Logo
Logo
×

বিশেষ সংবাদ

দেশের প্রথম নারী ট্রেন চালক সালমা খাতুনের সাথে রোমাঞ্চকর এক ঘন্টা

Icon

সুজাতা আফরোজ

প্রকাশ: ০৮ মার্চ ২০২৪, ০৪:০৭ পিএম

দেশের প্রথম নারী ট্রেন চালক সালমা খাতুনের সাথে রোমাঞ্চকর এক ঘন্টা
Swapno

             
অসাধারণ একটি ঘন্টা!  গত ২৯.১১.২০২৩ তারিখ সন্ধ্যা সোয়া সাতটার ট্রেনের ইঞ্জিনে চালকের পাশে বসে এক রোমাঞ্চকর সন্ধ্যা ও অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। তাঁর আগে এই চ্যালেঞ্জিং নারীটির সাথে আমার পরিচয় পর্বের কথা একটু বলি। সেটিও বেশ মজার! সম্ভবত: অক্টোবরের শেষের দিকে এক সন্ধ্যায় আমি কমলাপুর রেলস্টেশনে ট্রেন থেকে নেমে রিক্সার জন্য অপেক্ষা করছিলাম।

 

 

এমন সময় ছোট্ট খাটো মিষ্টি চেহারার ৪০ উর্দ্ধ এক নারী আমাকে উদ্দেশ্য করে বলছেন- আসসালামু আলাইকুম, আপা কেমন আছেন? আমি সাধারণতঃ পথে-ঘাটে অপরিচিত কারো সাথে তেমন একটা কথা বলি না। পেশাগত কারণে অনেকে আমাকে চেনে, হয়তো আমি চিনি না, বিভিন্ন সাহায্য -সহযোগিতা চান, সহযোগিতা করি, অনেক সময় নানা বিড়ম্বনায়ও পড়ি।

 

 

এজন্য একটু রিজার্ভ থাকার চেষ্টা করি। সালামের জবাব দিয়ে বললাম-ভালো। তাকে পাল্টা কোন প্রশ্ন না করায় নিজে থেকে বলতে লাগলেন, আপনি যে ট্রেন থেকে নামলেন সেটি আমি চালিয়ে নিয়ে এসেছি। আমি অবাক চোখে তাকে বললাম- আপনি সালমা খাতুন, দেশের প্রথম নারী ট্রেন চালক! হেসে বললেন- জ্বী আপা, আমি সালমা খাতুন।

 

 

আপনাকে আমি এক সপ্তাহ ধরে ফলো করছি, নারায়ণগঞ্জে চাকুরী করেন? আপনার চলাফেরা আমার খুব ভালো লেগেছে, তাই পরিচয় হতে চাই। আপনার মোবাইল নম্বর দেন। আমার পরিচয় দিয়ে বললাম- হৃদয়ের গভীর থেকে অভিনন্দন আপনাকে এরকম দায়িত্বশীল চ্যালেঞ্জিং কাজ বেছে নেবার জন্য! বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ নিশ্চয়ই চেনেন?

 

 

কি বলেন আপা, মহিলা পরিষদ আমাকে সম্মাননা দিয়েছে, পুরস্কার দিয়েছে, সম্মানীও দিয়েছে! আমাকে নিয়ে ফিচার লিখেছে। আপনারা নারীদের নিয়ে অনেক কাজ করেন, এটা খুব ভালো লাগে! তার সহজ-সরল স্বীকারোক্তি আমাকে মোহিত করল। রিক্সা ঠিক করে তাকে জিজ্ঞেস করলাম- কোথায় যাবেন? সে বলল- শাহজাহানপুর।

 

 

বললাম- ওদিকেই আমি যাব, রিক্সায় উঠেন, নামিয়ে দিব। পথে সংসার, কর্ম জীবন নিয়ে টুকটাক কথা হলো। মোবাইল নম্বর দিয়ে আমি বিদায় নিলাম। এরপর তার ট্রেনে প্রায়ই উঠা হয়। সে নিয়মিত ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে ড্রাইভ করে। আমাদের হাই-হ্যালো চলতে থাকে। তার চ্যালেঞ্জিং কাজ নিয়ে কিছু করার কথা মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে।

 

 

ভাবছি- নারী দিবসে তাকে নিয়ে একটি প্রোগ্রাম করব নাকি একটি ফিচার লিখব। এসব ভাবতে ভাবতে একটি অদ্ভুত চিন্তা মাথায় এলো! তার ট্রেন চালানো দেখব। দেখতে হলে ইঞ্জিনে উঠতে হবে। এরকম ভাবতে ভাবতে একদিন কমলাপুর রেলস্টেশন গেটে তার সাথে আবার দেখা হলো- সেই উচ্ছোসিত সম্মোধন- আপা কেমন আছেন?

 

 

কুশল বিনিময়ের পর ইচ্ছের কথা জানালাম। সাথে সাথে বললেন- আজকে বিকেলের যে কোনো ট্রেনে আসেন, আমি আছি, ফোন দিয়ে আসবেন। ঠিক করলাম- সন্ধ্যা সোয়া সাতটার ট্রেনে আসব। ভেবে দেখলাম- রাষ্ট্রীয় বাহন একটা মৌখিক অনুমতি নিয়ে রাখা দরকার। ট্রেন পরিচালনার দায়িত্বে যারা থাকেন, তাঁদের একজনের সাথে কথা বলে নিলাম।

 

 

বললেন- আপনি যেহেতু  পরিচিত, নারী অধিকার নিয়ে কাজ করেন, অসুবিধে নেই। সারাদিন নানা কল্পনায় ভাসতে লাগলাম! অফিসের কাজ শেষ করে সাতটার দিকে নারায়ণগঞ্জ স্টেশনে পৌঁছালাম। দেখি ট্রেনটি স্টেশনে ঢুকছে। মনটা আরো তরুণ হয়ে উঠলো! ট্রেনটি স্টেশনে দাঁড়ালে ইঞ্জিনের দিকে এগিয়ে গেলাম! রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে নিরাপত্তা ব্যবস্থা বেশ জোরদার।

 

 

পুলিশ ফোর্সের সদস্যরা টহল দিচ্ছে। জিজ্ঞেস করলাম- সালমা আপা কি ড্রাইভিং সিটে? উত্তরে বললেন- ম্যাডাম, ইঞ্জিন এখনই চেঞ্জ হবে, আপনি সামনের দিকে যান, ওখানেই ভালোভাবে উঠতে পারবেন। সামনে এগিয়ে গেলাম- ইঞ্জিন লাগাচ্ছে! উৎসুক জনতার ভিড়! আমাকে দেখে চার-পাঁচ জনের উৎসুক দৃষ্টি- এখানে উনি কেন, রেলওয়ের লোক নাকি নতুন ড্রাইভার?

 

 

হাতে আরো দশ মিনিট আছে। ইঞ্জিন লাগানোর কাজ শেষ হলে ফোন দিলাম, সালমা আপা ফোন না ধরে বাইরে উঁকি দিয়ে আমাকে উঠে আসতে বললেন। আলো-আঁধারিতে তেমন একটা দেখা যাচ্ছে না। কেউ একজন মোবাইলের টর্চ জ্বেলে আলো ফেলল। ইঞ্জিনে ওঠাটা আমার কাছে চ্যালেঞ্জ মনে হলো! উচ্চতা কম না, উঠার সিঁড়িটাও পুরোনো, কেমন যেন ভেতরের দিকে ঢুকে আছে।

 

 

কাঁধের ব্যাগটি গলায় ঝুলিয়ে দু'হাতে হাতল ধরে কোন মতে উঠে পড়লাম, যেন হিমালয় জয় করলাম! অনেক পুরোনো ইঞ্জিন, ভেতরে খুব একটা জায়গা নেই, দু'দিকে দুটো ড্রাইভিং সিট। একটি খালি রয়েছে। সালমা আপা বসতে অনুরোধ করলেন, আমি বসলাম না। বিনয়ের সাথে বললাম- ধন্যবাদ আপা, এমন স্পর্শকাতর সিটে আমার বসা ঠিক হবে না।

 

 

দু'তিন জন দাঁড়ানোর মতো জায়গায় রয়েছে। চলন্ত ট্রেনে অনায়াসে দাঁড়িয়ে থাকা যায়, কিন্তু বাসে কষ্টকর হয়! দায়িত্বপ্রাপ্ত আরো তিন জন ভাইয়ের সাথে পরিচয় হলো, তাদের আচরণও আন্তরিক। ট্রেন ছাড়ার আগেই আলাপচারিতা শেষ করতে হবে, কারণ, চালু অবস্থায় চালকের সাথে কথা বলা ঠিক হবে না। বললাম- কর্মজীবন সম্পর্কে বলুন।

 

 

সালমার ভাষ্য- জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি। ভাবতাম- প্রচলিত ধারার বাইরে নতুন কিছু করব। একদিন আমার বড় ভাই রেলওয়ের সার্কুলার এনে বলল- রেল চালক নিবে। অনেক সাহস নিয়ে চাকুরীর আবেদন করেছি। পরিবারের সবাই উৎসাহিত করেছে। সৃষ্টিকর্তার অশেষ রহমতে পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়ে চাকুরী লাভ করেছি।

 

 

২০০৪ সালে ৮ মার্চে যোগ দিয়েছি, প্রায় ২০ বছর হয়ে যাচ্ছে। যোগদানের সময় অনেক এক্সাইটেড ছিলাম! প্রশিক্ষণের সময় অন্যরকম অনুভুতি কাজ করেছে। প্রথম যে দিন ড্রাইভিং সিটে বসি, মনে হয় বিশ্ব জয় করে ফেলেছি। প্রথম দিকে সহকারী চালক হিসেবে কাজ করেছি।

 

 

বহু বছর হলো পুর্নাঙ্গ চালকের দায়িত্ব পালন করছি এবং আমার উপর অর্পিত দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথেই পালন করছি। কর্মজীবনে আমার সহকর্মীদের যথেষ্ট সহযোগিতা পেয়েছি, তারা সহযোগিতা না করলে কাজ করা কঠিন হতো। বিয়ের পর থেকে আমার স্বামীও আমাকে আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করে যাচ্ছেন।

 

 

সাধারণ দৃষ্টিতে মনে হয়, ট্রেন তো সমান্তরালভাবে লাইনের উপর দিয়ে চলে, চালানো এমনকি কঠিন! ট্রেন পরিচালনা করা অনেক চ্যালেঞ্জিং। এখানে তিনটি অর্গানকে মিলিতভাবে কাজে লাগাতে হয়। ব্রেন, মন, চোখ তীক্ষ্ণভাবে কাজ করে, এর প্রভাব পুরো শরীরে পড়ে। প্রচন্ড চাপের মধ্যে থাকতে হয়। হাজার যাত্রীকে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়।

 

 

সেই কাজটি ঠিকমতো করতে পারলে সারাদিনের ক্লান্তি ভুলে আত্মতৃপ্তি কাজ করে। একাগ্রতার অভাব হলে যে কোন দুর্ঘটনা ঘটতে পারে! দু'একটি সম্যসার সম্মুখীন হলেও নিজের কাজটুকু আনন্দের সাথে করার চেষ্টা করি, উপভোগ করি।

 

 

তার কথার সূত্র ধরেই বললাম- ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে চাকুরীতে যোগদান করেই আপনার বিরাট অর্জন- দেশের প্রথম নারী ট্রেন চালক, ইতিহাসের অংশ হয়ে গেলেন! উত্তরে বললেন- সত্যিই আপা, এই বিষয়টি খুব উপভোগ করি! বিভিন্ন গণমাধ্যম (পত্রিকা ও টিভি), বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান- বিশেষ করে আপনারা এবং সাধারণ মানুষের অনেক ভালোবাসা পেয়েছি।

 

 

সংসার জীবনেও ভালো আছি। আমি দুই সন্তানের জননী, আমার জীবনসঙ্গী বিচার বিভাগে কর্মরত। কথা বলতে বলতে ট্রেন ছাড়ার সময় হয়ে গেল। তিনি হুইসেল বাজিয়ে ট্রেন ছেড়ে দিলেন। আমি অনেক আগ্রহ নিয়ে তার ট্রেন চালনা পরখ করতে লাগলাম! মনের মধ্যে রোমাঞ্চকর অনুভূতি কাজ করছিল।  

 

 

হ্যান্ডেল, ব্রেক, হুইসেলের বাটন সবকিছুই লম্বাটে ধরণের, বেশ পুরনো! তার সুনিপুণ হাতের জাদুতে কি সুন্দর ঝিকঝিক শব্দ তুলে ট্রেন সামনের দিকে এগিয়ে চলছে! নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা প্রতিটি স্টেশনে যেতে ৫/৭ মি. লাগে। থামার সাথে সাথে তার অভিজ্ঞতা শেয়ার করছে। ইঞ্জিনের দুই পাশে দুইটি ছোট জানালা আছে।

 

 

সেই জানালা দিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখতে হয়, সে স্থির সামনের দিকে তাকিয়ে আছে! এবার ট্রেন চালু করলে আমি তার পাশে দাঁড়িয়ে সামনে দেখার চেষ্টা করলাম, কিন্তু দু'তিন মিনিটে হাঁপিয়ে উঠলাম, মাথা কেমন যেন ঝিমঝিম করছে! অথচ সে সামনে দৃষ্টি রাখছে, আবার অনায়াসে হাত দিয়ে ব্রেক হুইসেল- সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করছে।

 

 

যার কাজ তারেই সাজে, অন্য লোকের লাঠি বাজে! এরকম করে পাঁচটি স্টেশন অতিক্রম করে আমরা কমলাপুর রেলস্টেশনে পৌঁছালাম। অসাধারণ সুখানুভূতি অনুভব করলাম! সেও বলল- আজ আপনাকে সাথে নিয়ে আমিও ড্রাইভিং অনেক উপভোগ করেছি।আমাকে তার যাত্রাপথের সাথী করার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে জিজ্ঞেস করলাম-

 


আপনার জেলা? সালমা- টাঙ্গাইল। তাই নাকি!  আমিও তো টাঙ্গাইলের বউ এবং রেলওয়ে পরিবারের সদস্য, তাহলে তো একটা আত্মিক সম্পর্ক আছেই। নিশ্চয়ই সেই সুত্র ধরে আমাদের সম্পর্ক আরো এগিয়ে যাবে বলে বিদায় নিলাম।

 

 

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাণীবিদ্যায় অনার্স-মাস্টার্স করেছেন এই কৃতি নারী। সংসার, দুই সন্তান সামলিয়ে অদ্যম গতিতে এগিয়ে চলেছেন তিনি! আন্তর্জাতিক নারী দিবসে তার প্রতি আন্তরিক শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা রইলো।


সুজাতা আফরোজ
অনুষ্ঠান নির্বাহী
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ,নারায়ণগঞ্জ।    এন. হুসেইন রনী  /জেসি

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন