# উপজেলার গত নির্বাচনেও প্রার্থী হতে চেয়েছেন তিনি
# রাজনীতিতে হঠাৎ করেই উত্থান ঘটে সুফিয়ানের
# আইভীর ভক্ত ও কর্মীদেরকেই ব্যবহার করতে শুরু করেন তিনি
# অল্প সময়েই না’গঞ্জের শীর্ষ করদাতাদের তালিকায় আসে তার নাম
# নাসিকের গত নির্বাচনেও বিএনপি নেতার পক্ষ হয়ে কাজ করার অভিযোগ
গত ৬ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ উপজেলা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত সেই তফসিল অনুযায়ী আগামী ৪ মে, ১১ মে, ১৮ মে এবং ২৫ মে মোট চারটি ধাপে অনুষ্ঠিত হবে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে প্রথম ধাপে অর্থাৎ ৪ মে নারায়ণগঞ্জ সদর ও বন্দর উপজেলার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে কমিশন সূত্রে জানা গেছে। সেই ঘোষণার পর থেকেই সারাদেশের ন্যায় বন্দর উপজেলার নির্বাচনে অংশ নিতে ইচ্ছুক ব্যক্তিরা তাদের প্রচার প্রচারণা শুরু করে দিয়েছেন।
আসন্ন বন্দর উপজেলা পরিষদের নির্বাচনে যারা চেয়ারম্যান পদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অংশ গ্রহণ করতে চাচ্ছেন তাদের তালিকায় জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক একেএম আবু সুফিয়ানের নাম শোনা যাচ্ছে এমন খবর চাউর হয়েছে। যিনি গত উপজেলা নির্বাচনেও বন্দর থেকে নির্বাচন করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। শুধু ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন বললে ভুল হবে, বরং নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগেছিলেন বলে জানা যায়। তবে শেষ মুহুর্তে সেই ইচ্ছেটাকে ত্যাগ করতে হয় তাকে।
তবে এবার প্রকাশ্যে নির্বাচনের বিষয় নিয়ে ততটা মাতামাতি না করলেও নির্বাচনের জন্য আবু সুফিয়ান প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে। তাই মেয়র আইভীর নাম ব্যবহার করে হঠাৎ করে আঙ্গুর ফুলে কলা গাছ হয়ে যাওয়া এই নেতা আসলে কি চাইতেছেন তা কানাঘুষা চলছে শহর ও বন্দরের অলিতে গলিতে।
এর আগে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি করা, সিটি কর্পোরেশনের নাম ভাঙ্গিয়ে বিভিন্ন কাজে মধ্যস্থতা করার নামে টাকার ভাগ বসানো, বিভিন্ন শিল্প-প্রতিষ্ঠানকে জনগণের বিপক্ষে ক্ষেপিয়ে দিয়ে টাকার বিনিময়ে নিয়ম বহির্ভূতভাবে কাজ করিয়ে দেওয়াসহ একাধিক অভিযোগ আসে তার বিরুদ্ধে। নাসিকের (নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন) কোন নির্দেশনা ছাড়া কিংবা নাসিককে ভুল তথ্য দিয়ে বিভিন্ন এলাকায় নাসিকের নাম ভাঙ্গিয়ে বিভিন্ন কাজের নাক গলাতো বলেও সুফিয়ানের নামে একাধিকবার অভিযোগ আসে।
স্থানীয় রাজনীতিবিদদের মতে, নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে অনেকটা হঠাৎ করেই উত্থান ঘটে আওয়ামী লীগ নেতা আবু সুফিয়ানের। এর আগে আবু সুফিয়ানের রাজনৈতিকভাবে তেমন একটা পরিচিতি ছিল না বলে জানা যায়। ২০১১ সালের নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন (নাসিক) এর মেয়র পদের নির্বাচনে ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর পক্ষ হয়ে কাজ করার সময় প্রথম আলোচনায় আসেন বন্দরের বাগবাড়ি এলাকার আবু সুফিয়ান।
সে সময় আইভীর জনপ্রিয়তা ও মিডিয়ার সাপোর্টকে ব্যাপকভাবে কাজে লাগাতে দেখা যায় সুফিয়ানকে। একই সাথে আইভীর ভক্ত ও কর্মীদের কাজে লাগিয়ে তাদেরকে নিজের কর্মী হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেন তিনি। একই সময় আইভীর সাথে সুফিয়ানের সম্পর্ক ভাল থাকায় ও আইভীর হয়ে মাঠে কাজ করায় আইভী সমর্থকরাও সুফিয়ানের সাথে ভাল সম্পর্ক গড়ে তুলেন। ধীরে ধীরে বন্দরের গন্ডি পেরিয়ে শহর ও সিদ্ধিরগঞ্জ অর্থাৎ পুরো সিটি এলাকার আওয়ামী লীগের নেতা ও সমর্থকসহ আইভীভক্তদের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে ব্যস্ত হয়ে পড়ে সুফিয়ান।
ব্যক্তি সুফিয়ানের কোন রাজনৈতিক সুনাম না থাকলেও শুধুমাত্র মেয়রের সু-দৃষ্টির দোহাই দিয়ে ২০১৭ সালের নভেম্বরে ঘোষিত নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের কমিটিতে সাংগঠনিক সম্পাদক পদে অধিষ্ঠিত হন তিনি। এরপর থেকে সুফিয়ান রাজনীতির আসল ক্যারিয়ার শুরু করেন বলে জানায় আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র।
সে সময় বিভিন্ন মিডিয়ায় তার পদবী ও যোগ্যতা নিয়ে সংবাদ হয়। খুব স্বল্প সময়ের মধ্যেই নিজেকে এলিট শ্রেণির লোক হিসেবে পরিচিতি দেন তিনি। এরই মধ্যে নারায়ণগঞ্জের শীর্ষ করদাতাদের তালিকায় ওঠে আসে তার নাম। আলিসান বাড়ি, আলিসান গাড়ির মালিক বনে যান সুফিয়ান। এরই মধ্যে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা একেএম শামীম ওসমানও তার বিরুদ্ধে হঠাৎ আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়ে ওঠা নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ করেন।
এই সময়ের মধ্যে সুফিয়ান শহর, বন্দর ও সিদ্ধিরগঞ্জের মধ্যে মেয়র আইভীপন্থী যেসব নেতা বা প্রভাবশালী সমর্থক আছে তাদেরকে ব্যবহার করে তাদের ব্যবহার করে তাদের মাধ্যমে নিজের স্বার্থ আদায় করে নেন এবং চোখের পলকে অর্থ-বিত্তর বিশাল পাহাড় গড়ে তুলেন। মেয়রের কাঁধে ভর করে নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগসহ কেন্দ্রীয় পর্যায়েও রাজনৈতিক প্রভাব গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। তবে শেষ মুহুর্তে তার এসব ছল-চাতুরীর কারণে একসময়ের বান্ধব হিসেবে পরিচিত জনরাও এখন আর তার সাথে নেই।
তার এ ধরণের লোভনীয় আচরণের জন্য এরই মধ্যে তার কাছ থেকে তার সেসব বান্ধবরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন বলে জানা গেছে। আর এর পর থেকেই সুফিয়ান অনেকটা একঘরে আছে বলে জানিয়েছেন একাধিক সূত্র। বন্দর আওয়ামী লীগের প্রথম সারির নেতাদের সাথেও কখনও কোন সখ্যতা গড়ে তুলতে পারেননি তিনি। সুফিয়ানের বিরুদ্ধে ২০১৬-১৭ সালের দিকে নাসিক ২৫ নং ওয়ার্ডের বেশ কয়েকটি কাজে একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ হয়ে স্থানীয় দালালদের সাথে আঁতাত করে সিটি কর্পোরেশনকে ভুল তথ্য দিয়ে স্থানীয় জনগণের বিরুদ্ধে গিয়ে কাজ করার অভিযোগ আসে।
এ বিষয়ে সে সময় একাধিক সংবাদ মাধ্যমে খবর প্রকাশ করা হয়। আওয়ামী লীগের নেতা হয়েও নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের সর্বশেষ নির্বাচনে ২৩ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদে বিএনপি নেতা এবং বিএনপির সাবেক এমপি আবুল কালামের পুত্র আবু কাউসার আশার পক্ষ হয়ে কাজ করার অভিযোগ রয়েছে সুফিয়ানের বিরুদ্ধে।
আওয়ামী লীগের অনেকেই মনে করেন মেয়র আইভীর সু-দৃষ্টি থেকে বঞ্চিত হওয়ার পর থেকেই মূলত রাজনীতি থেকে ছিটকে গেছেন তিনি। যদিও মেয়র আইভীর পক্ষে বন্দরের বিশাল একটি জনসমর্থন আদায় করা তার মাধ্যমেই সম্ভব হয়েছে বলে এর আগে সুফিয়ান দাবি করতেন বলে আওয়ামী লীগের একটি অংশ ও আইভীর ভক্তদের পক্ষ হতে জানা গেছে।
কিন্তু নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগসহ বন্দর আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা এখন দাবি করেন সুফিয়ানের নিজস্ব কোন কর্মীবাহিনী কিংবা সমর্থক কখনও ছিল না এবং এখনও নেই। এতদিন মেয়র আইভীর সমর্থকদেরই নিজের লোক বলে চালিয়ে গেছেন তিনি। তবে অনেকের মতে রাজনীতিসহ ভদ্র সমাজে নিজেকে পুনর্বাসন করতে চাচ্ছেন সুফিয়ান। এস.এ/জেসি


