দিন কয়েক আগে চাষাড়া থেকে নারায়ণগঞ্জ বাস টার্মিনাল আসার পথে রিক্সাটি মীর জুমলা (দিগু বাবুর বাজার) রোডের দিকে ঢুকতেই আঁৎকে উঠলাম! এই রাস্তায় তো যানবাহন চলার কথা নয়! কয়েক দশক যাবৎ রাস্তাটি ব্যবসায়ীদের দখলে। অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম রিক্সাটি প্রায় বিনা বাধায় সিরাজউদ্দৌলা রোডে উঠে আসলো। মনে হল দীর্ঘ দিন পর একটি রাস্তা নতুন করে আবিষ্কার করলাম! যে রাস্তা ধরে একসময় নারায়ণগঞ্জ থেকে সদরঘাট পর্যন্ত বাস এবং ট্যাক্সি চলাচল করতো।
দিগু বাবুর বাজার সম্প্রসারিত হয়ে রাস্তাটি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। বাজারের সম্প্রসারিত অংশ উচ্ছেদ এবং হকার শূন্য হওয়াতেই এমনটি সম্ভব হলো। দীর্ঘদিন যাবৎ যা সমাধান অযোগ্য ছিল, কোন জাদু মন্ত্রে তা সম্ভব হলো? শহর সংশ্লিষ্ট দুজন মাননীয় সাংসদ, সিটি মেয়র এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সাথে প্রেসক্লাবে সাংবাদিক নেতৃবৃন্দের বৈঠকের পর এমন দৃশ্য প্রমাণ করলো নেতৃবৃন্দের সদিচ্ছা থাকলে সবই সম্ভব!
বৈঠকে মাননীয় জনপ্রতিনিধিগণ নারায়ণগঞ্জকে হকার মুক্ত করার দৃঢ় সংকল্প ব্যক্ত করেন। প্রশাসনিক কর্মকর্তাগণও তাঁদের সাথে ঐক্যমত পোষণ করেন। যার ফলে আমার মত প্রবীণ একজন মানুষ দীর্ঘদিন আগে হারিয়ে যাওয়া রাস্তাটি দিয়ে আবার রিকশায় চলার আনন্দ পেলাম। এমন দৃষ্টান্ত সমগ্র নারায়ণগঞ্জবাসীকে আশান্বিত করে তুলেছে। সবাই স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে হকারমুক্ত, যানজট মুক্ত, পরিচ্ছন্ন একটি নারায়ণগঞ্জ ফিরে পাওয়ার।
নারায়ণগঞ্জ শব্দটির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, এবং মাদক ব্যবসা। এসব অপকর্মের সাথে জড়িত ব্যক্তিগণের কারণে দেশের সবচেয়ে ধনী জেলাটি নানা ভাবে দীর্ঘদিন যাবৎ কলঙ্কিত হয়ে আসছে। দেশের অর্থনীতিতে সর্বোচ্চ অবদান রাখা জেলাটি তার প্রাপ্য সম্মান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বিলম্বে হলেও নারায়ণগঞ্জকে জঞ্জাল মুক্ত করার যে প্রয়াস তা নিশ্চয়ই সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য।
গুটিকয়েক হকারের জন্য নারায়ণগঞ্জ শহর বসবাস এবং চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ুক তা যেমন কাম্য নয় তেমনি ভাবে নারায়ণগঞ্জের কপালে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি এবং মাদক ব্যবসার কলঙ্ক তিলক লেপ্টে থাকুক তাও কোন অবস্থাতেই কাঙ্ক্ষিত নয়। সাধারণ মানুষের চাওয়া নিরাপদে নির্বিঘ্নে শহরে চলাচল করা, সন্ত্রাস চাঁদাবাজি এবং মাদক মুক্ত নারায়ণগঞ্জে বাস করা। এমন বৈধ চাওয়া পূরণ করা অসম্ভব কিছু নয়।
প্রয়োজন জনপ্রতিনিধিদের ঐক্যমত, সদিচ্ছা এবং প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা। প্রকৃত হকারদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও জনপ্রতিনিধি এবং প্রশাসনের দায়িত্ব। সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে তাদেরকে পুনর্বাসন করাও খুব কঠিন কোন কাজ নয় বলেই সচেতন মহলের ধারণা। তবে কোন অবস্থাতেই লক্ষ লক্ষ লোকের সমস্যা সৃষ্টি করে তাদেরকে প্রধান সড়কে বসতে দেওয়া কোন অবস্থাতেই কাম্য নয়। ফুটপাতের লাভজনক ব্যবসার জন্য নারায়ণগঞ্জ ছাড়া অন্যান্য জেলা থেকেও অনেকে এখানে এসে ব্যবসা খুলে বসে।
পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে মূলত নারায়ণগঞ্জবাসী হকারদের অগ্রাধিকার দেয়া উচিত বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করেন। নারায়ণগঞ্জকে হকারমুক্ত করার যে প্রয়াস চলছে তা সফল হোক এমনটি নারায়ণগঞ্জবাসীর প্রাণের দাবি। একই সাথে নারায়ণগঞ্জের জন্য সবচেয়ে বেদনাদায়ক, কলঙ্কজনক অধ্যায় সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি এবং মাদক ব্যবসা থেকেও নারায়ণগঞ্জ মুক্ত হোক এমন চাওয়া প্রতিটি নারায়ণগঞ্জ বাসীর। এমন প্রচেষ্টায় হাতেগোনা কয়েকজন অপরাধী শ্রেণীর ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সমগ্র নারায়ণগঞ্জবাসী উপকৃত হবে, তাঁরা জনপ্রতিনিধিদের পাশে থাকবে যা বলার অপেক্ষা রাখে না।
একজন জনপ্রতিনিধির জন্য এর চাইতে বড় পাওয়া আর কি-ই বা হতে পারে! সদিচ্ছা এবং ঐক্যমতের ভিত্তিতে নতুন দিনের যে সূচনা হয়েছে তা অব্যাহত থাকবে, নারায়ণগঞ্জবাসী ফিরে পাবে সুদীর্ঘ ঐতিহ্যের অধিকারী আধুনিক, বাসোপযোগী, কালিমা মুক্ত শহর, এমনটিই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা। লেখক: বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানী ও পোশাক শিল্পের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা। এস.এ/জেসি


