কারুশিল্প মেলায় মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে নকশিকাঁথা
শ্রাবণী আক্তার
প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৫:৩৬ পিএম
গ্রামাঞ্চলের নারীরা পাতলা কাপড় বা পুরাতন কাপড় স্তরে স্তরে সজ্জিত করে সেলাই করে কাঁথা তৈরি করে থাকে। সাধারণ কাঁথার উপর বিভিন্ন নকশা করে সেলাই করে বানানো বিশেষ প্রকারের কাঁথাকে বলা হয় নকশিকাঁথা।
অন্যান্য লোকশিল্পের মতো কাঁথার উপর দৈনন্দিন ব্যবহার্য জিনিস, আবহাওয়া, পরিবেশ ও অর্থনৈতিক প্রভাব আছে। সম্ভবত প্রথমদিকে কাঁথা ছিল জোড়া তালি দেওয়া কাপড়।
পরবর্তীতে এটি থেকেই নকশি কাঁথার আবির্ভাব ঘটে। লাল, নীল, হলুদ বেগুনী সহ বিভিন্ন রঙ্গিন সুতায় আর সোনামুখি সুইয়ের ফোড়ে ফোড়ে মনের মাধুরী মিশিয়ে তৈরি হয় বাহারী ডিজাইনের নকশি কাঁথা। নকশিকাঁথায় অঙ্কিত ফোড়ের রয়েছে বিভিন্ন নাম। নকশিকাঁথা সেলাইয়ের কোনো নির্দিষ্ট নকশা নেই।
যিনি সেলাই করেন তিনি তার রুচিমতো যেকোনো নকশা করে থাকে। এতে সুই সুতা দিয়ে প্রাচীন রূপ বৈচিত্র ও প্রকৃতির দৃশ্য ফুটিয়ে তুলতে দেখা যায়। যাতে প্রয়োজন হয় অক্লান্ত শ্রম, মেধা ও সময়। বাহারী রঙের কাপড়ে বাহারী রঙের সুতার নকশায় তৈরি করা নকশিকাঁথা নারায়ণগঞ্জে মাসব্যাপী লোকজ মেলায় শোভা ছড়াচ্ছে।
প্রতিবছর সোনারগাঁয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন এর উদ্যোগে লোকশিল্প উদযাপনে এক মাসব্যাপী দীর্ঘ মেলা বসে।
লোক ও কারুশিল্পের উপর সরকারী এই প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৪০ বছর যাবৎ দেশের আনাচে-কানাচের লোকজ ও কারুশিল্পের শিল্পীদের উৎপাদিত পণ্য সামগ্রী বিক্রি, ও জাতীয় পর্যায়ে সর্ব সাধারণের সামনে তুলে ধরার জন্য মাসব্যাপী এ মেলার আয়োজন করে আসছে। লোকজ মেলার কারুপল্লির গ্যালারীতে গেলে দেখা হয় বিভিন্ন শিল্পীদের সাথে।
আয়োজিত মাসব্যাপী লোক কারুশিল্প মেলা ও লোকজ উৎসবে কথা হয় নকশি কাঁথা শিল্পী হোসনে আরার সাথে। লোকজ উৎসবে প্রদর্শিত কারুপল্লীর গ্যালারীতে স্থান পাওয়া কারুশিল্পী হোসনে আরা জানান, আমি ৪০ বছর ধরে লোকজ উৎসবে প্রদর্শিত কারুপল্লীর গ্যালারীতে নিজের হাতে তৈরি নকশিকাঁথা নিয়ে আসি। এই নকশিকাঁথা তৈরী করার মাধ্যমেই আমি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছি।
এই প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মধ্যকার সময়টাতে নানা চাড়াই উতরাই পার করতে হয়েছে। মেধা, শ্রম ও সময় দিয়ে নিজেকে এই স্থানে নিয়ে আসতে আমার অনেক বছর লেগেছে। বহু কাঠ-খড় পুড়িয়ে পেয়েছি জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন সম্মাননা ও পুরস্কার। তবে কয়েক বছর যাবৎ দেখছি প্রকৃত শিল্পীদের সঠিক মূল্যায়ন হচ্ছে না।
অদক্ষ ও শিল্পী নয় এমন লোকজন কর্মকর্তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে প্রকৃত শিল্পীদের জায়গা দখল করার চেষ্টা করছে। এসব সমস্যা গুলো চিহ্নিত করে সঠিক শিল্পীদের মূল্যায়ন হওয়া দরকার।
তিনি আরও জানান, মেলার শুরুর দিকে বেশ ভালো বিক্রি হয়। মাঝের সময়টাতে শুধু শুক্রবারে বেশি বিক্রি হয়েছে নকশিকাঁথা। তবে এক সপ্তাহ ধরে ভালো বিক্রি হচ্ছে।
নকশিকাঁথা কিনতে আসা এক ক্রেতা বলেন, আগে গ্রামে গেলে নানী-দাদীদের দেখতাম অবসর সময় কাঁথা সেলাই করতো। তবে এখন তাদের বয়স হয়ে যাওয়ায় তেমন একটা দেখা যায় না। শহরে টাকা দিয়েও মন মতো কাঁথা সেলাই করতে পারবে এমন মানুষ পাওয়া যায় না। এখানে কাঁথা দেখে খুব পছন্দ হয়েছে তাই কিনে নিলাম।
নাজমা বেগম জানান, প্রতিবছর আমি লোকজ মেলায় আসলে নকশিকাঁথা কিনি। ৫ বছর ধরে এখানে মেলায় আসছি প্রতিবছর একটা করে কিনেছি। নকশিকাঁথার প্রতি আমার অন্যরকম একটা ভালো লাগা কাজ করে।
প্রাচীন এই নকশি কাঁথা ভারত ও বাংলাদেশের লোকশিল্পের একটা অংশ। তবে ২০০৮ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ নকশিকাঁথার ভৌগলিক স্বীকৃতি পায়। যার কারণে এখনও বাংলাদেশের মানুষ দুঃখ প্রকাশ করে। এন. হুসেইন রনী /জেসি


