Logo
Logo
×

বিশেষ সংবাদ

একুশের প্রথম প্রহরে ভাষা শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা

Icon

যুগের চিন্তা রিপোর্ট

প্রকাশ: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২:১৩ এএম

একুশের প্রথম প্রহরে ভাষা শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা
Swapno

 

# দিবসটি উপলক্ষে জেলা প্রশাসনসহ জেলার সর্বত্র নানা কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে

 

শিমুলে পলাশে রাঙা বাংলার দিগন্ত। গাছে গাছে নবীন পাতার গুচ্ছ। প্রকৃতিতে যখন নবীনের উন্মেষের আনন্দ-উচ্ছ্বাস, তখনই এক মর্মমূল ছেঁড়া বেদনার ঘটনা ঘটেছিল এই বাংলায়। আজ থেকে ৭২ বছর আগে। মায়ের ভাষার অধিকার রক্ষার দাবিতে শাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে অকুতোভয় বীর সন্তানেরা নেমে এসেছিলেন রাজপথে। বুকের তাজা রক্তে বসন্তের রাঙা ফুলের মতোই রাঙিয়ে দিয়েছিলেন ঢাকার রাজপথ। মাতৃভাষার দাবিতে আত্মদানের এক অভূতপূর্ব অধ্যায় সেদিন সংযোজিত হয়েছিল মানব ইতিহাসে। আজ মঙ্গলবার সেই অনন্য স্মৃতিধন্য দিন।

 

অমর একুশে ফেব্রুয়ারি। মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। মাতৃভাষার জন্য বাঙালির আত্মদানের এই অতুলনীয় ঘটনা স্বীকৃত হয়েছে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে ঘোষণা করে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। আজ বাঙালির সঙ্গে সারা বিশ্বেই দিনটি পালিত হচ্ছে। মাতৃভাষা আন্দোলনের ৭২ বছর পূর্ণ হওয়ার এদিনের প্রথম প্রহরে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে ভাষাশহীদদের নারায়ণগঞ্জ চাষাঢ়া কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়েছে। রাত ১২টা ১ মিনিটে প্রথমে জেলা প্রশাসক মাহমুদুল হক ও তারপর পুলিশ সুপার ডা. গোলাম মোস্তফা রাসেল শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এ সময় নেপথ্যে বাজছিল অমর একুশের কালজয়ী গান, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি...’।

 

এরপর নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন সরকারি অফিসের পক্ষ থেকে, মহানগর ও জেলা আওয়ামী লীগ, নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাব, নারায়ণগঞ্জ জেলা সাংবাদিক ইউনিয়ন (এনইউজে), নারায়ণগঞ্জ আইনজীবী সমিতি, শিল্পকলা একাডেমী, সিভিল সার্জন, ফটো জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন, ফায়ার সার্ভিস, দৈনিক যুগের চিন্তা পরিবার, মহানগর ছাত্রলীগসহ বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতারা শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। আজ প্রভাতফেরির মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন।

 

দিবসটি উপলক্ষে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনসহ জেলার সর্বত্র নানা কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে। ২১ ফেব্রুয়ারি সূর্যোদয়ের সাথে সাথে সকল শিক্ষা প্রতিস্থানে এবং সরকারি, আধাসরকারি ও স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানসমূহের ভবনে ও বেসরকারি ভবনসমূহে সঠিক নিয়মে, সঠিক রং ও মাপের জাতীয় পতাকা অর্ধনির্মিত রাখা হয়েছে। এছাড়া জেলার সকল মসজিদ, মন্দির, গীর্জা ও অন্যান্য উপাসনালয়ে ভাষা শহিদদের রুহের মাগফেরাতের জন্য বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছে। জেলা মহিলা ক্রীড়া সংস্থা এবং লেডিস ক্লাবের আয়োজনে নারায়ণগঞ্জ সার্কিট হাউজে আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।

 

আজ সকাল ১০টায় চাষাড়াস্থ টাউনহল প্রাঙ্গণে মহান শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে বইমেলার উদ্বোধন হবে। এছাড়া সকাল সাড়ে ১০টায় ভাষা আন্দোলনে শহিদদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে জেলা প্রশাসন। এছাড়া নারায়ণগঞ্জ প্রিপারেটরী স্কুলে জেলা এবং উপজেলার সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীদের অংশগ্রহণে সুন্দর হাতের লেখা, চিত্রাঙ্কন ও রচনা প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হয়েছে। ফতুল্লা থানার পঞ্চবটিস্থ বধ্যভূমি এবং নারায়ণগঞ্জ পৌর কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার এবং নগর ভবন সংলগ্ন রাস্তার মোড়ে ভ্রাম্যমাণ চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর উদ্যোগ নিয়েছে জেলা প্রশাসন।

 

জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক বিষয়ক সংস্থা (ইউনেস্কো) মহান একুশের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি দেয়ার পর থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও গত কয়েক বছর ধরে দিবসটি পালিত হচ্ছে। বাঙালি জাতির জন্য এই দিবসটি হচ্ছে চরম শোক ও বেদনার। অনদিকে মায়ের ভাষা বাংলার অধিকার আদায়ের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত। যে কোন জাতির জন্য সবচেয়ে মহৎ ও দুর্লভ উত্তরাধিকার হচ্ছে মৃত্যুর উত্তরাধিকার-মরতে জানা ও মরতে পারার উত্তরাধিকার।

 

১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি শহিদরা জাতিকে সে মহৎ ও দুর্লভ উত্তরাধিকার দিয়ে গেছেন। ১৯৫২ সালের এদিনে ‘বাংলাকে’ রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে বাংলার (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) ছাত্র ও যুবসমাজসহ সর্বস্তরের মানুষ সে সময়ের শাসকগোষ্ঠির চোখ-রাঙ্গানি ও প্রশাসনের ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজপথে নেমে আসে। মায়ের ভাষা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে দুর্বার গতি পাকিস্তানি শাসকদের শংকিত করে তোলায় সেদিন ছাত্র-জনতার মিছিলে পুলিশ গুলি চালালে সালাম, জব্বার, শফিক, বরকত ও রফিক গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন।

 

তাদের এই আত্মদান নিয়ে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ সরদার ফজলুল করিম তার ‘বায়ান্নর ও আগে’ প্রবন্ধে লিখেছেন ‘বরকত, সালামকে আমরা ভালবাসি। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা বরকত সালাম আমাদের ভালবাসে। ওরা আমাদের ভালবাসে বলেই ওদের জীবন দিয়ে আমাদের জীবন রক্ষা করেছে। ওরা আমাদের জীবনে অমৃতরসের স্পর্শ দিয়ে গেছে। সে রসে আমরা জনে জনে, প্রতিজনে এবং সমগ্রজনে সিক্ত।’

 

এদের আত্মদানের মধ্যদিয়ে আমরা অমরতা পেয়েছি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আজ আমরা বলতে পারি দস্যুকে, বর্বরকে এবং দাম্ভিককে : তোমরা আর আমাদের মারতে পারবে না। কেননা বরকত সালাম রক্তের সমুদ্র মন্থন করে আমাদের জীবনে অমরতার স্পর্শ দিয়ে গেছেন।’

 

বরেণ্য শিক্ষাবিদ আবুল ফজল একুশ নিয়ে তার এক লেখায় লিখেছেন ‘মাতৃভাষার দাবি স্বভাবের দাবি। ন্যায়ের দাবি, সত্যের দাবি-এ দাবির লড়াইয়ে একুশে ফেব্রুয়ারির শহীদরা প্রাণ দিয়েছেন। প্রাণ দিয়ে প্রমাণ করেছেন, স্বভাবের ব্যাপারে, ন্যায় ও সত্যের ব্যাপারে কোন আপোষ চলে না, চলে না কোন গোঁজামিল। জীবন-মৃত্যুর ভ্রকুটি উপেক্ষা করেই হতে হয় তার সম্মুখীন।

 

দিবসটি পালন উপলক্ষে জাতীয় অনুষ্ঠানের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সকল স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনসমূহ বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেসরকারি স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলো একুশের বিশেষ অনুষ্ঠান সম্প্রচার করবে। মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগ বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে একুশের প্রথম প্রহরে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদনের পর কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে পুস্পার্ঘ্য অর্পণ, সংগঠনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়, বঙ্গবন্ধু ভবনসহ সারাদেশে সংগঠনের সকল কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ ও কালো পতাকা উত্তোলন, কালো ব্যাজ ধারণ এবং প্রভাতফেরি। এস.এ/জেসি

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন