গোগনগরের সকল অপকর্মের মূলহোতা তারা
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৪ মার্চ ২০২৪, ০৪:১৮ পিএম
# আমরা অযোগ্য লোকদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছি : এলাকাবাসী
নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার গোগনগর ইউনিয়নের প্রতিটি এলাকা এখন অপরাধের জগত। সকাল থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত চলে একের পর এক অপরাধ। নারায়ণগঞ্জ শহরের দক্ষিণ প্রান্তে ইউনিয়নটি থাকায় একের পর এক অপরাধ করেও পার পেয়ে যাচ্ছে অপরাধীরা। আর এই অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ঐ ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধিরা। যাদের সেল্টারে দিন-রাত চলে নানা রকমের অপরাধ।
গত কয়েকদিন আগে গোগনগর ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ড মেম্বার রুবেল এর অন্যতম সহযোগী শিপনকে চর সৈয়দপুর এলাকায় সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পে ৮ ও ১০ বছরের দুই শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে আটক করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) নারায়ণগঞ্জ। ধর্ষণকারী শিপনকে সিলেট মেট্রোপলিটন এলাকার বংলা বাজার থেকে তাকে আটক করা হয়।
গত ফেব্রুয়ারি ৮ তারিখে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ৬ নাম্বার রুমে লৌমহর্ষক এ ধর্ষণের ঘটনাটি সংঘটিত হলেও ঘটনায় ধর্ষণের শিকার ১০ বছর বয়সী শিশুর বাবা বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে সদর মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন। আটক ব্যক্তির নাম শিপন আহম্মেদ (৩৪)। সে পশ্চিম সৈয়দপুর মুজিবনগর এলাকার হারিছ মিয়ার ছেলে। তার গ্রামের বাড়ি সিলেট। সে গোগনগর ইউনিয়নের প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পে তার স্ত্রী ইতি বেগমের নামে একটি রুম পায়, সে রুমে শিপন বসবাস করতো।
ঘটনার পরেই ৮নং ওয়ার্ডের মেম্বার আশ্রয় প্রকল্পের সভাপতি ও সহ সভাপতি সহ অন্যরা মিলে ধর্ষনের ঘটনার বিচার করেন এবং তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেন। পরে এ ঘটনায় রুবেল এর সহযোগীতায় কৌশলে আত্মগোপনে চলে যায় শিপন। পরে পুলিশের উন্নত তথ্য প্রযুক্তির সাহায্যে সিলেট মেট্রোপলিটন এলাকা থেকে তাকে আটক করে নারায়ণগঞ্জে নিয়ে আসে হয়।
মামলা সূত্রে জানা যায়, ধর্ষণের শিকার ১০ বছর বয়সী শিশুটির মা শারীরিক অসুস্থতার কারণে গ্রামের বাড়ি চাঁদপুর চলে গিয়েছিলে। মায়ের অবর্তমানে শিশুটি তার বাবার কাছেই ছিল। শিশুটির বাবা গত ৭ ফেব্রুয়ারি টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমায় যাওয়ার আগে মেয়েটিকে প্রতিবেশীর কাছে রেখে যান। বাবা ও মা না থাকার সুযোগে শিপন শিশুটিকে কার্টুন দেখানোর প্রলোভন দেখিয়ে নিজের কক্ষে নিয়ে গিয়ে শিশুটিকে একাধিকবার ধর্ষণ করে। এছাড়াও পিবিআই পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে আসামী শিপন একই ভাবে ৮ বছর বয়সী আরও এক শিশুকে ধর্ষণ করেছে এমন স্বীকারোক্তি দিয়েছে।
এ বিষয়ে গোগনগর ইউনিয়ন পরিষদের স্থানীয় এলাকা বাসীরা জানান, নির্বাচনের পর থেকেই এই ইউনিয়নের প্রতিটি এলাকায় বিভিন্ন অপরাধ হচ্ছে। আর এই অপরাধের পেছনের একমাত্র কারণ হচ্ছে আমরা অযোগ্য লোকদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছি। প্রয়াত চেয়ারম্যান নওশেদ আলী যখন চেয়ারম্যান ছিলো তখন এই ইউনিয়নের কোন সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ, ভূমিদস্যু, কিশোরগ্যাং ছিলো না। নওশেদ চেয়ারম্যানের ভাই ফজর আলী চেয়ারম্যান হওয়ার পর থেকেই এই ইউনিয়নের নানা অপকর্মের সৃষ্টি হয়েছে।
গোগনগর ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের মেম্বর রুবেল, ৭নং ওয়ার্ডের মেম্বার জাহাঙ্গীর, ১নং ওয়ার্ডের মেম্বার বাপ্পী প্রধান, ৫নং ওয়ার্ডের মেম্বার রফিক, সাবেক মেম্বার দৌলদ হোসেন এর ছেলে কাসেম সম্রাট ও রানা আহম্মেদ সবাই ছিলো চেয়ারম্যান ফজল আলী বাহিনী। নির্বাচনে পাশ করার পরে ভাগভাটোয়া নিয়ে তারা নিজের মধ্যে বিবেধ সৃষ্টি করে। আর তারপর থেকে তারা গোগনগরে যে যেমন ভাবে অপরাধ করে আসছে।
শাহ সিমেন্ট ও ক্রাউন সিমেন্ট ফেক্টরিতে ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য বিরোধ হয় রুবেল মেম্বার ও দৌলত হোসেন এর সাথে। সেই বিরোধে গত দুই বছর আগে রুবেল মেম্বার সহ তার বাহিনী দৌলত হোসেনকে পিটিয়ে হত্যা করে। জেলা কৃষকলীগের সাবেক সহ সভাপতি একসময়ের দক্ষিণ অঞ্চলের ত্রাস হিসেবে পরিচিত গোগনগর ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নং ওয়ার্ডের সাবেক মেম্বার দৌলত মেম্বার। যিনি একাধিক হত্যা চাঁদাবাজি ও মাদক মামলার আসামি ছিলেন।
দৌলত মেম্বার হত্যাকান্ডকে পুঁজি করে তার ছেলে কাশেম সম্রাট ও ফয়সাল এবং তাদের সহযোগী রানা আহমেদ এলাকায় চাঁদাবাজি, মাদক, ব্যবসা সহ সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। এছাড়াও নারায়ণগঞ্জ সদর থানা কৃষক লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হওয়ার পর থেকেই উৎপাত বেড়ে গেছে কাশেম সম্রাট ও রানা বাহিনী।
এলাকাবাসীর সূত্রে আরও জানা যায়, প্রায় দুই বছর আগে নাসিম ওসমান সেতুর সামনে বিচ্চু বাহিনীর প্রধান রুবেল আহমেদ মেম্বার বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে নিহত হন দৌলত মেম্বার। পিতার হত্যাকান্ডকে পুঁজি করে হাত মিলান রুবেল মেম্বারের আত্মীয় জলিল মিয়ার পুত্র রানা আহমেদ এর সাথে। বর্তমানে চর সৈয়দপুর এলাকায় সহ বিভিন্ন এলাকায় নানা রকমের অপকর্ম করে বেড়াচ্ছেন তারা। রাতের বেলা নাসিত ওসমান সেতুর সামনে নাইট ডিউটিরত পুলিশ অফিসাদের মেনেজ করে তারা চালিয়ে যাচ্ছেন নানা রকমের অপকর্ম।
এছাড়াও নির্বাচনের পরে প্যানেল চেয়ারম্যান না দেওয়ার ক্ষোভ ও অভিমান করে ৫নং ওয়ার্ডের মেম্বার রফিক হাত মিলিয়েছেন কাসেম সম্রাট ও রানার সাথে। রফিক মেম্বার নাসিম ওসমান সেতু চত্ত্বরের সামনে রানা মার্কেটে দিয়েছে তেলের ব্যবসা। সেখানে সে রাতের আধারে বিভিন্ন ট্রাক ও নদীতে ট্রলার ও সিপ থেকে চোরা তেল কিনে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে রফিক মেম্বার তাদের সাথে রাতের আধারে চোরা তেলের ব্যবসা করে আসছে। এছাড়াও ৭নং ওয়ার্ডের মেম্বার জাহাঙ্গীর আলম, যিনি চেয়ারম্যান ফজর আলী ও রুবেল মেম্বারে সহযোগী।
গত কয়েকদিন আগে রুবেল মেম্বার জাহাঙ্গীর মিলে কয়লা ঘাটের পাথর বিক্রি করেন। এছাড়াও জাহাঙ্গীর রুবেল এর ছত্রছায়াই চাঁদাবাজি ও ভূমি দুস্যতা করেন। আরও জানা যায় ৭নং ওয়ার্ডে বিভিন্ন মানুষকে নলকূপ দেওযার কথা বলে লাক্ষ লাক্ষ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এই জাহাঙ্গীর মেম্বার। ১নং ওয়ার্ডে মেম্বার বাপ্পী প্রধান, যিনি এবার প্রথম ইউপি সদস্য হয়েছেন। তিনিও চেয়ারম্যানের ছত্রছায়াই এলাকার লোকদের কল দেওয়ার কথা বলে টাকা নিয়েছে। আরও জানা যায়, গোপচর এলাকায় মাদক ব্যবসা ও ভূমিদস্যুদের সাথে এই বাপ্পী প্রধান জড়িত। এস.এ/জেসি


