Logo
Logo
×

বিশেষ সংবাদ

জিমখানায় মার খায় প্রশাসন

Icon

যুগের চিন্তা রিপোর্ট

প্রকাশ: ০২ এপ্রিল ২০২৪, ০৯:২৬ পিএম

জিমখানায় মার খায় প্রশাসন
Swapno

 

নারায়ণগঞ্জ শহরের চিহ্নিত এক মাদক স্পটের নাম জিমখানা বস্তি। যেখানে বছরের পর বছর পারিবারিক ভাবে মাদক সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করে আসছে একাধিক সিন্ডিকেট। আশ্চর্য্যজনক হলেও সত্যি যে, ওই সকল মাদক সিন্ডিকেটের কাছে বর্তমানে রীতিমতো জিম্মি হয়ে আছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা!

 

কেননা, বিগত সময়ে পুলিশ ও ডিবির উপর হামলা- এমনকি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কাছ থেকেও আটককৃত আসামী ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা শোনা যায় এলাকাবাসীর মুখে। সচেতন নাগরিকদের প্রশ্ন, এ কেমন অভিযান? যেখানে সর্বদাই মাদকের গডফাদাররা থাকে ধরা ছোঁয়ার বাইরে! যদিও পুলিশ বলছে, তাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। খুব কম সময়ের মধ্যে গডফাদারদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হবে।       

 

এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে জানা যায়, বিগত সময়ে অভিযান পরিচালনার সময় সদর মডেল থানা পুলিশের তৎকালীন উপ-পরিদর্শক (এসআই) হাবিবের উপর হামলা চালায় মাদক কারবারীরা। নগরীর মন্ডলপাড়াস্থ মা হোটেলের সামনে এসআই হাবিবের কাছ থেকে আটককৃত মাদক কারবারীকে ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য অতর্কিত হামলা চালায় হাবু, বাবু ওরফে পিচ্ছি বাবু। পরবর্তীতে দ্বিতীয় দফায় তার উপর হামলা চালায় জিমখানার তানভীর ওরফে টুন্ডা তানভীর, আলমচান, লিমন ও আলো।

সচেতন এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে আরও জানা যায়, বিগত সময়ে পারিবারিক এই মাদক সিন্ডিকেটের কাছে হামলার শিকার হয় সদর থানা পুলিশের এসআই শফিউল্লাহ ও এসআই মেহেদী। এছাড়াও সর্বশেষ চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের চালানো অভিযান থেকেও আসামী ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা রয়েছে।

 

কারা এই পারিবারিক মাদক সিন্ডিকেট?

সূত্রের খবর অনুযায়ী, নগরীর নতুন জিমখানা এলাকার হাসির বাড়ি, সোলমান মিয়ার বাড়ি, লেকপাড় ও অটোরিক্সা স্ট্যান্ডসহ আশপাশের বিভিন্ন জায়গায় প্রকাশ্যে বেচাবিক্রি হচ্ছে ইয়াবা ও গাঁজা। পুলিশ-প্রশাসনের ধারাবাহিক অভিযানকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এক সময়কার জুয়ার আসরের প্রভাবশালী নিয়ন্ত্রক মাসুম ওরফে পিচ্চি মাসুম, আলো ওরফে ইয়াবা সুন্দরী, সিজার রাব্বী, আলম চান ও ইয়াবা লিমনের নেতৃত্বে সেখানে দেদারসে মাদক বেচাবিক্রি করে বেড়াচ্ছে শাহালম ও লিমন, মাদক সম্রাট আলম চানের ভাই লালচান ওরফে ফরমা লালচান, শাহাদাত ওরফে দালাল শাহাদাতসহ অন্তত ৮ থেকে ১০ জন সেলসম্যান। নগরীর শেখ রাসেল পার্ক এর লেকপাড় এলাকা অর্থাৎ নতুন জিমখানা রেলওয়ে কলোনী পশ্চিম পাশের জল্লারপাড় অংশে চলছে এই সিন্ডিকেটের লক্ষ লক্ষ টাকার ইয়াবা ও গাঁজার ব্যবসা। এছাড়াও এই সিন্ডিকেটকে ইয়াবা ও গাঁজা বিক্রয়ে আরও সহযোগীতা করে চলেছে র‌্যালীবাগান এলাকার চিহ্নিত মাদক কারবারী আকাশ ও রবিন।

 

সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নতুন জিমখানা এলাকার ৩টি মাদক স্পটে একাধিক বিক্রেতা দ্বারা দীর্ঘদিন যাবৎ মাদক বেচাবিক্রি করছেন মাদক সম্রাট আলম চাঁন। নতুন জিমখানা এলাকার হাসির বাড়ি, সোলমান মিয়ার বাড়ি, লেকপাড় ও অটোরিক্সা স্ট্যান্ডসহ আশপাশে আলমচানের অনুসারীরা সুকৌশলে মাদক বিক্রয় করে আসছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, পুলিশের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও পুলিশ সোর্সদের মাসোহারা দেওয়ার কারণে পুরো এলাকার যারা মাদককের নিয়ন্ত্রক তাদের কিছু হয় না।

 

এদিকে, নগরীর জিমখানা এলাকায় কাউন্টার বসিয়ে মাদক ব্যবসা পরিচালনা করে চলেছে হাসি ও তার ছেলে টিটু। পুলিশের কতিপয় অসাধু ব্যক্তির যোগসাজসে নির্বিঘ্নে দিনের পর দিন মাদক ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে পারিবারিক এই মাদক সিন্ডিকেট। জিমখানার হাসিনা ওরফে হাসি দীর্ঘদিন ধরে মাদক কারবারের সাথে জড়িত। তার নামে বেশ ক’টি মাদক মামলা রয়েছে। তার বড় ছেলে টিটু টেকনাফ থেকে ইয়াবা নিয়ে ঢাকায় প্রবেশ করার সময় ২৬ হাজার পিস ইয়াবাসহ ডিবির হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিল। এছাড়াও গত বছর ৫৮০ পিস ইয়াবাসহ পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয় টিটু। তার বিরুদ্ধেও বিভিন্ন থানায় মাদকসহ অন্তত ৭টি মামলা রয়েছে।

 

এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, জিমখানা বাজার, জিমখানা মাঠ ও টাঙ্কির সামনে প্রকাশ্যে খুচরা বিক্রেতাদের মাদকের যোগান দেয় হাসির ছেলে টিটু। আর তাদের সেলসম্যান হিসেবে কাজ করে প্রায় ৭ থেকে ৮ জন। তাদের মধ্যে, মনির ও ফাতি অন্যতম। সেখানে খুচরা ইয়াবা ও হেরোইন বেচাবিক্রি করে তারা। জিমখানা উত্তরে আপন দুই ভাই আলম চান ও লাল চানের নেতৃত্বে চলে ইয়াবার ব্যবসা। আর জিমখানায় গাঁজা বিক্রি করে মামুন ও শরীফ নামের দুইজন।

 

অপরদিকে, জিমখানা এলাকার ইয়াবার অন্যতম ডিলার রাব্বী ওরফে সিজার রাব্বী। এছাড়াও লেকপাড়স্থ জল্লারপাড় আর সেখানে থাকা সরকারি কোয়ার্টারের দ্বিতীয় তলায় মাদকের কাউন্টার খুলে বসেছে বাবু ওরফে বুলেট বাবু। সেখানে কনস্টেবল কাউছার নামের একজনকে প্রতিনিয়ত দেখা যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। জানা যায়, মূলত মাশেহারার টাকা নিতেই জিমখানায় যাওয়া আসা করে কনস্টেবল কাউছার।

 

এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহাদাৎ হোসেনকে অবগত করা হলে তিনি বলেন, মাদকের বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ পুলিশের জিরো টলারেন্স নীতি অব্যাহত আছে। আমাদের ধারাবাহিক অভিযানও অব্যাহত আছে। প্রায় সময়ই সেখানে থাকা মাদক কারবারীদের গ্রেপ্তার করা হয়। মূলহোতাদের কবে নাগাদ গ্রেপ্তার করা হতে পারে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, সব খোঁজ খবর নিচ্ছি। মাদকের সাথে সংশ্লিষ্ট সে যেই হোক না কেনো ছাড় দেওয়া হবে না।

 

জিমখানার স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, পারিবারিক সিন্ডিকেটে দিনের পর দিন মাদক ব্যবসা করা এই কারবারীদের বিরুদ্ধে এখানে কেউই কথা বলার সাহস পায় না। এমনকি স্থানীয় পঞ্চায়েতকেও তারা মানে না। মাঝে মধ্যে তারা জেলে থাকলেও পারিবারিক মাদক সিন্ডিকেট হওয়ায় কখনোই তাদের ব্যবসা বন্ধ থাকে না।

 

পরবর্তীতে তারা জামিনে বেড়িয়ে ফের মাদক কারবার চালিয়ে যায়। আর পুলিশ যদি কখনো অভিযান পরিচালনা করে তাহলে তারা আগেই খবর পেয়ে যায়। কেননা, মাদক স্পটগুলোর চারপাশে বসিয়ে রাখা হয় একাধিক পাহাড়াদার। এমনকি পুলিশের কতিপয় অসাধু সদস্য এবং তাদের সোর্সদের সাথে মাদক কারবারীদের গভীর সখ্যতা রয়েছে। কেউ তাদের বিরুদ্ধে কখনো প্রতিবাদ করলে হামলার শিকার হতে হয়। মূলত, এসব কারণেই ভয়াবহ এই মাদক কারবারীদের বিরুদ্ধে কেউ কথা বলার সাহস পায় না।

 

এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক-সার্কেল) জহিরুল ইসলাম যুগের চিন্তাকে বলেন, আমরা যে বসে আছি ব্যাপারটা এমন নয়। আমরা তথ্য প্রযুক্তির সহয়তা মাদক সিন্ডিকেটের সব তথ্য সংগ্রহে সর্বদা তৎপর রয়েছি। আশা করছি খুব কম সময়ের মধ্যে সেখানকার যারা মাদকের নিয়ন্ত্রক বা গডফাদার রয়েছে তাদেরকে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে পারবো। এস.এ/জেসি

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন