল অ্যামিউজমেন্ট পার্কে (নম পার্ক) টিকেট কাউন্টার বসিয়ে জুয়ার আসরসহ বিভিন্ন ক্যাটাগরীতে লাকি কুপন বিক্রি হচ্ছে এবং অশ্লীল কর্মকাণ্ড হচ্ছে এমন সংবাদ পেয়ে আজমেরী ওসমান নিজেই ২৫ জানুয়ারি ওই পার্কে গিয়ে সাংসদ শামীম ওসমানের অনুসারী পার্কের তত্ত্বাবধায়ক মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক শাহনিজামকে তা বন্ধ করার জন্য বলেন।

 

আজমেরী ওসমানের নম পার্কে হুট করে হানা দেওয়ায় হতচকিত হয়ে পড়েন পার্কে উপস্থিত আওয়ামী  লীগ নেতাসহ কর্তাব্যক্তিরা। আজমেরী ওসমান সেখান থেকে বেরিয়ে আসার পরে শামীম ওসমানকে জানালে এমপির ফোনে আজমেরী ওসমানের কয়েক অনুসারীকে ৫৭ ধারায় গ্রেফতার করে পুলিশ। এরই মধ্যে শনিবার মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে সমাবেশ করেছেন শামীম ওসমান। কিন্তু ভাতিজা আজমেরী ওসমান যে আপত্তি তুলেছেন তাতে কর্ণপাত করেননি শামীম ওসমান এমনকি মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক শাহ নিজামও।  

 

আজমেরী ওসমানকে এক প্রকার বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ফের শুরু হয়েছে নম পার্কের যাবতীয় আয়োজন। পাড়া মহল্লায় চলছে মাইকিং। প্রতি রাতে বসে সেই জুয়ার আসর ও মাদক সেবীদের আড্ডা। সমাগম অব্যাহত আছে নারায়ণগঞ্জর বিভিন্ন স্থান থেকে শত শত টিকেট কাটা গ্রাহকরা। নাসিম ওসমানের পুত্র আজমীর ওসমানের আপত্তি কর্নপাতই করেনি শাহ নিজাম। তবে অতীতে মৌখিক বিরোধ থাকলেও এভাবে প্রকাশ্য বিরোধ ও পক্ষ নিতে আগে দেখা যায়নি। স্পষ্টই বোঝা যায় শামীম ওসমানের সমর্থন আছে শাহ নিজামের পক্ষে।

 

অন্যদিকে আজমেরী ওসমানের আপত্তি থাকলেও উল্টো তার অনুসার অনুসারীরা গ্রেপ্তার হয়েছেন। তবে ক্ষুব্ধ আজমেরী ওসমান এরপর কি পদক্ষেপ নিবেন নাকি নীরব থাকবেন সেটাই এখন দেখার বিষয়।

 

সূত্র জানিয়েছে, গ্রামীণ বা চরাঞ্চলে দেখা মেলে ‘লাকি কুপন বা লটারি’ বিক্রির কার্যক্রম। নানা প্রলোভনে এইসব লাকি কুপন বিক্রির ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব হতে দেখা যায় দিনমজুর, রিকশাচালকদের মতো নিম্নআয়ের মানুষদের। গত বেশ কয়েকদিন ধরে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় নাসিম ওসমান মেমোরিয়াল পার্কেও চলছে একই কার্যক্রম। অভিযোগ রয়েছে, পার্কটির পরিচালনার দায়িত্বে থাকা মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক শাহ নিজামের তত্ত্বাবধানেই চলছে এই লটারি বা লাকি কুপন বিক্রি। যদিও এই বিষয়ে অবগত নয় বলে দাবি স্থানীয় প্রশাসনের।

 

স্থানীয়রা জানান, প্রতিদিন পার্কটির আশেপাশের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশায় ঘুরে ঘুরে মাইকিং করে ‘লাকি কুপন’ বিক্রি করা হয়। এইসব কুপন বিক্রির সময় ‘গাড়ি, অটোরিকশা, মোটরসাইকেল, টিভি’ জেতার প্রলোভন দেখানো হয়। আর এই প্রলোভনের ফাঁদে পা দিয়ে সর্বস্ব হারাচ্ছেন খেটে খাওয়া নিম্নআয়ের মানুষজন। প্রতি কুপনের মূল্য ২০ টাকা। অনেকে আকর্ষনীয় পণ্য পাওয়ার আশায় একাধিক কুপনও কিনছেন। দিনশেষে রাতের বেলা ‘র‌্যাফেল ড্র’ এর মধ্য দিয়ে বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়। বিজয়ীদের নাম ঘোষণায় ‘দেশ জনতা টিভি’ ও ‘ক্যাবল চ্যানেল’ ব্যবহার করা হয়।

 

স্থানীয়দের অভিযোগ, ‘লাকি কুপন’ বিক্রির নামে প্রতারণার ফাঁদ তৈরি করা হয়েছে। এদের প্রধান টার্গেট রিকাশাচালক, ভ্যানচালক, দিনমজুর ও নিম্ন আয়ের মানুষজন। অনেকেই তাদের দৈনিক উপার্জন করা টাকা দিয়ে পরিবারের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় চাল, ডাল, তেল না কিনে ‘ভাগ্য পরীক্ষায়’ কিনছেন ‘লাকি কুপন’। কিন্তু দিনশেষে অধিকাংশ ব্যক্তি প্রতারিত হচ্ছেন এবং খোয়াচ্ছেন তাঁর দৈনিক উপার্জন।

 

‘লাকি কুপন’ কেনা একাধিক ব্যক্তির সাথে কথা হলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা বলেন, ‘র‌্যাফেল ড্র’তে বিজয়ী কুপনের সাথে কেনা কূপনের নম্বর মিললেই তবে পাওয়া যাবে মোটরসাইকেল, টিভি, ফ্রিজের মতো দামি পণ্য। তারা দামি পণ্য লাভের আশায় প্রতিদিনই কুপন কিনছেন। কেউ কেউ দৈনিক ১০-১২টা করেও কুপন কিনছেন। দেখা যায় এতে দৈনিক উপার্জনের টাকা নিয়ে আর বাড়ি ফেরা হয়। পরে চাল, ডাল কিনতে টাকা ধার করতে হয়।

 

এদিকে, পার্কে ‘লাকি কুপন’ বিক্রির বিষয়ে জানতে মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাাদক শাহ নিজামের মুঠোফোনের নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কলটি রিসিভ করেননি।

 

যোগাযোগ করা হলে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দেদারুল ইসলাম বলেন, ‘লাকি কুপন বিষয়টি আমি অবগত নই। তবে এই ধরনের কার্যক্রমের ব্যাপারে প্রশাসনের অনুমতির প্রয়োজন রয়েছে। অনুমতি সাধারণত জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়।’

 

জানতে চাইলে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মৌসুমী বাইন হীরা বলেন, ‘আমি বিষয়টি জানতাম না। এই ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

 

সূত্র জানায়, নাসিম ওসমানের নামে করা নম পার্কে অনৈতিক কর্মকান্ড টিকেট বিক্রির মাধ্যমে চালু করা হয়েছে জানতে পরে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় নিজ গাড়িতে করে পার্কের বাইরে অবস্থান নেন আজমেরী ওসমান। তিনি আয়োজকদের বলেন, ‘এ পার্ক আমার বাবার (প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা নাসিম ওসমান) নামে করা। তিনি একজন প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা। চারবারের এমপি ছিলেন। তাঁর মত এমন ব্যক্তির নামের পার্কে এ ধরণের জুয়ার আসর লটারীর কাজ করাটা ঠিক হচ্ছে না। আমি আজকে বলে দিয়ে গেলাম। এর পরেও এ ধরণের কাজ হলে আমি ব্যবস্থা নিব।

 

আজমেরী ওসমান যেই দাবি নিয়ে নম পার্কে উপস্থিত হয়েছিলেন, তা একজন সন্তান হিসেবে প্রকৃত দায়িত্ব ছিল বলেই মনে করছেন শহরবাসী। এই ঘটনার মাধ্যমে নম পার্কে হিন্দি গানের তালে তালে গভীর রাত পর্যন্ত অসামাজিক নৃত্য পরিবেশন, জুয়ার আড্ডাসহ বেশ কয়েকটি ক্যাটাগরিতে লাকি কুপনের টিকেট বিক্রির মতো বিষয়টি প্রকাশ্যে এসেছে। সেখানে মাদককারবারীদের আড্ডাও বসে এমন খবরও চাউর হয়েছে।

 

প্রয়াত জনপ্রিয় সংসদ সদস্য নাসিম ওসমানের নামে গড়ে তোলা পার্কটিতে তার দুই ভাই সেলিম ওসমান ও শামীম ওসমান এমপি থাকাবস্থায় এমন কর্মকাণ্ড ঘটতে পারে তা কেউ ক্ষুনাক্ষরে চিন্তাও করতে পারতো না। তবে আজমেরী ওসমান যেভাবে নিজেই পার্কে গিয়ে এসবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে এসেছেন তাতে তিনি শহরবাসীর বাহবা ও প্রশংসা পেয়েছেন।

 

তবে আজমেরী ওসমানের এই প্রতিবাদের পর কেনই বা তার কর্মীদের ধরতে সারারাত ধরে পুলিশের অভিযান পরিচালনা করা হল, কার ফোনেই বা প্রশাসন এতোটা তৎপরতা দেখালো তা নিয়ে নানা ধুম্রজাল এবং মুখরোচক আলোচনা তৈরি হয়েছে শহরজুড়ে। অনেকে বলছেন, সত্য প্রকাশিত হয়ে যাওয়ার পর আজমেরী ওসমানের প্রতিবাদের বিষয়টি ঢাকতে এবং তার নব উত্থানকে কোনঠাসা করতেই তাকে চাপে রাখার কৌশল হিসেবে এমনটি করা হয়ে থাকতে পারে।

 

নাসিম ওসমানের নামে তৈরি করা নাসিম ওসমান মেমোরিয়াল অ্যামিউজমেন্ট পার্ক (নম পার্ক) তৈরির বিষয়ে  সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) সূত্র জানায়, সাংসদ শামীম ওসমানের সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সম্পত্তি শাখা ২০১৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি তাদের ১ দশমিক ৪৪ একর ভূমি অস্থায়ী ভিত্তিতে ব্যবহারের জন্য নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা পরিষদকে অনুমতি দেয়।

 

পরে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ বিশ্বাস সেখানে সরকারি বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে পার্ক নির্মাণ করতে নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহ নিজামের মালিকানাধীন মেসার্স জেড এন টির সঙ্গে ইজারা চুক্তি করেন। এ চুক্তি অনুযায়ী ভাড়া হিসেবে বছরে দুই লাখ টাকা পাবে উপজেলা পরিষদ। শুরুতে এ পার্কে বিভিন্ন ধরনের রাইড থাকলেও পরবর্তীতে সেগুলো বন্ধ হয়ে যায়।

 

গত কয়েকদিন ধরেই পার্কে বিপুল সংখ্যাক ব্যানার ফেস্টুন সাঁটানো হয়। এছাড়া রিকশায় করে মাইকিং করে লটারির টিকেট বিক্রি করা হয়। তাছাড়া পার্ক চত্ত্বরেও নতুন আঙ্গিকে বিনোদনের জন্য শুভ উদ্বোধন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। লাকি কুপুনের পাশাপাশি মাসব্যাপী ইভেন্টে সার্কাস চলবে বলে ঘোষণা দেয় আয়োজকরা।

 

তবে এই ঘটনায় আজমেরী ওসমানের এই পরিবর্তন এবং সাহসী ভূমিকাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন নগরবাসী। তারা বলছেন, প্রয়াত নাসিম ওসমান যেভাবে শহর-বন্দরের মানুষের মন জয় করে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন তেমনি যদি পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে আজমেরী ওসমানও আগামীতে রাজনীতির উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে নিজেকে তুলে ধররতে পারবেন। এস.এ/জেসি
 

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন