Logo
Logo
×

বিশেষ সংবাদ

জহির রায়হানের অন্তধার্ন জেনারেল ওসমানের ভাষ্য

Icon

আহমদ তমিজ

প্রকাশ: ৩০ জানুয়ারি ২০২৪, ০৭:৫৩ পিএম

জহির রায়হানের অন্তধার্ন জেনারেল ওসমানের ভাষ্য
Swapno


আজ ৩০ শে জানুয়ারি বিশিষ্ট চলচ্চিত্র পরিচালক ও লেখক জহির রায়হানের অন্তধার্ন দিবস। ১৯৭২ সালের এই দিনে তিনি একটি অজ্ঞাত ব্যক্তির টেলিফোন পেয়ে তার বড় ভাই বিখ্যাত সারেং বউ উপন্যাসের অসাধারণ লেখক সাংবাদিক শহীদুল্লা কাউসারকে উদ্ধার করতে গিয়ে কথিত মিরপুরে নিখোঁজ হন।

 


দেশ স্বাধীন হওয়ার পর জহির রায়হান দেশে ফিরে এসে জানতে পারেন শহীদুল্লাহ কায়সারের নিখোঁজ হওয়ার খবর এতে তিনি কিছুটা উত্তেজিত ও আবেগ তাড়িত হয়ে পড়েন। ১৯৭২ সালের  ২৫ শে জানুয়ারি ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবে এক গুরুত্বপূর্ণ সাংবাদিক সম্মেলন করে তিনি গঠন করেন বুদ্ধিজীবী হত্যা তদন্ত কমিটি।

 

 

জহির রায়হানের সেই ঐতিহাসিক সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন নারায়ণগঞ্জের ছাত্রলীগ নেতা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র পরে সাংবাদিকতা ও আইন পেশায় নিয়োজিত হয়ে জিপি (গভর্নমেন্ট প্লিডার) হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী আইনজীবী মরহুম মুহাম্মদ নুর উদ্দিন ভাই। তিনি আমাকে জানিয়েছিলেন" আমি ঐ সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত ছিলাম সেখানে জহির রায়হান এমন কিছু বক্তব্য ও তথ্য তুলে ধরেছিলেন যা ছিল বিস্ফোরক ও অচিন্তনীয়।

 

 

সেখানে এক সাংবাদিক তাকে প্রশ্ন করেছিলেন বুদ্ধিজীবী হত্যার নীল নকশা কোথায় তৈরি হয়েছিল ? উত্তরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে আঙ্গুলি নির্দেশ করে, বলেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুধু তাই নয়, তিনি বলেছিলেন মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন কলিকাতায় অনেক নেতার কান্ড কীর্তি তিনি দেখেছেন।

 

 

সেই সব নেতারা কোথায় কি করেছেন তা আমি স্যেল্যুলুডের (ছায়াছবির মাধ্যমে) তুলে ধরে  তাদের মুখোশ খুলে দেব বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন। সদ্য স্বাধীন দেশে তার এই ঘোষণায় অনেকেই প্রমাদ গুনেছিলেন অনেকে শংকিত হয়ে পড়েছিলেন।

 


এরপর ৩০ শে জানুয়ারি অজ্ঞাত স্থান থেকে এক যুবক নিজেকে "রফিক" পরিচয় দিয়ে টেলিফোনে জহির রায়হানকে বলে আপনি যদি আপনার ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারকে জীবিত পেতে চান তাহলে মিরপুরে চলে আসুন। সেখানে তিনি বন্দী আছেন, এ ব্যাপারে কাউকে কিছু বলবেন না একা চলে আসুন জহির রায়হান মিরপুর যাওয়ার সময় শুধু তার স্ত্রী চলচ্চিত্র অভিনেত্রী সুচন্দা কে বলেগিয়েছিলেন।

 

 

এর পরের ঘটনা সবাই জানেন জহির রায়হান চিরদিনের জন্য অন্তধার্ন হয়ে গেলেন। এ ব্যাপারে প্রচারণা রয়েছে যে রফিক ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক ছাত্রলীগ নেতা। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরের ঘটনা সন তারিখ..মনে নেই সে সময় নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাহিত্য সংস্কৃতিক সংগঠন শাপলার পক্ষ থেকে তৎকালীন আলী আহমদ চুনকা পাঠাগারের দোতলায় অডিটিরিয়ামে  বুদ্ধিজীবী হত্যা দিবস উপলক্ষে এক আলোচনা সভায় আয়োজন করা হয়েছিল।

 

 

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক তৎকালীন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওসমানী। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট কবি ও লেখক সৈয়দ শামসুল হক ও চলচ্চিত্র ও নাট্য অভিনেতা সৈয়দ হাসান ইমাম। অনুষ্ঠান সভাপতিত্ব করেছিলেন সম্ভবত নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান আলী আহাম্মদ চুনকা ভাই।  

 

 

অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার পর অনেকেই বক্তব্য রাখলেন সৈয়দ হাসান ইমাম তার বক্তব্যের শেষের দিকে তিনি হঠাৎ জেনারেল ওসমানী কে লক্ষ্য করে বললেন দেশ স্বাধীন হওয়ার পর স্বাধীন দেশে এসে জহির রায়হান বুদ্ধিজীবী হত্যা তদন্ত কমিটি গঠন করেছিলেন এরপর ৩০ শে জানুয়ারি জহির রায়হান তার বড় ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারকে উদ্ধার করতে গিয়ে মিরপুরে নিখোঁজ হন।

 

 

আমার প্রশ্ন সে সময় আপনি দেশের সেনাবাহিনীর প্রধান ছিলেন   তাকে উদ্ধারের জন্য তৎকালীন সরকার আপনাকে  কোন নির্দেশ দিয়েছিলেন কিনা ? দিয়ে থাকলে আপনি কি পদক্ষেপ নিয়েছিলেন? প্রশ্ন উঠতে পারে  আমি এতদিন পর কেন আপনাকে এ প্রশ্ন করলাম। এর কারণ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন  সময় আপনার সাথে আমাদের কিছুটা দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছিল তাই আপনার সাথে পরবর্তীতে যোগাযোগ রাখা সম্ভব হয়নি।

 

 

সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত আমি সহ হল ভর্তি মানুষের মধ্যে কৌতুহল সৃষ্টি হয় সারা হলে পিন-পতন নিরবতা। লক্ষ্য করলাম জেনারেল ওসমানী চেহারাতে ও যথেষ্ট উত্তেজনা। তিনি বক্তব্য দেওয়ার জন্য মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে প্রথমে বলেন আজ এতদিন পর হাসান ইমাম সাহেবের এ প্রশ্নের জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না তবে যেহেতু আমাকে প্রশ্ন করা হয়েছে সেহেতু ঘটনার সাথে আমার কিছুটা সম্পর্ক থাকায় থেকে বলছি তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে আমাকে নির্দেশ দেওয়া হল নিখোঁজ জহির রায়হানকে উদ্ধার করার জন্য আমি কিছু সেনা সদস্য ও আমর্ড পুলিশ নিয়ে মিরপুর চলে যাই।

 

 

সেখানে পৌঁছে দেখি পুরো মিরপুর এলাকা ভারতীয় সেনাবাহিনীর সদস্যরা কর্ডন করে রেখেছে। তাদের প্রধান এক শিখ জেনারেল কে আমার পরিচয় দিয়ে বললাম আমি সরকারের নির্দেশে ব্যক্তিগত ফোর্স নিয়ে পুরো এলাকা তল্লাশি চালাতে এসেছি। তুমি তোমার ফোর্স প্রত্যাহার  করো। জবাবে তিনি বললেন আমরাই তো সার্চ করছি।  

 

 

বলে তিনি আমার সাথে তর্ক জুড়ে দিলেন। আমি তখন কঠোর ভাষায় বললাম আমি বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর প্রধান হিসাবে তোমাকে নির্দেশ দিচ্ছি তুমি তোমার সেনা সদস্যদের উইথড্র কর? তিনি অনেকটা বিরক্ত হয়েই তার নিয়োজিত ফোর্স সদস্যদের উইথড্র করলেন । আমি তখন আমার সঙ্গী সেনা সদস্যদের নির্দেশ দিলাম মিরপুরের প্রতিটি ঘরে প্রতিটি স্থানে  তল্লাশি চালাও জহির রায়হানকেও উদ্ধার কর।

