# জেলা প্রশাসকের স্থানীয় হকারদের পুনর্বাসনের বিষয়ে ভাবার আশ্বাস
# নারায়ণগঞ্জের জনজীবনে হকাররা বিষফোঁড়ার মতো : নূরু উদ্দিন
# আমরা সংবিধানকে এড়িয়ে মনগড়া কথা বলতে পারবো না : হাফিজুল ইসলাম
নারায়ণগঞ্জের হকার সমস্যা একটি চলমান সমস্যা। যা দীর্ঘদিন যাবৎ নারায়ণগঞ্জবাসীকে ভোগান্তিতে রেখেছে বলে স্থানীয়দের দাবি। শহরের বঙ্গবন্ধু সড়ক, সিরাজউদ্দৌলা সড়ক, শায়েস্তা খান সড়কসহ প্রধান প্রধান সড়কগুলোতে হকারদের অনিয়ন্ত্রিত অবস্থানের জন্য যানবাহনসহ সাধারণ মানুষের পায়ে হেঁটে চলাচলা করাও কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে শহরবাসীর অভিযোগ। এই সমস্যার সমাধান নিয়ে এরই মধ্যে পক্ষ বিপক্ষ তৈরি হয়ে রাজনৈতিকভাবে অস্থিরতার তৈরি হয়েছে।
যা সর্বশেষ ২০১৮ সালের ১৬ জানুয়ারিতে নারায়ণগঞ্জবাসীসহ সারা দেশে তথা সারা বিশ্ব অবলোকন করেছে। এর আগে ও পরেও এই সমস্যা নিয়ে ধারাবাহিকভাবে আলোচনা ও দাবি-দাওয়া থাকলেও বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে আবারও নতুন করে নতুনভাবে আলোচনায় আসে তবে গত ৩ ফেব্রুয়ারিতে নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত এক গোলটেবিল বৈঠকের পর থেকে।
সেই গোলটেবিল বৈঠকে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী, নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের এমপি একেএম সেলিম ওসমান, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এমপি একেএম শামীম ওসমান এবং নারায়ণঞ্জ এর জেলা প্রশাসক মাহমুদুল হক একসাথে বসে শহরের ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদ করে সাধারণ মানুষের নির্বিঘ্ন চলাচলের জন্য উম্মুক্ত করে দেওয়ার বিষয়ে একমত পোষণ করেন।
দীর্ঘদিন মতানৈক্যে থাকা এই পক্ষগুলোকে একমত পোষণ করে সেই ঘোষণার দেওয়ার পর থেকেই রাস্তায় অবাধ যান চলাচল এবং ফুটপাতে নির্বিঘ্নে চলাচলের নতুন আশায় স্বপ্ন দেখতে শুরু করে নারায়ণগঞ্জবাসী। এমনকি সেই বৈঠকের পরের দিনই সেই স্বপ্নের বাস্তব রূপও দেখা যায়। তবে হকাররাও তাদের দাবি নিয়ে অনড় থেকে এরপর থেকেই আবার ফুটপাতে বসার চেষ্টা করতে থাকেন। একই সাথে তারা আন্দোলন, সংগ্রাম, জেলা প্রশাসককে স্মারকলিপি প্রদান ও নগর ভবন ঘেরাও কর্মসূচীও চলমান রাখেন।
এরই মধ্যে তাদের দাবি অনুযায়ী তাদের পুনর্বাসনের বিষয়ে চেষ্টা করারও বিষয়ে কিছুটা হলেও সহমর্মিতা প্রকাশ করেন জেলা প্রশাসক মাহমুদুল হক। তাদের ভোটার আইডি কার্ড ও মোবাইল নম্বরসহ তালিকা জমা দেয়ার নির্দেশ দেন তিনি। তারমধ্য থেকে যাচাই-বাছাই করে যারা নারায়ণগঞ্জের নাগরিক, তাদেরকে পুনর্বাসনের বিষয়ে ভাবার কথাও জানান তিনি। তবে বিষয়টি নিয়ে হকার নেতা ও তাদের সমর্থনকারীরা দ্বিমত পোষণ করেন এবং আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়ে যেতে থাকেন।
মেয়র, এমপি ও প্রশাসনের বর্তমান ভূমিকা এবং তা পালন করার বিষয়ে অনেকটাই আশাবাদী বলে স্থানীয় বিভিন্ন লোকের সাথে কথা বলে জানা যায়। অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জবাসী মনে করেন এক সাথে যদি সকল হকারকেও পুনর্বাসন করা হয় তাহলেও এই সমস্যার কোন স্থায়ী সমাধান হবে না। বরং এইভাবে অবৈধভাবে ফুটপাত দখল করলেই তাদের একটি গতি হবে বলে আবারও বিভিন্ন জেলা থেকে নতুন নতুন লোক এসে এই পেশায় লিপ্ত হয়ে আবারও রাস্তা দখল করে নিবেন বলে মনে করেন তারা।
তাই তাদের পুনর্বাসন করার বিষয়ে অনেকটা সতর্কতা অবলম্বন করার জন্য মতামত দেন তারা। সচেতন মহলের মতে তাদের মধ্যে যাদেরকেই পুনর্বাসন করা হোক না কেন, কিংবা পুনর্বাসন করা হোক আর না হোক অন্ততপক্ষে ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার বিষয়ে যেন প্রশাসন কোন ছাড় না দেন সেই বিষয়টি নিয়েই চিন্তিত তারা। অনেকেরই দাবি, তালিকা অনুযায়ী এখনকার হকারদের পুনর্বাসন করা হলেও তাদের জায়গায় নতুন কোন হকার এসে রাস্তা দখল করবে না এমন গ্যারান্টি হকার কিংবা তাদের পক্ষের নেতারাও দিতে পারবে না।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে আমরা নারায়ণগঞ্জবাসী সংগঠনের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা নূর উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, ভেবে দেখতে হবে, পুনর্বাসনের পর তারা যদি সেসব জায়গা বিক্রি করে আবারও ফুটপাতে চলে আসে। এর আগেও তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার পরও তারা সেগুলো বিক্রি করে দিয়ে আবারও রাস্তায় চলে এসেছে। এটা তো বৈধ কোন বিষয় না। তারা রাস্তা-ঘাট দখল করে মানুষের চলাচলে বিঘ্নতা সৃষ্টি করে তাদের অধিকারকে বৈধ বলতে পারে না।
আমি মনে করি এই হকারদের পুনর্বাসন করা হলেও আগামীতে আবারও নতুন করে নতুন নতুন হকার তৈরি হবে। তাই সকলকেই পুনর্বাসন করতে হবে আমি বিষয়টাকে এভাবে ভাবি না। আমি মনে করি সবাইকেই বিকল্প চিন্তা করতে হবে। আমাদের নারায়ণগঞ্জের সড়কটা এভাবে যেন উনারা দখল না করেন, সড়ক উম্মুক্ত রাখেন। তিনি বলেন, হকাররা আমাদের সড়ক এবং ফুটপাতগুলো যেভাবে দখল করে ব্যবসা করে, তাতে আমি মনে করি তারা আমাদের নারায়ণগঞ্জের জনজীবনে একটি বিষফোঁড়ার মতো।
মানুষের রুটি-রুজি করে খাওয়ার অধিকার আছে। কিন্তু আরেকজনের চলাচলের পথে বাধা সৃষ্টি করে, শান্তি বিঘ্নিত করে রুটি-রুজির ব্যবস্থা করবে সেটাতো হতে পারে না। তাদের যারা ইন্ধন দিচ্ছেন তাদেরও সেটা বুঝা উচিৎ। সাধারণ মানুষ যেখানে প্রতিদিন একটি বিপদগ্রস্ত অবস্থায় থাকে, হাটতে পারে না, চলতে পারে না, সময় নষ্ট হয়, কর্ম-ঘন্টা নষ্ট হয়, ইভটিজিংয়ের শিকারসহ বিভিন্ন ধরণের হয়রানির মধ্যে পড়তে হয়। এখানে শহরেই প্রায় ত্রিশ লাখ লোক বাস করে।
এর বাইরে মুন্সিগঞ্জ জেলাসহ দক্ষিণবঙ্গের মানুষ, পূর্বের বন্দর উপজেলা থেকেও লাখ লাখ প্রতিদিন ভাসমান হিসেবে এখানে আসে এবং এই সড়ক দিয়ে চলাচল করে। এসব মানুষের কর্মজীবনেরও তো ব্যঘাত ঘটছে। রাস্তার পাশে বসতে পারলেই দোকানটা একটু ভাল চলে, তাদের মধ্যে এমন একটি মনোভাব তৈরি হয়ে গেছে। সিরাজদৌল্ল্যা সড়কে দেখা যায়, রাস্তার দুই পাশেতো তারা বসছেই, তার-উপর টলি, ভ্যান নিয়েও তারা রাস্তার উপর বসিয়ে দিয়ে পুরো সড়কটিই তাদের দখলে নিয়ে নিয়েছে।
এমন একটি পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে, যেন কোন কিছুই কারও বলার নেই। সড়ক মানেই যান চলাচল করবে, ফুটপাত মানেই মানুষ পায়ে হেঁটে চলাচল করবে। এমনভাইে সড়ক ও ফুটপাতগুলোকে উম্মুক্ত দেখতে চাই।
এই বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা সিপিবি’র সভাপতি ও শ্রমিক নেতা হাফিজুল ইসলাম বলেন, আমাদের সংবিধানের কোথাও নাই যে, যেই জেলার মানুষ সেই জেলায়ই থাকতে হবে। আমার সংবিধান বলে, বাংলাদেশের যেকোন নাগরিক বাংলাদেশের যেকোন প্রান্তে বসবাস করতে পারবে, রুটি-রুজির ব্যবস্থা করতে পারবে। আমার এই রাষ্ট্রের মালিকানা সকলের সমান। আমার ডিসি কি বললো, এমপি কি বললো, মেয়র কি বললো, শ্রমিক নেতা কি বললো, সেটা বিষয় না।
বিষয় হলো আমার সংবিধান কি বলে। আমাদের সকলকে সাংবিধানিকভাবে সকল সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। আমরা আমাদের সংবিধানকে এড়িয়ে মনগড়া কথা বলতে পারবো না। তাহলে তো নারায়ণগঞ্জের কোন উন্নয়নই হবে না। নারায়ণগঞ্জের গামেন্টসগুলোতে লক্ষ লক্ষ শ্রমিক কাজ করে। আমরা যদি বলি এখানে নারায়ণগঞ্জের বাইরের কোন শ্রমিক কাজ করতে পারবে না। তাহলে তো আমার গার্মেন্টস শিল্প শেষ হয়ে যাবে।
আমি যদি এখন বলি প্রশাসনের কেউ নারায়ণঞ্জ ছাড়া থাকতে পারবে না। এগুলো অসাংবিধানিক। আমি রাষ্ট্রের একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে অসাংবিধানিক এসব কথাকে এলাও করতে পারি না। এস.এ/জেসি


