২০১১ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ওসমানদের আকাশে উড়তে থাকা জনপ্রিয়তাকে মাটিতে নামিয়ে আনেন আওয়ামী লীগ নেতা চুনকা কন্যা ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। ওসমান পরিবারের প্রভাবশালী রাজনীতিক যখন দলীয় মনোনয়ন সমর্থন পেয়ে আনন্দে আত্মহারা, তখন সেলিনা হায়াৎ আইভী ভোটের জন্য মানুষের দ্বারে দ্বারে ছুটেছেন। ফলাফলে যেটা হবার সেটাই হয়েছে।
শামীম ওসমান রাজনীতির মাঠে শুকনো মাটিতে আছাড় খেয়ে আইভীর কাছে হারেন। একযুগের বেশি সময় পর ওসমান পরিবার আবারো ওই ঠিক একই রকম হারের মুখ দেখলো। ২০১১ সালের সিটি নির্বাচনের আগে আইভীর সাথে ওসমান পরিবারের মোটামুটি সৌহাদ্যপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। তাদের কথার বাইরে গিয়ে নির্বাচন করতে চাওয়াতেই যত বিপত্তি বাধে। বন্দর উপজেলা নির্বাচনেও প্রায় একই রকম ঘটনা। বন্দরের মুসাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাকসুদ হোসেনও ওসমান পরিবারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন।
এমনকি সর্বশেষ ইউপি নির্বাচনে মাকসুদ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়েছেন। তবে বন্দর উপজেলা নির্বাচনে সেলিম ওসমান ও শামীম ওসমান বন্দর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এমএ রশিকে চেয়ারম্যান পদে এবং জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি সানাউল্লাহ সানুকে ভাইস চেয়ারম্যান পদে সমর্থন দেন এবং তাদের নেতাকর্মীদের মাঠে নামার ঘোষণা দেন। এমনকি মুসাপুরের ইউপি চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করার পর মাকসুদকে বক্তৃতায় দুই ভাই এক হাত নেন।
সেলিম ওসমান ও শামীম ওসমানের এমন ভূমিকায় গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরার পরিস্থিতি মনে করেন এমএ রশীদ এবং সানাউল্লাহ সানু। ফল যেটি চেয়েছিলেন তারা হয়েছে উল্টো। দুই ভাইয়ের রাজনীতির সাথে শুকনো মাটিতে আছাড় খেয়েছেন আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির দুই প্রবীণ নেতাও। এতোদিন যে কথাটি প্রচার ছিল ওসমান পরিবারের বিরোধিতা করলেই নেতা হওয়া যায়। তা আবারো সত্য হল। ওসমান পরিবারের নির্দেশ মতো তাদের আজ্ঞাবহ আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির কোন নেতাই রশীদ কিংবা সানুর পক্ষে নির্বাচনে সক্রিয় হয়ে কাজ করেননি।
ফলাফলে সেটিই প্রতিয়মান হয়েছে। চেয়ারম্যান পদে বিজয়ী মাকসুদ হোসেন যেখানে আনারস প্রতীকে পেয়েছেন যেখানে ২৯ হাজার ৮৭৩ ভোট সেখানে এমএ রশীদ ওসমানদের আজ্ঞাবহ হয়েও পেয়েছেন সবে মাত্র ১৪৮৩৮ ভোট। বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হওয়া আতাউর রহমান মুকুলও গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ১২ হাজার ৬২২ ভোট পেয়েছেন। চর্চা হচ্ছে বন্দর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এমএ রশীদের এমন ভরাডুবি কী বন্দরে আওয়ামী লীগের জন্য অশনী সংকেত কিনা। ওসমানদের আরেক প্রার্থী জাতীয় পার্টির জেলার সভাপতি সানাউল্লাহ সানুও শুকনো মাটিতে আছাড় খেয়েছেন।
অপেক্ষাকৃত নতুন এবং নীরবে নিভৃতে থাকা আলমগীর হোসেন ১৭ হাজার ৬০৬ ভোট পেয়েছেন। সানু পেয়েছেন ১৭ হাজার ১ ভোট। শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমানের সমর্থনের বাইরে প্রয়াত সাংসদ নাসিম ওসমানের পুত্র আজমেরী ওসমানের সমর্থন নিয়ে দাঁড়ানো মোশাইদ রহমান মুকিত ৮ হাজার ৪০৬ ভোট পেয়েছেন। এতে বন্দরে জাতীয় পার্টিরও দৈন্যদশার চিত্র ফুটে উঠেছে। বন্দরাবাসী বলছে, ওসমানদের মাত্রাতিরিক্ত তোষামদী আর আত্মবিশ্বাসই রশীদ আর সানুর পরাজয়ের মূল কারণ।
সূত্র বলছে, বন্দর উপজেলা আওয়ামী লীগের দুই বারের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা এমএ রশীদ। ২০১৮ সালে জাতীয় নির্বাচনের আগে এমপি পদে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিয়েও পরে খ্যান্ত হন। আর পুরস্কার স্বরূপ ওসমানদের কল্যাণে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হন রশীদ। এবারও জাতীয় নির্বাচনের আগে পোষ্টার সাটিয়ে এমপি ইলেকশন করার আভাস দেন। পরে আগের মতোই সরে যান। যার কারণে ওসমানদের সমর্থন পান রশীদ।
আওয়ামী লীগ নেতারা রশীদের পক্ষে নির্বাচনে না নামার পেছনে বেশ কিছু কারণ উঠে এসেছে। অনেকে বলছেন, এমএ রশীদ দুই দুইবারের বন্দর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। তবে তিনি বন্দরের কোন সাংগঠনিক কার্যক্রমের সাথে যুক্ত ছিলেন না। এমনকি ইউনিয়ন, ওয়ার্ড ইউনিটের সম্মেলনের মাধ্যমে গঠন করেননি কখনো। মূলত ওসমান পরিবার নির্ভর তোষামোদিতে ব্যস্ত থেকেই আওয়ামী লীগের বন্দরের নেতাকর্মীদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন। বিগত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও ইউনিয়নের প্রার্থীদের সাথে নেতিবাচক সংবাদে আসেন এমএ রশীদ।
প্রকৃত আওয়ামী লীগের কর্মীদের কাছ থেকে তিনি অত্যন্ত দূরে ছিলেন। এমএ রশীদ তার এলাকার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানও ছিলেন, গত ৫ বছর বন্দর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানও ছিলেন তবে সাংগঠনিকভাবে নেতাকর্মীদের সাথে মিশে যেতে পারেননি। এমএ রশীদ কোন বিপদে নেতাকর্মীদের পাশে থাকেননা এমন অভিযোগ রয়েছে। বন্দরের নুরু মিয়া বাচ্চুর ঘনিষ্ঠ ছিলেন তিনি।
শ্রমিকলীগের রাজনীতি ছিলেন রশীদ। পরবর্তীতে এসএম আকরামের হাত ধরে বন্দর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হন। কিন্তু একদশকে তিনি আওয়ামী লীগে রাজনীতি করলেও জাতীয় পার্টির প্রার্থী ও নেতাদের দ্বারা পরিবেষ্টিত বেশি ছিলেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সর্বশেষ ইউনিয়ন, ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সম্মেলন ছাড়াই শামীম ওসমান, সেলিম ওসমান, আবু হাসনাত শহীদ বাদলের সহযোগিতায় তিনি বন্দরের আওয়ামী লীগ কর্মীদের সংশ্লিষ্টতা ছাড়াই সভাপতি নির্বাচিত হন। বন্দরে বারবার জাতীয় পার্টির এমপি নির্বাচিত হওয়ায় বন্দরে আওয়ামী লীগ অনেক দুর্বল হয়ে গেছে। বন্দরে আওয়ামী লীগের চাইতে বিএনপি শক্তিশালী।
সেলিম ওসমান ও শামীম ওসমানের হস্তক্ষেপে জাতীয় পার্টিরও দুর্দশা। বন্দরে জাতীয় পার্টির ঘাঁটি হিসেবে তৈরি করেছিলেন প্রয়াত এমপি নাসিম ওসমান। ২০১৪ সালে তার মৃত্যুর পর জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক তৎপরতা ভেঙে যায়। কিতাবে আছে গোয়ালে নেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় বন্দরে। কাগজে কলমে জেলা ও মহানগর জাতীয় পার্টির বড় বড় কমিটি থাকলেও আদতে সাংগঠনিক পরিস্থিতি শুন্য। বন্দরে এবার তা ফুটে উঠেছে। বন্দর উপজেলার মানুষ ওসমান পরিবারে প্রার্থীকে প্রত্যাখান করেছে। এটা একটি সিগন্যাল বলছেন স্থানীয়রা।
এবারে বন্দর উপজেলায় যারা রশীদ কিংবা সানুর পক্ষে প্রচারণায় গিয়েছিলেন সেসব নেতা নারায়ণগঞ্জেই ভাসমান নেতা হিসেবে পরিচিত। কেউবা মুন্সিগঞ্জ থেকে এসে নারায়ণগঞ্জে পদ-পদবি নিয়ে পুনর্বাসিত হয়েছেন, কেউ বা কুমিল্লা অথবা চাঁদপুর থেকে এসে নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের বড় নেতা সেজে বসে আছেন। আবার সিটি অধীনের ওয়ার্ডের সন্ত্রাসী খেতাবপ্রাপ্ত নেতারা গিয়ে রশীদ-সানুর পক্ষে ভোট চেয়েছেন। আজ্ঞাবহ, তোষামোদী করা জনপ্রিয়তাহীন সংখ্যালঘু নেতার কথাতেও কেউ যায়নি তাদের পক্ষে। এতে বরং জনগণ বিক্ষুব্ধ হয়েছেন।
এমএ রশীদকে নিয়ে শামীম ওসমান ও জেলার আওয়ামী লীগ নেতারা নির্বাচনের আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে দেখা করেছেন, ছবিও গণমাধ্যমে এসেছে। আদতে সেগুলো কোন কাজে আসেনি। এতোদিন রাজাকার পরিবার হিসেবে দুর্নাম থাকলেও ওসমান পরিবার তাদের বগলদাবা করে রেখেছিল, এখন আবার তারাই যখন রাজাকার বলে মাকসুদকে ঘায়েল করার প্রক্রিয়ায় নেমেছেন জনগণ সেটিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। অজনপ্রিয় রশীদ-সানুকে জনগণের গলায় ঝুলিয়ে দেয়ার চেষ্টা অপঘাতে মারা পড়েছে। বন্দরে রশীদ ও সানু দুইজনই দলীয় পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের জায়গা না দিয়ে তাদের আজ্ঞাবহ ব্যক্তিদের ঠাঁই দিয়েছেন।
তাই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টির কোন ত্যাগী নেতাই তাদের পক্ষে কাজ করেনি। মাত্র ৪০ ভাগ লোক আনারসের মাকসুদের পক্ষে নেমেছেন। প্রশাসনের সুদৃঢ় ভূমিকায় নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে আর তাতেই বাজিমাত করেছেন মাকসুদ। জাল ভোট, কেন্দ্র দখল, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করার কেউ সুযোগই পাননি প্রশাসনের দৃঢ় ভূমিকার কারণে।
আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের চিত্র ফুটে উঠেছে। অচিরেই আওয়ামী লীগের বন্দরের কমিটি ভেঙে না দেয়া হলে এখানে আওয়ামী লীগের কর্মী পাওয়া যাবেনা। ওসমানদের পতন হলে আওয়ামী লীগ যেমন খুঁজে পাওয়া যাবেনা, জাতীয় পার্টিও ধ্বংস হবে। আওয়ামী লীগের চিরতরে পতন ঠেকাতে অচিরেই বন্দরে আওয়ামী লীগ ঢেলে সাজানোর দাবি করছে তৃণমূল।


