রিয়াদ ঘনিষ্ঠরাই দানিয়ালের খুনি
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৬:৩৬ পিএম
# রিয়াদের শেল্টারেই মাদককারবারি অনিক বাহিনী মাসদাইরে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে
গত ২৭ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য শামীম ওসমান তার নিজের নির্বাচনী এলাকা সহ নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের এলাকা থেকে মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ ভুমিদস্যু নামক অপরাধ মুক্ত করার ঘোষনা দিয়েছে। সেই সাথে মাদক কারবারিদের কোন ভাবে ছাড় দেয়া হবে না। এছাড়া কয়েক দিন আগে এমপি শামীম ওসমানের নির্বাচনী এলাকা মাদকের আধিপত্য বিস্তার নিয়ে হামলা পাল্টা হামলায় প্রান ঝরে মুক্তা বেগমের সন্তান আল আমিন দানিয়ালকে চিরতরে হারান।
একই ঘটনায় শুভ নামের আরেক মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে। কিন্তু কোনভাবে একজন আসামী গ্রেপ্তার হলেও বাকিদের বিষয়ে তেমন ভাবে তৎপর নয় প্রশাসন এমন অভিযোগও উঠেছে। তবে স্থানীয়রা জানান, এই ঘটনার সাথে জড়িত প্রত্যেক আসামীই মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি হাবিবুর রহমান রিয়াদের ঘনিষ্ঠ লোক। তার মাঝে কয়েকজন তার আত্মীয় রয়েছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, রিয়াদের শেল্টারেই মাদক কারবারি অনিক বাহিনী মাসদাইরে বেপোরয়া হয়ে উঠেছে।
অথচ মাদক ব্যবসায়ী রুমুর মাদক কারবারি বন্ধ করার নির্দেশনা দিয়েছে স্থানীয় সংসদ সদস্য নিজেও। কিন্তু তারা কাউকে তোয়াক্কা না করে মাসদাইর খানকার মোড় শাওন ও সৈকত পরিবহন বাসের পিছনে মাদক কারবারি চালিয়েছে। এমপি শামীম ওসমান জনসভায় প্রকাশ্যে বলেছেন একটি অপরাধের পিছনে আরেক অপরাধ জড়িত থাকে। প্রতিটি অপরাধের পিছনে মাদক জড়িত থাকে। মাসদাইরের ঘটনায় তারই সত্যতা ফুটে উঠেছে।
এদিকে মাসদাইরের মাদককারবারি নিয়ে অনিক বাহিনী ও দানিয়েলের মাঝে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটে। তারই ধারবাহিকতায় পূর্ব শত্রুতার কারণে গত শুক্রবার মাসদাইরের মাদক কারবারি অনিক বাহিনী দানিয়েলকে ডেকে নিয়ে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করে। শুক্রবার রাতে চাষাড়া বালুর মাঠ এলাকায় তাকে কুপিয়ে হত্যার পর লাশ ফেলে আসে তারই বাড়ির সামনে। এই ঘটনায় দানিয়েলের বন্ধু শুভ হসপিটালে আইসিউতে থেকে মৃত্যুর সাথে লড়াই করতেছে।
তার ভিডিও স্বীকারোক্তিতে নিহতের মা মুক্তা বেগম ফতুল্লা মডেল থানায় আটজনের নাম উল্লেখ্য করে মামলা দায়ের করে। যার মামলা নং ১৭। ১০ ফেব্রুয়ারি দানিয়েলের মা মুক্তা বেগম বাদী হয়ে এই মামলা দায়ের করেন।
এামলার এজহারে উল্লেখ্য করা আসামীরা হলেন, পুলিশের সোর্স হিসেবে পরিচিত রমিজ উদ্দিন রমু, তার ছোট ভাই লাবু। মাসদাইরের চিহ্নিত মাদক কারবারি রমুর দুই ছেলে ফরহাদ এবং মুরাদ। এছাড়া মাদক ব্যবসায়ী অনিক প্রধান, তার ভাই অমিত প্রধান। এছাড়া সম্্রাট, মাসদুকে আসামী করা হয়। পুলিশ একমাত্র রমুকে ছাড়া অন্য কাউকে এখনও গ্রেপ্তার করতে পারেনি।
এজহারে মুক্তা বেগম উল্লেখ করেন, এলাকায় আধিপত্য এবং মাদক ব্যবসায় বাধা দেওয়ায় আমার ছেলে দানিয়ালকে হত্যা হতে হয়। শুক্রবার রাত ১১ টায় আমার ছেলে ও তার বন্ধু শুভ ইপর অনিক তার বাহিনী নিয়ে হামলা করে। তারা ৮ থেকে ১০ জন চাপাতি, রামদা, চাকু, ধারালো অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে জনতার সামনে আমার ছেলে ও তার বন্ধুকে ঘিরে ফেলে। একপর্যায়ে সন্ত্রাসী রমু হুকুম দেয় 'শালার জীবন শেষ করে দে'।
তার হুকুম পেয়ে ২ নং আসামি অনিক প্রধান ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যার উদ্দেশ্যে মাথার উপরে আঘাত করে। তখন আমার ছেলে মাটিতে পড়ে গেলে ২ নং বিবাদী এবং ৯ নং বিবাদী ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাকে কোপাতে থাকে। ফলে আমার ছেলে হাতের কব্জির উপর, পিঠের উপর রক্তাক্ত যখম হয়। আমরা খবর পেয়ে আমার ছেলে ও তার বন্ধুকে চিকিৎসার জন্য নারায়ণগঞ্জ ১০০ শয্যা ভিক্টোরিয়া জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাই। তখন কর্তব্যরত ডাক্তার আমার ছেলেকে মৃত ঘোষনা করে এবং শুভকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা পাঠিয়ে দেয়।
নিহতের মা মুক্তা জানান, আমি আমার ছেলে হত্যার বিচার চাই। আমাদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী আমার বড় ছেলে দানিয়েল। তাকে হারিয়ে আমরা এখন নিঃস্ব। আমি প্রশাসনের কাছে হত্যাকারীদের বিচার চাই।
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য শামীম ওসমান পুত্র অয়ন ওসমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগি মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি হাবিবুর রহমান রিয়াদের চাচাতো ভাই অনিক প্রধান ও অমিত প্রধান। ছাত্রলীগের রিয়াদের শেল্টারে পশ্চিম মাসদাইর এলাকায় অনিক প্রধানের নেতৃত্বে প্রায় অর্ধশত কিশোরের একটি গ্যাং সক্রিয়।
এলাকায় উচ্ছৃঙ্খল গ্যাং হিসেবেই তারা পরিচিত। এই গ্যাং সদস্যদের প্রত্যেকেই মাদক ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত। অভিযোগ আছে গ্যাং সদস্য ফরহাদ ও মাসুদ সক্রিয় মাদক কারবারি। যার মধ্যে মাসদু ইতোপূর্বে ফেনসিডিলসহ গ্রেপ্তারও হয়েছিল। মূলত রিয়াদ প্রধানের শেল্টারেই উচ্ছৃঙ্খল জীবন যাপনে অভ্যস্ত হয়ে উঠে এই অনিক।
বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে, ছাত্রলীগে অনিক প্রধানের কোনো পদপদবী না থাকলেও এলাকায় সে ছাত্রলীগ নেতা হিসেবেই পরিচিত। নিজেকে ছাত্রলীগ নেতা হিসেবেই পরিচয় দিয়ে থাকেন। এই পরিচয়েই এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে আসছে অনিকসহ তার গ্যাং। এরা এতটাই দুর্বৃত্ত যে, তাদের ভয়ে কেউ কোনো টু-শব্দটিও করার সাহস পায় না। বলা চলে, পশ্চিম মাসদাইর ও আশেপাশের এলাকার মানুষ এদের ভয়ে অনেকটা বোবা হয়েই জীবন যাপন করতে বাধ্য হন।
ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি জানান, গত শুক্রবার রাতে অনিকের ভাতিজা সিয়াম প্রধান চাষাড়া বালুর মাঠে আড্ডা দিচ্ছিলেন, তখন সিয়াম দানিয়ালকে দেখতে পেয়ে তার চাচা অনিককে কল করে বলে চাষাড়া বালুর মাঠে আল-আমিন ওরফে দানিয়াল আড্ডা দিচ্ছে তাড়াতাড়ি আসো। তখনই তাৎক্ষণিক সেখানে উপস্থিত হয় অনিক প্রধান তার লোকদের নিয়ে। পরে অনিক প্রধান-সিয়াম প্রধান কয়েকজন মিলে দানিয়ালকে এলোপেথারি মারধর করেন।
চাষাড়া বালুর মাঠে থেকে একটি অটোতে তুলে অনিক ও তাদের লোকেরা দানিয়ালকে নিয়ে অনিকের বাসার মসজিদের সামনে আসেন। ওই সময় সেখানে আগে থেকেই উপস্থিত ছিলেন অনিক প্রধানের চাচাতো ভাই সুমন প্রধান, তিনি দানিয়ালকে নিয়ে আসা অটোর ভাড়াটা দেয়। পরবর্তীতে সেখানে উপাস্থিত হয় অনিকের মা, তিনি এলাকায় চিৎকার করে বলতে থাকে ও আমার ছেলেকে ইচ্ছা মতো মারছে অনিক ওরে মাইরা ফেল।
এমতাবস্থায় অনিকের বাবা রমু মিয়া ও সেখানে উপস্থিত হয়ে বলতে থাকে ওরে মারতে মারতে মেরে ফেল, ও অনেক বেশি বাইরা গেছে। যত টাকা লাগে আমি দেখমু, দরকার হলে জায়গা সম্পত্তি বিক্রি করে মামলা চালামু, তারপর ও ওরে ছাড়িছ না। এ সময় দানিয়েলের সাথে থাকায় শুভ’র উপরও তারা হামলা চালান।
মামলার তদন্তকারী ফতুল্লা থানার এস আই কামালের সাথে যোগাযোগ করা হলে তার নাম্বার বন্ধ পাওয়া যায়। এস.এ/জেসি


