Logo
Logo
×

বিশেষ সংবাদ

লাগামহীন প্রোএ্যাকটিভ হসপিটাল

Icon

যুগের চিন্তা রিপোর্ট

প্রকাশ: ৩১ মার্চ ২০২৪, ০৯:২২ পিএম

লাগামহীন প্রোএ্যাকটিভ হসপিটাল
Swapno

 

নারায়ণগঞ্জে ভুল চিকিৎসায় মৃত্যু উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। কয়েক দিন পরপরই কোথাও না কোথাও থেকে এমন খবর আসছে। সম্প্রতি গত কয়েক দিনের ভুল চিকিৎসায় মৃত্যুর ঘটনা বেশি ঘটছে। যা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে ভাবিয়ে তুলেছে। একইভাবে সিনিয়র বিশেষজ্ঞ ডাক্তার সহ সচেতন মহলকে ভাবিয়ে তুলেছে। তারই চিত্র যেন নারায়ণগঞ্জের প্রো এ্যাক্টিভ হসপিটালের ভুল চিকিৎসার মাধ্যমে উঠে এসেছে। এই প্রতিষ্ঠানে বিরুদ্ধে একাধিক ভুল চিকিৎসার অভিযোগ উঠেছে। তাদের বিরুদ্ধে তেমন ভাবে কোন ব্যবস্থা না নেওয়ায় দিনের পর দিন প্রো এ্যাক্টিভ হসপিটালও লাগামহীন হয়ে যাচ্ছে। তাদের লাগাম টানবে কে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

 

এদিকে সরকারি হসপিটালের চিকিৎসকদের মতে, বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে অপারেশন ও চিকিৎসা সেবায় ত্রুটি আছে। এর কারণ উদঘাটন করতে হবে। নইলে দেশের চিকিৎসা সেবায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কতিপয় চিকিৎসক এবং সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ ও অবহেলায় রোগীর মৃত্যু কোনভাবেই কাম্য নয়। তাছাড়া অজ্ঞানকারী ওষুধের কারণে, নাকি চিকিৎসকদের গাফিলতি, নাকি অন্য কোন কিছু তা অনুসন্ধানের মাধ্যমে মৃত্যুর কারণ খুঁজে বের করতে হবে। একই সাথে ভুল চিকিৎসায় অহরহ মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত টিম গঠনের দাবী জানান ভুক্তভোগী পরিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দায়িত্বরত কর্তাদের প্রতি।

 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২৩ সনের ২৩ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকায় অবস্থিত প্রো-অ্যাকটিভ হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় ফারজানা আক্তার (৪০) নামের এক গৃহবধূর মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ স্বজনদের। ২৩ ডিসেম্বর) সকাল সাড়ে ৮ টার দিকে ওই নারী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

 

মৃত নারীর স্বজনরা জানিয়েছেন, ২৩ ডিসেম্বর ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে ওই গৃহবধূর বুকে ব্যাথা উঠলে তারা তাকে প্রো-অ্যাকটিভ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানকার ডাক্তাররা রোগীর হার্ট ফেল করেছে জানিয়ে তাৎক্ষণিক দুটি ইনজেকশন দেয় তাকে। পরে অবস্থার আরও বেগতিক দেখলে এর কিছুক্ষণ পর রোগীকে আইসিইউতে নিয়ে গিয়ে আরও ১০টি ইনজেকশন দেয়। একপর্যায়ে ডাক্তাররা যখন বুঝতে পারেন রোগীর মৃত্যু হয়েছে তখন তাড়াহুড়ো করে রোগীকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। পরে রোগীর সঙ্গে থাকা স্বজনরা দেখতে পান সে কোনো শ্বাস-প্রশ্বাস নিচ্ছে না। তখন তারা বুঝতে পারেন তার মৃত্যু হয়েছে।

 

এদিকে এই মৃত্যুকে হত্যা দাবি করে ওই গৃহবধুর ভাসুরের ছেলে আনু খান তখন বলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জিজ্ঞেস করেছিলাম কি কি ইনজেকশন দেওয়া হয়েছিল? তারা কোনো উত্তর দেয়নি। এই হাসপাতালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

 

এই ঘটনার ছয় মাস না যেতেই ২৯ মার্চ সাংবাদিক আতাউর রহমানের বোন সাইনবোর্ড এলাকার প্রো-এ্যাক্টিভ হসপিটালে ভুল চিকৎসায় মারা গেছে বলে অভিযোগ তুলেন। এমনকি মৃত্যুর পর লাশ আইসিইউতে নিয়ে বেঁচে আছে বলে আশ্বাস দিয়ে ৫২ হাজার টাকা বিল করার অভিযোগ স্বজনদের। ২৮ মার্চ সকালে রোগী মারা গেলেও স্বজনদের জানানো হয় বিকেল ৪ টায়। এতে নিহতের স্বজনরা উত্তেজিত হয়ে হসপিটালে হট্টগোল করেন। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করেন। নিহতের নাম সালমা হোসেন (৪২)। তিনি ফতুল্লার ইসদাইর বাজার এলাকার ফারুক হোসেনের স্ত্রী, সাংবাদিক আতাউর রহমানের বোন হন।

 

নিহতের বড় বোন হোসনে আরা ইসলাম জানান, পেট ব্যথার কারণে আমার বোন সালমাকে ২৭ মার্চ দুপুরে প্রো-অ্যাকটিভ হাসপাতালে এনে ভর্তি করা হয়। আমার বোন সারা রাত ভাল ছিল। আমাদের সঙ্গে কথা বলেছে। ভোরে তাকে একটি ইনজেকশন দেওয়ার পর তার অবস্থা খারাপ হয়। তখন তাড়াহুড়া করে তাকে আইসিইউতে নিয়ে যায়। ভাল রোগীকে আইসিইউতে নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে বলা হয় রোগী কোমায় চলে গেছে। আইসিইউতে রাখলে ঠিক হয়ে যাবে। সকাল ৮ টার দিকে বোনের শরীরে হাত দিয়ে দেখি বরফের মত ঠান্ডা। চেহারা কালো হয়ে গেছে। আমার বোন মারা গেছে বলার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায় চিন্তার কোন কারণ নেই রোগী বেঁচে আছেন।

 

তিনি অভিযোগ করেন, চিকিৎসা  ব্যবস্থাপত্রে যে ডাক্তারের নাম উল্লেখ রয়েছে তিনি রোগীর চিকিৎসা করেননি। চিকিৎসা করেছেন অন্য একজন। যিনি চিকিৎসা করেছেন তিনি ডাক্তার না।

 

নিহতের ভাই আতাউর রহমান বলেন, বোনের মৃত্যুর খবর পেয়ে বিকেল সাড়ে ৩ টার দিকে হাসপাতালে আসি। তখনো আমাদের বলা হয়নি রোগী মারা গেছে। পরে ৯৯৯ নাম্বারে ফোন করলে পুলিশ আসার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ স্বীকার করে রোগী মারা গেছে। রোগী সকালে মারা গেলেও মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে দিনভর আইসিইউতে রেখে ৫২ হাজার টাকা বিল করেছে। ব্যবসা করার জন্য তারা ভুল ইনজেকশন দিয়ে রোগীকে মেরে আইসিইউতে নিয়েছে।

 

হসপিটালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাশেদুল ইসলাম বলেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজের চিকিৎসক একে.এম ফেরদৌস রহমানের তত্ত্বাবধানে রোগীর চিকিৎসা চলছিল। সকালেও তিনি রোগী দেখে গেছেন। ডাক্তার ফেরদৌস রহমানের মোবাইল নাম্বার চাইলে তিনি দেননি।

 

এই ভাবে রোগী অসহায় হয়ে হসপিটাল ক্লিনিকে চিকিৎসার জন্য আসলে তাদের ভুল চিকিৎসা দিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অর্থ হাতিয়ে নেয়ার জন্য মেতে থাকেন। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়ায় তারা দিনের পর দিন লাগামহীন হয়ে যাচ্ছে। তাদের যেন লাগাম টানার কেউ নেই। যার হারায় সে বুঝে তার কি চলে গেছে। তাদের কাছে অপচিকিৎসায় ভালো মানুষের প্রান গিয়ে অনেক পরিবারের প্রধান কর্তা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করছেন। কিন্তু তাতে ভুক্তভোগী পরিবার কোন বিচার পাচ্ছে না। অভিযোগ রয়েছে এই সকল প্রতিষ্ঠানের প্রভাবশালী মালিক পক্ষ থাকায় তাদের বিরুদ্ধে তেমন কোন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না।  

 

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, দেশের বিপুল সংখ্যক রোগীকে সরকারের একার পক্ষে চিকিৎসা সেবা দেওয়া সম্ভব না। এ কারণে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি চিকিৎসা সেবা থাকতে হবে। তবে সেবার মনোবৃত্তি থাকা বাধ্যতামূলক। সেবা মানসম্মত হতে হবে। সরকারের নিয়মনীতি মেনে পরিচালনা করতে হবে। সেই ব্যবস্থা না থাকলে অনুমোদন দেওয়া ঠিক হবে না। বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিকগুলো সঠিকভাবে পরিচালনা করছে কিনা, আইসিইউ আছে কিনা, গাইডলাইন অনুসরণ করছে কিনা তা নিয়মিত মনিটরিং করতে হবে। যদি সব ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে তারা অপারেশন করতে পারবে না। এই বিষয়গুলো নিশ্চিত করা গেলে ভুল চিকিৎসায় মৃত্যুর হার কমে আসবে। এস.এ/জেসি

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন