চাষাঢ়া সোনালী ব্যাংকের সামনে ভ্যান বসিয়ে ১০ বছর যাবত তৈরী পোষাকের ব্যবসা করে আসছিলেন মুন্সীগঞ্জ থেকে আসা এক হকার। কিন্তু এখন প্রশাসনের কড়া নজরদারি থাকায় কাপড়ের পুটলিতে সামান্য মালামাল ভরে ফুটপাতে বসতে গিয়ে চোর-পুলিশ খেলেন। পুলিশ দেখলেই সমস্বরে চিৎকার ওঠে,‘আইলোরে আইলো’ আর সাথে সাথেই মালামাল পুটলিতে সামাল দিয়ে দৌড় দিতে হয়।
নাম জানতে চাইলে মাথা নেড়ে অসম্মতি জানিয়ে বললেন, এই মুহূর্তে পত্রিকায় নাম আসলে সমস্যায় পড়তে হবে স্যার। প্রশ্নকর্তাকে স্যার বলার কারণ জানতে চাইলে তিনি মুচকি হেসে জানালেন, দশ বছর যাবত কাস্টমারকে স্যার বলতে বলতে অভ্যাস হয়ে গেছে। দৈনিক কিরকম আয় হতো, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি যা বললেন তাতে মাথা চক্কর খাওয়ার জোগাড়। তিনি বললেন, সবদিন সমান আয় না হলেও খরচাপাতি বাদে দৈনিক ২/৩ হাজার কিংবা তারও বেশী লাভ হতো।
খরচাপাতি বলতে নিজের খাওয়া দাওয়া এবং পুলিশ ও নেতাদের নিয়োজিত লোকের হাতে চাঁদা তুলে দেয়ার কথা বুঝিয়েছেন। তবে সবচেয়ে বেশী আয় হতো ২টা ঈদ এবং পূজোর সিজনে। ওই সময় মাসে লাখ টাকার মতো আয় হতো। অল্প পূঁজিতে আয় বেশী দেখে তার বেশ কয়েকজন আত্মীয়কেও হকারী পেশায় ঠেনে এনেছিলেন। কিন্তু এখন তার কণ্ঠে হতাশার সুর বেজে ওঠেছে। তিনি পেশা বদলের কথা চিন্তা করছেন। পূঁজি ভেঙ্গে বসে বসে আর কতোদিন খাওয়া যাবে!
প্রসঙ্গত, নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি এবং সাংবাদিকদের কড়া নজরদারি অব্যাহত থাকায় হকাররা ফুটপাতে বসতে পারছেন না। ফেব্রুয়ারি মাসের ৩ তারিখ থেকে তাদের ব্যবসা বন্ধ। দিনের বেলা নগরীর ফুটপাতে হকারদের ছোট চাকাযুক্ত বাক্স কিংবা রিকশাভ্যান দেখা না গেলেও মালামালভর্তি কাপড়ের পুটলি নিয়ে বসার কসরত করতে দেখা যাচ্ছে কিছু হকারকে।
মাঝে মাঝে চোর-পুলিশ খেলার মহরাতেও অংশ নিয়ে দিগিদিক ছুটতে হচ্ছে। এতে সময় সময় মারাত্মক দুর্ঘটনার শিকারে পরিণত হচ্ছেন অনেকে। তবে ইদানিং সন্ধ্যার পর ডিউটিরত কতিপয় অসাধু পুলিশের প্রচ্ছন্ন সহায়তায় ব্যস্ততম কিছু পয়েন্টে ভ্যানগাড়িতে মালামাল বিশেষকরে খাবার সামগ্রী নিয়ে হকারদের বসতে দেখা যায়। এমন একজন হকারের সাথে কথা বলে জানা যায়, তিনি পুলিশ নিযুক্ত লোকের হাতে কড়কড়া একশ’ টাকার নোট দিয়ে ভ্যান বসিয়েছেন। তার এমন কথায় প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, তবে কি বেড়া খেত খাচ্ছে?
নগরীতে হকারের সংখ্যা কতো, তার কোন নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই। তবে নথিপত্র খতিয়ে দেখা গেছে, ২০০৮ সালে ৮শ’ হকারের একটা তালিকা করা হয়েছিলো। ওই তালিকানুযায়ী নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী মিশনপাড়ার মোড়ে হকার্স মার্কেট নির্মাণ করে সেখানে ৬শ’ হকারকে দোকান বরাদ্দ দেন। পাশাপাশি ডিইটি এলাকায় ২শ’ হকারকে পুনর্বাসন করেন।
কিন্তু কাস্টমার কম হওয়ার কারণে লোকসানের অজুহাত তুলে দুই জায়গা থেকেই হকার সটকে পড়ে। মিশনপাড়ার হকার্স মার্কেটের দোকান বিক্রি করে দিয়ে বেশীরভাগ হকারই ফের ফুটপাতে ঠিকানা খুঁজে নেয়।
গত ৩ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবে ত্রিপক্ষীয় গোলটেবিল বৈঠকে নগরীর ফুটপাতকে হকারমুক্ত করার কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়ার পর পাল্টে যায় সার্বিক দৃশ্যপট। মাসাধিককালের বেশী হকারমুক্ত নগরীর ফুটপাত। বোদ্ধামহল মনে করেন, আর দুয়েকটি মাস এই কঠোর অবস্থান বজায় রাখতে পারলে বেশীরভাগ হকারই পেশা বদল করতে বাধ্য হবেন। হকারদের বেশীরভাগই নগরীর বাইরের বাসিন্দ।
দেশের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ নগরীতে এসে আত্মীয়স্বজনের বাসায় কোনরকমে ঠাঁই নিয়েই হকারীতে নেমে পড়েন। এরা নগরীতে ভাসমান হিসেবেই চিহ্নিত। ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেলে ভাসমান হকারদের বেশীরভাগই পেশা বদল করে নিজেদের স্থায়ী ঠিকানায় ফিরে যেতে বাধ্য হবেন। এন. হুসেইন রনী /জেসি


