ধনী জেলায় বার্ন ইউনিট স্থাপনে ধীরগতি
নুরুন নাহার নিরু
প্রকাশ: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৮:২৮ পিএম
# গত ৪ বছরে ৫৬৬ টি গ্যাস লাইন বিস্ফোরণ
# ৩ বছরে দ্বগ্ধ হয়ে প্রাণ গেছে ৮২ জনের
# শুধু দরকার নয়, খুবই জরুরিভাবে দরকার : ফায়ার সার্ভিস
# স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে দাবি জানিয়েছি : সিভিল সার্জন
# পুরনো কোর্ট ভবনটিকে বার্ন ইউনিট করা হোক : হাজী নুরউদ্দিন
# সবসময়ই বলে আসছি, বার্ন ইউনিট এখানে খুব জরুরি : রফিউর রাব্বি
নারায়ণগঞ্জে অগ্নিদুর্ঘটনার মতো ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটার মাত্রা অনেক বেশি। এতে ঝরছে প্রাণ। দগ্ধ ও আহত হচ্ছেন অনেকে। কিন্তু এমন রোগীদের চিকিৎসার সুযোগ নেই আমাদের নারায়ণগঞ্জের মতো এমন ধনী বাণিজ্যিক শহরে। নারায়ণগঞ্জের দুটি সরকারি হাসপাতাল ১০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল এবং খানপুর হাসপাতাল থাকলেও একটি শাখাতেও নেই বার্ন ইউনিট। প্রাথমিক চিকিৎসাও পায় না পোড়া রোগীরা। চিকিৎসা নেওয়ার জন্য ছুটতে হয় রাজধানীর শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে। এমনকি চিকিৎসার পর ব্যান্ডেজ খুলে ড্রেসিং করানোর মতোও কোনো ব্যবস্থা নেই।
নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস তথ্য অনুসারে, নারায়ণগঞ্জে ২০২৩ সালে ২৪২ টি গ্যাস বিস্ফোরণের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে তিতাসের লাইনের ত্রুটিতে বিস্ফোরণ অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে ১১৩ টি। রান্নাঘরে গ্যাস সিলেন্ডার বিস্ফোরণ, বয়লার বিস্ফোরণ ২৬ টি। গ্যাস লাইনের অগ্নিকান্ডের দুর্ঘটনা ঘটেছে ৯৭টি। এসব ঘটনায় আহত হয়েছে ৪৩ জন। নারায়ণগঞ্জে গত ৪ বছরে ৫৬৬ টি গ্যাস বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে এসব বিস্ফোরণে গত ৩ বছরের ৮২ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এসব দূর্ঘটনায় প্রাণহাণি তো হচ্ছেই পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবেই ক্ষতির শিকার হচ্ছে অনেক মানুষ।
এছাড়া তথ্যানুসারে, ২০২২ সালে ১০৪ টি গ্যাস বিস্ফোরণ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে তিতাসের লাইনের ত্রুটিতে বিস্ফোরণ ঘটেছে ৬৯টি। রান্নাঘরে গ্যাস সিলেন্ডার, বয়লার ও এসি বিস্ফোরন ঘটেছে ৪৩টি। এসব ঘটনায় নারী শিশুসহ প্রাণ হারিয়েছে ১৮ জন। ২০২১ সালে ১১৪টি গ্যাস বিস্ফোরণের অগ্নিকান্ড ঘটেছে। এর মধ্যে তিতাসের লাইনের ত্রুটিতে বিস্ফোরন ঘটেছে ৯৬টি। রান্নাঘরে গ্যাস সিলেন্ডার, বয়লার ও এসি বিস্ফোরন ঘটেছে ১৮টি। এসব ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে প্রায় ২০ জন। ২০২০ সালে ১০৬টি গ্যাস বিস্ফোরণের অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এর মধ্যে তিতাসের লাইনের ত্রুটিতে বিস্ফোরণ ঘটেছে ৭১ টি। রান্নাঘরে গ্যাস সিলেন্ডার, বয়লার ও এসি বিস্ফোরণ ঘটেছে ৪১টি। এসব ঘটনায় ৪৪ জন প্রাণ হারিয়েছে।
বড় দুর্ঘটার মধ্যে ২০২১ সালের ৮ জুলাই বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে রূপগঞ্জ উপজেলার কর্ণগোপ এলাকার সজিব গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান হাসেম ফুডস অ্যান্ড ভোরেজের সেজান জুস কারখানায় অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে। ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে ৫২ জনের মৃত্যু ঘটেছে। এদের মধ্যে ৪৯ জন অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যান। অন্যদিকে গত বছর নারায়ণগঞ্জের পশ্চিম তল্লা এলাকার বায়তুস সালাত মসজিদে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৩৭ জন দ্বগ্ধ হন। এর মধ্যে ৩৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। বাকিদের অবস্থাও আশঙ্কাজনক ছিলো।
এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এর সিনিয়র স্টেশন অফিসার মো. শাহজাহান দৈনিক যুগের চিন্তাকে বলেন, আমাদের বছরের পরিসংখ্যন দেখলে দেখা যায় যে বেশির ভাগ নারায়ণগঞ্জে গ্যাস বিস্ফোরণে দুর্ঘটনা ঘটে। তো এসব দুর্ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা কাজ করে থাকে। দুর্ঘটনার সময় যেসব লোকদের উদ্ধার করা হয় তাদের দ্রুত চিকিৎসার জন্য নারায়ণগঞ্জে দুটি বড় সরকারি হাসপাতালের যেকোনো একটি শাখায় বার্ণ ইউনিট জরুরি দরকার। শুধু দরকার নয়, খুবই জরুরিভাবে দরকার।
এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলার সিভিল সার্জন ডা. এ. এফ. এম মুশিউর রহমান যুগের চিন্তাকে বলেন, দেশের কোনো জেলার হাসপাতালে বার্ন ইউনিট নেই। বর্তমান নতুন স্বাস্থ্যমন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণের পরে গত মাসে ১১ তারিখে বাংলাদেশের মধ্যে প্রথম ভিজিটে আসে আমাদের সোনারগাঁয়ে তখন আমি তার কাছে প্রস্তাব রেখেছিলাম যে স্যার আপনি যেহেতু বার্ন ইউনিট নিয়ে কাজ করেন এবং আপনার হাত ধরেই ৫০০ শয্যা বিশিষ্ট বার্ণ ইউনিট হয়েছে। বিশেষ করে যেহতুু অন্যান্য জেলাগুলোর মধ্যে আমার নারায়ণগঞ্জে শিল্প-কারখানা বেশি রয়েছে এবং এখানে বার্ন দুর্ঘটনা বেশি সেহেতু পাঁচ সদস্যের একটি বার্ন ইউনিট করা যায় কিনা? তখন তিনি আমাকে বলেছে উনি পর্যায়ক্রমে এটা চালু করবে এবং আমিও আশা করছি খুব তাড়াতাড়ি আমাদের জেলাতেও একটি বার্ন ইউনিট করতে পারবো।
এ বিষয়ে আমরা নারায়ণগঞ্জ বাসীর সভাপতি হাজী নূর উদ্দিন যুগের চিন্তাকে বলেন, নারায়ণগঞ্জে একটি বার্ন ইউনিটের জন্য আমরা দাবি জানিয়ে মানববন্ধনও করেছি। গত বছর রূপগঞ্জে এবং নারায়ণগঞ্জের তল্লা এলাকার একটি মসজিদে ভয়াবহ অগ্নি দুর্ঘটনার পর আমরা এই দাবি জানিয়েছিলাম। নারায়ণগঞ্জের যে পুরান কোর্টের ভবন রয়েছে সেই ভবনটি বর্তমানে পরিত্যক্ত অবস্থা রয়েছে আমাদের দাবি ছিলো যেন এই ভবনটিতে বার্ন ইনস্টিটিউট, হার্ট সেন্টার, কিডনি ডায়ালাইসিস এই তিনটি যদি হয় নারায়ণগঞ্জে যেখানেই অগ্নিকান্ড দুর্ঘটনা হোক না কেনো সাধারণ মানুষরা দ্রুত চিকিৎসাটা পাবে। এবং অনেক নিরীহ মানুষের জীবন বেঁচে যাবে। আমাদের দাবি নারায়ণগঞ্জে এই বার্ন ইউনিট দ্রুত করা হোক।
এ বিষয়ে সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের আহ্বায়ক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বি যুগের চিন্তাকে বলেন, নারায়ণগঞ্জে প্রতিনিয়ত এসব অগ্নিকান্ডের দুর্ঘটনা ঘটছে। কারণ আমাদের নারায়ণগঞ্জ ছোট হলেও এখানে অনেক শিল্প কারখানা, গার্মেন্টস রয়েছে। আগেও বলেছি এখনও বলছি নারায়ণগঞ্জে বার্ন ইউনিট খুবই জরুরি। আমাদের দাবি খুব দ্রুত নারায়ণগঞ্জে একটা বার্ন ইনস্টিটিউট যেন করে দেওয়া হয়। এস.এ/জেসি