 

 

আমার সেনা সদস্যরা যখন কিছুটা অগ্রসর হয় তখন তাদের ওপর বৃষ্টির মত গুলী বর্ষিত হল। সেখানে বেশ কিছু সেনা সদস্য ও আমর্ড পুলিশ নিহত ও আহত হলেন। পরে আমি ক্যান্টনমেন্ট থেকে অতিরিক্ত সেনা সদস্য তলব করে মিরপুরের প্রতিটি ঘরে  ব্যাপক তল্লাশি করেও কোথাও জহির রায়হানকে খুঁজে পেলাম না। এখন আপনারা প্রশ্ন করতে পারেন তবে সেনা সদস্যদের ওপর কোথায় থেকে কারা গুলী বর্ষণ করেছিল?

 

 

 এ ব্যাপারে বলার মত পরিবেশ এখনো সৃষ্টি হয়নি।  আজ আর বিস্তারিত কিছু বলবো না তবে আমি একটি বই লিখতেছি সেখানে আপনারা সবকিছু জানতে পারবেন। শোনা যায় ওসমানীর বই লেখায় সেই নোট বইটি রহস্যজনক ভাবে উধাও হয়ে গিয়েছিল। ফলে এর নৈপথ্যে কারা ছিল জাতি আজও জানতে পারেনি। তবে প্রচারণা  রয়েছে জহির রায়হানকে টেলিফোনকারী সেই রফিককে প্রশাসনের সহায়তায় বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল।  

 

 

পরবর্তীকালে কাজী শাহেদ আহমেদ সম্পাদিত অধুনালুপ্ত দৈনিক আজকের কাগজে  শহীদুল্লাহ কায়সারের স্ত্রী অধ্যাপিক্ষ পান্না কায়সারের একটি সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছিল সেখানে পান্না কায়সার জানিয়েছিলেন জহির রায়হানকে টেলিফোনকারি রফিকের ব্যাপারে বিচার চাইতে গেলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল এ নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করা হয়েছিল।

 

 

অন্যথায় তাকেও অপহরণ ও গুম করা হতে পারে। এরপর থেকে তিনি আর এ ব্যাপারে মুখ খুলেননি। লক্ষণীয় ব্যাপার ছিল তৎকালীন সরকার  বা পরবর্তী সরকার গুলো এমন একজন খ্যাতনামা ব্যক্তির অন্তধার্ন রহস্য উদঘাটনে কোন তদন্ত কমিটি বা অন্য কোন ভাবে জোরালো পদক্ষেপ নেয়নি।

 

 

এটা জাতির কাছে বিরাট রহস্য। ধারণা করা হয় শহীদুল্লা কায়সারকে উদ্ধারের নামে ঘাতকরা ফাঁদ পেতে ছিল জহির রায়হান মিরপুরে পৌঁছলে তাকে সেখান থেকে অপহরণ করে অন্যত্র নিয়ে গিয়ে তাকে হত্যা করে তার লাশ গুম করা হয়।

 


 জহির রায়হান ও শহীদুল্লাহ কায়সার সম্পর্কে এদেশের বাম বুদ্ধিজীবীদের প্রশ্নবোধক ভূমিকা রয়েছে। বুদ্ধিজীবী হত্যা দিবসে তাদের বক্তৃতা বিবৃতি  অনেকটাই একপেশে, এতে প্রকৃত ঘটনা এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা লক্ষণীয়। জহির রায়হান ও শহিদুল্লাহ কায়সার কমিউনিস্ট পার্টিতে চীন পন্থী হিসেবে  পরিচিত ছিলেন । ধারণা করা হয় এ কারণেই রুশপন্থী বাম বুদ্ধিজীবীরা তাদেরকে  রাজনীতিতে তাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে গণ্য করে। জোড়ালো ভূমিকা থেকে বিরত থাকেন।  লেখক : আইনজীবী/ সাংবাদিক।   এন. হুসেইন রনী   /জেসি

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন