Logo
Logo
×

বিশেষ সংবাদ

ফুটপাতে হকার নিষিদ্ধের সিদ্ধান্তে অনড় 

Icon

যুগের চিন্তা রিপোর্ট

প্রকাশ: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৮:১১ পিএম

ফুটপাতে হকার নিষিদ্ধের সিদ্ধান্তে অনড় 
Swapno

 

চলতি মাসের ৩ তারিখে নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত গোলটেবিল বৈঠকে শহরের ফুটপাতগুলোতে হকার নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র, দুই সাংসদ, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, সাংবাদিকদের ঐকমত্যের ভিত্তিতে শহরকে শৃঙ্খলায় আনতে আরো বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তবে এই সিদ্ধান্তের পর থেকে হকাররা ফুটপাতে বসতে একের পর এক আল্টিমেটাম, প্রতিবাদ সভার পাশাপাশি জনপ্রতিনিধিদের কাছে ধর্না এমনকি কাজ না হওয়ায় নানা হুঁশিয়ারি দেয়া অব্যাহত রেখেছেন।

 

গতকালও হকাররা তাদের ধৃষ্টতা দেখিয়ে আবারও আল্টিমেটাম দিয়েছেন। তবে এত কিছুর পরও শহরের ফুটপাতে হকারদের বসতে না দেয়ার সিদ্ধান্তে অনড় রয়েছেন জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা। গতকাল বিকেলে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে এক বৈঠকে হকার বসতে না দেয়ার বিষয়টি আবারো পুনর্ব্যক্ত করেন নেতৃবৃন্দ। গতকাল বিকেল থেকে এই সভা শুরু হয়ে চলে সন্ধ্যা পর্যন্ত এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

 

বৈঠকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী, নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য একেএম সেলিম ওসমান, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাহমুদুল হক, জেলা পুলিশ সুপার ডা. গোলাম মোস্তফা রাসেল, নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি খালেদ হায়দার খান কাজল, নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বিল্লাল হোসেন রবিন, সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম জীবন, নারায়ণগঞ্জ জেলা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি আব্দুস সালাম, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের দুই কাউন্সিলর কামরুল হাসান মুন্না ও শওকত হাশেম শকু প্রমুখ অংশ নেন।

 

বৈঠক শেষে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের (নাসিক) মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী সাংবাদিকদের বলেন, প্রথম বৈঠকে নেওয়া সিদ্ধান্তের আলোকেই কাজ হচ্ছে। ওই বৈঠকের পর কীভাবে সমস্যাগুলোকে সমাধান করা যায় সেই লক্ষে এবার একটি অনানুষ্ঠানিক সভা হলো ডিসি অফিসে। আমি এমপি মহোদয়ের (সেলিম ওসমান) সঙ্গে একমত। (হকার ইস্যুতে) আমরা আমাদের ভোটারদের অগ্রাধিকার দেবো। সাধারণ মানুষের অধিকার ফুটপাত দিয়ে হাঁটা।

হকারদের বক্তব্যের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে নাসিক মেয়র আরও বলেন, আজকে তারা (হকার) অন্যায় কাজটা করেছে। গতকাল ২১শে ফেব্রুয়ারি ছিল, আজ ২২শে ফেব্রুয়ারি। সিটি কর্পোরেশন, জেলা প্রশাসনের অনুমতি না নিয়ে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা চলাকালীন কীভাবে হকার নামধারী কিছু খুনি, বাজে, অবৈধ লোক এভাবে হুঙ্কার দেয়, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের বিরুদ্ধে কথা বলে? এত সাহস তারা কীভাবে পায়, তা আমারও বোধগম্য নয়।

 

কয়েকশ’ হকারকে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার বিষয়টি পুনরায় উল্লেখ করে মেয়র বলেন, ‘মানবিকতার কারণে আমি ৬০০-৮৫০ জন পুনর্বাসন করেছি। আমি এমপি মহোদয়কে তালিকাগুলো চেক করার অনুরোধ করবো। যারা দোকানগুলো বিক্রি করে চলে এসেছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করারও অনুরোধ জানাই।

 

ফুটপাত মানুষের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত থাকবে জানিয়ে সিটি মেয়র আইভী বলেন, ‘এরপর যারা হকারি করে নিম্ন আয়ের মানুষ তাদের বিষয়ে আমরা, এমপি মহোদয় ও জেলা প্রশাসন মিলে কি করা যায় চিন্তা করবো। কিন্তু কোনো অবস্থাতে বঙ্গবন্ধু সড়ক দখল করে, যানজট সৃষ্টি করে, চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি করে সরকারের বদনাম করা এবং নারায়ণগঞ্জকে জিম্মি করা; এটা কেউই বরদাস্ত করবো না।’

 

তিনি বলেন, বিকেএমইএ বরাবরই রোজার সময় একটা সাপোর্ট দিয়ে থাকে পুলিশকে। আমি আশা করি এবারও তারা সাপোর্টটা দিবে। গত রোজায় শহরে মানুষ খুবই সাবলীলভাবে চলাফেরা করেছে। এর পিছনে ছিল আমাদের ৫ আসনের এমপি মহোদয়। উনার নেতৃত্বে প্রশাসনের সহযোগিতায় যানজটমুক্ত শহর পেয়েছিলাম। আশা করি এবারও সে কাজটি যথারীতি হবে। আমরা একসাথে মিলে কাজটি করবো জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, সিটি করপোরেশন, এমপি মহোদয় আমাদের সকলের উদ্দেশ্য মানুষকে সেবা দেয়ার।

 

এদিকে মেয়রের বক্তব্যের মতোই হকারদের কর্মকাণ্ডে বিরক্তি প্রকাশ করে সেলিম ওসমান বৈঠক শেষে বলেন, নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য একেএম সেলিম ওসমান বলেছেন, হকাররা আমাদের জনপ্রতিনিধিদের চ্যালেঞ্জ করেছে যেটা উচিত হয়নি। এর আগেও আমরা বলেছি হকাদের যে, তোমরা একটা তালিকা দাও, আমরা পর্যায়ক্রমে সমস্যাগুলোর সমাধান করব, আমরা তো মানুষ। কিন্তু তারা শহীদ মিনারে বসে যা ইচ্ছে তাই কথা বলছে। পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে তারা রাস্তায় মিছিল করেছে।

 

তিনি বলেন, আজকে রাইফেল ক্লাবে হকারদের সাথে আমি বসেছি, সবার সাথে কথা বলেছি। আমরা কীভাবে সুন্দর সমাধান দিতে পারি সেই ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করছি। কীভাবে আমরা গাড়ি ও রিকশাসহ যানবাহন কমাতে পারি সেইটা নিয়েও ভাবছি। হকারদের সহযোগিতা করতে হলে তাদের নামের তালিকা আমাদের দিতে হবে। তাই বলে একজন মানুষকে দিয়ে একশ’ মানুষের ক্ষতি হবে, এই ধরনের সহযোগিতা আমরা করতে পারবো না।

 

তিনি বলেন, আমরা নারায়ণগঞ্জের মানুষ, জনপ্রতিনিধিরা চাই যারা আমাদেরকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছেন তারা যেন কোন কষ্ট না পায়, তাদের ছেলেমেয়েরা যেন কোন কষ্ট না পায়; সেই ব্যাপারে আমরা অটল থাকবো।

 

এর আগে সেলিম ওসমানের সাথে রাইফেল ক্লাবে হকাররা দেখা করতে গেলে তিনি বলেন, ফুটপাতে আমরা সুন্দর করে শহরকে সাজাতে চাই। আমি আপনাদের সহযোগিতা চাই। যতক্ষণ আপনারা লিস্ট দিতে না পারবেন, কী করবো। কেউ বলে পাঁচ হাজার, আসলে কত হাজার আছে। কামান চাইলে পিস্তল পাবো এমনটা ভাবলে ভুল। আমাকে চ্যালেঞ্জ করবেন না। আপনারা পাঁচ হাজার হলে ভাবুন, শহরে কত লক্ষ মানুষ। আমরা কাদেরটা দেখবো। আপনারা আমার কথায় রাগ করবেন না।

 

আমি ভালবাসা দিয়ে কথা বলছি। সোজা আঙ্গুলে ঘি না উঠলে আঙুল বাঁকা করবো। আমাকে একশো এক জনের কমিটি পাঠাবেন। আমরা একসাথে বসবো। এ সময় হকারদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আমাকে তালিকা দাও। একেক জায়গায় একেক ব্যাবসায়ী বসবে। আমার রাস্তা ময়লা হয়। সামনে বৃষ্টির দিন। এই ড্রেনগুলো জ্যাম হয়ে যায়। আমরা যুদ্ধ করে এ দেশ স্বাধীন করেছি তো মানুষের জন্যেই। তোমরা লাথি খাবে কেন। আমরা একটি লাইসেন্স বানিয়ে দেব সেটা নিয়ে বসতে পারবে।

 

তবে এটা হবে না, যে যেভাবে খুশি সেভাবে বসবে। আমি যদি আজকে মুখ খুলি তাহলে পুলিশ লাগবে না। আমার ছাত্রলীগ যুবলীগ, জাতীয় পার্টি, বিএনপি সবাই একমত। মানুষ কষ্ট করতে পারবে না। মানুষ বেড়ে গেছে তো জায়গা বের করতে হবে। আজ থেকে কোন অশান্তি নয়। আমি চাইলে পুলিশ দিয়ে সরিয়ে দিতে পারতাম। কিন্তু আমি করিনি।

 

তিনি বলেন, আমাকে একটু সময় দাও। আমি কেন তোমাদের সাথে যুদ্ধ করবো। তোমরা আমার ভাই। ভোটার হও বা না হও। তোমরা কীভাবে বাঁচবে। আমাদের একটা সমাধান দাও। রেললাইনের এপাশ ওপাশে দুই পাশেই দোকান। নিয়ম করে বসলে এক পাশে বসবে। গাড়ি এক পাশে চলবে। এখানে সময় দাও। প্রয়োজনে আর্থিক সুবিধা দেব। যে সমাধান হবে সেটা হবে পার্মানেন্ট।

 

বঙ্গবন্ধু সড়ক অনেক প্রয়োজন। অনেক বিদেশি লোক আসে এখানে। ব্যাংকে যেতে হয়। নারায়ণগঞ্জে থাকতে হলে আমাদের নারায়ণগঞ্জকে ভালবাসতে হবে। আপনারা টাকা অপচয় করবেন না। দরকার হলে মসজিদে টাকা দেবেন। কোথাও টাকা দেবেন না। দরকার হলে আমি টাকা দেব, মেয়রকে বলে সিটি করপোরেশনের কাছ থেকে টাকা নেব। আমরা তালিকা দেব গ্রুপ ভিত্তিক পাঁচশ করে মানুষের কাগজ দিন। ভুল বুঝবেন না। আমাকে সময় দিন।

 

এর আগে গতকাল সকালে অনুমতি না নিয়ে চাষাড়া শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে হকার উচ্ছেদের প্রতিবাদে ও পুনর্বাসনের দাবিতে নারায়ণগঞ্জ জেলা হকার্স সংগ্রাম পরিষদ অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। এসময় হকার নেতারা বলেন, ‘আগামী সোমবার পর্যন্ত আমরা অপেক্ষা করবো। এর আগে যদি আলোচনা করে আমাদের দাবি দাওয়া মেনে নেয়া হয় তাহলে আলহামদুলিল্লাহ।

 

আর যদি সোমবারের মধ্যে তা মেনে না নেয়, তাহলে মঙ্গলবার থেকে আমাদের লাগাতার কর্মসূচি শুরু। আমাদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দরাও থাকবে। সকল হকাররা তাদের পরিবার পরিজন নিয়ে রাস্তায় নামবো। আমাদের আন্দোলন সংগ্রাম চলছে চলবেই। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত রাজপথ ছাড়বো না।’

 

তবে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকে নারায়ণগঞ্জ শহরের যানজট ও হকার ইস্যু নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। সভায় সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হয় শহরের ফুটপাতে কোনো হকার বসবে না। এবং বৈধ কাগজপত্র ছাড়া কোনো বাস শহরে প্রবেশ করতে পারবে না। এছাড়া হকারদের অযৌক্তিক আন্দোলন প্রতিহত করবে পুলিশ প্রশাসন।

 

তবে হকারদের কাছ থেকে সরবরাহকৃত তালিকা পাওয়ার পর তাদেরকে শহরের বাইরে অথবা শহরতলীর কোথাও আলোচনা সাপেক্ষে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে। আর হকারদের তালিকা জমা না দেয়া পর্যন্ত শহরে কোনো হকার বসতে পারবে না বলে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এস.এ/জেসি
 

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন