Logo
Logo
×

বিশেষ সংবাদ

নিতাইগঞ্জের অবৈধ ট্রাক স্ট্যান্ডে চোখ পড়েনি

Icon

মাহফুজ সিহান

প্রকাশ: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৮:৪৪ পিএম

নিতাইগঞ্জের অবৈধ ট্রাক স্ট্যান্ডে চোখ পড়েনি
Swapno

 

প্রেসক্লাব আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, নাগরিক সমাজের সম্মিলিত সিদ্ধান্তের পর বদলে গেছে গোটা শহরের সড়ক, ফুটপাত, যানচলাচলের চিত্র। অটোরিক্সাচালকদের দৌরাত্ম্য যেমন কমেছে, বাড়ি বানিয়ে ফেলা শায়েস্তা খান রোড, সিরাজউদদৌল্লা সড়ক কিংবা মীর জুমলা সড়কে ‘নৈরাজ্যে’র চিত্র গতদুইদিনের বদলে গেছে। তবে এখনো নিতাইগঞ্জের অবৈধ ট্রাকস্ট্যান্ডটি সরানো হয়নি।

 

গতকাল পর্যন্ত আগের মতোই দিনের বেলায় মণ্ডলপাড়া ব্রিজ থেকে নগরভবনের সামনের সড়ক ধরে নিতাইগঞ্জ পর্যন্ত দীর্ঘ এই ট্রাকস্ট্যান্ডটিতে দিনের বেলাতেই ট্রাক থামিয়ে মালামাল লোড-আনলোড করতে দেখা গেছে। প্রশাসনের শহরের চতুর্মুখী অভিযান চলমান থাকলেও নিতাইগঞ্জের এই অবৈধ ট্রাকস্ট্রান্ডটিতে চোখ পড়েনি। গোল টেবিল বৈঠকে শামীম ওসমানের দাবি ছিল, পুরো শহরের সবজায়গা থেকেই হকার উঠতে হবে।

 

অপরদিকে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর সবচাইতে বেশি আপত্তি ছিল নিতাইগঞ্জের এই অবৈধ ট্রাকস্ট্রান্ডটি নিয়ে। ভারপ্রাপ্ত পুলিশের সুপারের একটি কথার সূত্র ধরে মেয়র আইভী নিতাইগঞ্জের ট্রাকস্ট্যান্ডটির দৌরাত্ম্য প্রসঙ্গে প্রশাসনের উদ্দেশ্যে বলেন,  ‘নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন ট্রাক দিয়ে বন্দি। মেয়রকে আপনারা সব সময় দোষারোপ করেন। তাহলে কেনো আমাকে এখন থামিয়ে দিবেন। সমাধান করতে আসছেন, সমাধান করতে দেন।

 

আপনি এসপি (ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার আমির খসরু) যদি সেখানে (নিতাইগঞ্জে পুরাতন পুলিশ সুপারের বাসভবন) থাকতেন তাহলে কিছুটা হলেও সেখানে যানজট মুক্ত থাকতো। আমি অনুরোধ করবো আপনি সেখানে থাকেন। কারণ ঐখানে ড্রেন, পানির সমস্যা ছিলো সব সমস্যা আমি সমাধান করে দিছি। এবং নিতাইগঞ্জের ট্রাকস্ট্যান্ড নিয়ে হাইকোর্টে মামলা করা হয়েছে। আর সেখানে স্পষ্টভাবে রায় ডিসি আর এসপিকে দেওয়া হয়েছে। উচ্ছেদ করে ওইটা ফ্রি করে তাকে জানানোর জন্য।

 

তাদেরকে একটা করে লাইন করার জন্য বলা হয়েছে। কিন্তু সেখানে তারা ৩ লাইন করে দাঁড়িয়ে থাকে। আজকে সকলের সামনে আমার বড় দুইভাই সকলের সামনে আমাকে কমিটমেন্ট দিতে হবে যে, সড়কে হকার থাকবে না। এবং আপনারা প্রশাসনকে নির্দেশ দেন। শহরে মেয়রের কথা কেউ শুনে না কোনো প্রশাসন শোনে না। মেয়র জনগণের সাথে কথা বলে। সুতরাং আপনাদের কমিটমিন্ট থাকতে হবে এবং আমাকে কি করতে হবে এটা যদি সুনির্দিষ্ট করে আমাকে বলে দেন তাহলে কিন্তু আমাদের অনেক প্রবলেম সমাধান হয়ে যায়।’

 

প্রেসক্লাবের গোলটেবিল বৈঠকের পর গোটা শহরের চিত্র বদলালেও নিতাইগঞ্জের অবৈধ ট্রাকস্ট্যান্ডের চিত্রটি বদলায়নি। গোলটেবিল বৈঠকে মেয়র আইভী শহরের ৫নং ঘাট এলাকায় কাঠের গুড়ি লোড-আনলোডের জায়গায় নিতাইগঞ্জের মালামালও লোড-আনলোডের প্রস্তাবনা দেন। এছাড়া তিনি নাসিক ভবনের সামনে দাঁড়ানো ট্রাক সম্পর্কে বলেন, চট্টগ্রাম থেকে মালামাল ভর্তি ট্রাক এসে মণ্ডলপাড়া সেতু থেকে ধরে নিতাইগঞ্জ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকে।

 

ট্রাক থেকে অল্পকিছু স্যাম্পল নিয়ে এই ট্রাকওয়ালারাই ব্যবসায়ীদের বাসায় দোকানে স্যাম্পল দেখান। ব্যবসায়ীরা দোকানে আসে সকাল ১১টার পর পরে ওই স্যাম্পল দেখে দরদাম ঠিক হলে তখন ওই দাঁড়ানো ট্রাক থেকে মালামাল আনলোড করেন ট্রাকওয়ালারা। কিন্তু গোটা দিন ওই এলাকায় চলাচল অনুপযোগী হয়ে থাকে। এমনকি সমস্যায় পড়তে হয় নগরভবন, ভিক্টোরিয়া জেনারেল হাসপাতালে সেবা নিতে আসা লোকজনদের। 

 

সূত্র জানিয়েছে, জনগুরুত্বপূর্ণ নগরভবনের সামনে থেকে অবৈধ ট্র্যাকস্ট্রান্ড সরানোর দাবি নতুন নয়। এ নিয়ে জলও কম ঘোলা হয়নি। মাঝেসাঝে কিছুদিনের জন্য নগরভবনের সামনে থেকে ট্র্যাকস্ট্যান্ডটি সরানো গেলেও কোন এক অদৃশ্য ঈশারায় তা আবার পুনর্বহাল হয়েছে। সেখান থেকে ট্রাকস্ট্যান্ড সরানোর জন্য প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এমপি সেলিম ওসমানও। ব্যবসায়ীদের সাথে দফায় দফায় সভার পরেও ব্যর্থ হয়েছেন তিনিও।

 

এসপি হারুন অর রশিদের সময়কালীন কিছুদিনের জন্য এ অবৈধ স্ট্যান্ডটি সরানো হয়েছিলো। কিন্তু এ আবার আগের অবস্থাই। যদিও নগর ভবনের সামনে থেকে ট্রাকের স্ট্যান্ডসহ সব ধরণের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের স্থায়ী আদেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। মূলত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নগর ভবন) এলাকা থেকে সব ধরনের অবৈধ স্ট্যান্ড অপসারণে হাইকোর্টের নির্দেশনা চেয়ে নাসিকের করা একটি রিট পিটিশনের পর, উক্ত এলাকায় কোনো ট্রাকের স্ট্যান্ড অথবা অবৈধ স্থাপনা না রাখার এই আদেশ দেয় মহামান্য হাইকোর্ট।

 

২০২১ সালের ২ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও বিচারপতি একে.এম জহিরুল হকের সমন্বয়ে গঠিত একটি বেঞ্চ নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসন এবং পুলিশ সুপারকে এই আদেশ দেন। 

 

জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ শহরের অন্যতম বাণিজ্যিক এলাকা নিতাইগঞ্জ থেকে মন্ডলপাড়া পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু সড়কের দুপাশে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ ট্রাকের স্ট্যান্ড তৈরি করে রাখায়, রাস্তাটিতে যানজট নিত্যদিনের ঘটনা। শহরের ১৫০ শয্যা ভিক্টোরিয়া হাসপাতাল, মন্ডলপাড়া ফায়ার সার্ভিস স্টেশনসহ নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কার্যালয় এখানেই অবস্থিত। তাই এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সামনের রাস্তায় অবৈধ ট্রাকের স্ট্যান্ডের জন্য হাসপাতালের রোগী সহ অসংখ্য মানুষকে ভোগান্তি পোহাতে হয়।

 

তাই নগরবাসীর ভোগান্তির কথা চিন্তা করে নগর ভবনসহ আশপাশের এলাকা থেকে সব ধরনের অবৈধ স্ট্যান্ড অপসারণে হাইকোর্টের নির্দেশনা চেয়ে ২০১৬ সালে একটি রিট পিটিশনটি করেছিলেন মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী। এরপর ২০১৬ সালের ২৭ নভেম্বর হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথের সমন্বয়ে গঠিত একটি বেঞ্চ অবৈধ ট্রাকস্ট্যান্ড উচ্ছেদের আদেশ দেন। কিন্তু দেখা যায় এই আদেশের পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে কয়েকবার নিতাইগঞ্জ ও মণ্ডলপাড়া এলাকার ট্রাকের স্ট্যান্ডগুলো উচ্ছেদ করা হলেও, এরপর আবার অদৃশ্য শক্তির বলে সেখানে ট্রাকের স্ট্যান্ড গড়ে উঠে।

 

অন্যদিকে, নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সাংসদ একেএম সেলিম ওসমান নিজেও একবার সিটি করপোরেশনের বাজেট সভায় ট্রাকের অবৈধ স্ট্যান্ড উচ্ছেদের বিষয়ে বলেছিলেন। কিন্ত দেখা যায়, এমপি ও মাহামান্য হাইকোর্টের আদেশ এক্ষেত্রে বরাবরই অমান্য করা হয়েছে। তাছাড়া, এসব অবৈধ স্ট্যান্ডকে ঘিরে শহরের একটি চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটের লোকজন বছরে কোটি টাকার চাঁদা আদায় করে বলেও জানা গেছে।

 

নিতাইগঞ্জ মোড়ে সেলিম শ্যামল নামে এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, যানজটের জন্য নিতাইগঞ্জের রাস্তায় রিক্সা বা অন্য গাড়ি দিয়ে আমাদের চলাচল করতে অনেক কষ্ট হয়। আর এর প্রধান কারণ এই ট্রাক স্ট্যান্ড। এসপি হারুন সাহেব থাকতে এখানে একবার উচ্ছেদ হয়েছিলো। তখন আমরা কিছুদিন ভালো ভাবেই রাস্তায় চলাচল করেছি। কিন্তু এখন আবার আগের মতো অবস্থা। আসলে এই স্ট্যান্ডগুলোতে অনেক টাকার চাঁদাবাজি হয়। কোনো ভাবেই এটি উচ্ছেদ করা যাচ্ছেনা।

 

জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ১৫ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর অসিত বরণ বিশ্বাস বলেন, ‘নিতাইগঞ্জ এবং এর আশপাশের এলাকায় ট্রাকের অবৈধ স্ট্যান্ডের কারণে পুরো নগরজুড়ে যানজট সৃষ্টি হয়। এতে মানুষের ভোগান্তি মাঝেমধ্যে অনেক বেড়ে যায়। তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনে বিভিন্ন সময় গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য বিদেশ থেকে বড় বড় সংস্থার প্রতিনিধিরা আসেন। তখন নগর ভবনের সামনে তারাও এসব ট্রাকের স্ট্যান্ড দেখতে পায়। এতে স্বাভাবিক ভাবেই তাদের কাছে আমরা ছোট হই! তাই আমি মনে করি দ্রুতই এই বিষয়টার একটা স্থায়ী সমাধান করা প্রয়োজন। আর হাইকোর্ট থেকে সম্প্রতি এই স্ট্যান্ড উচ্ছেদের জন্য স্থায়ী আদেশও দেওয়া হয়েছে। আশা করি দ্রুতই এই সমস্যার সমাধান হবে।’ এস.এ/জেসি

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন