হেফাজত নেতাদের লাগামছাড়া বক্তব্যে অসহায় আ.লীগ
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ১০ মে ২০২৪, ০৮:২৩ পিএম
নানা ইস্যুতে হেফাজত নেতারা নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী লীগ নেতাদের হুমকি-ধমকি, শাসালেও তাদের কাছে অসহায় আওয়ামী লীগ নেতারা। হেফাজতের এসব নেতাদের বিরুদ্ধে গুটি কয়েক আওয়ামী লীগ নেতারা বক্তব্য দিলেও উল্টো যখন হেফাজত নেতাদের তাদের উপর চড়াও হন তখন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে কোন ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি।
যার ফলে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক দৈন্যতা আর বলয় ভিত্তিক রাজনীতির দরুণ অসহায় আত্মসমর্পণ করার বিষয়টি প্রকাশ পেয়েছে। সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের দেওভোগের শেখ রাসেল নগর পার্ককে মিনি পতিতালয় বলে মন্তব্য করেন হেফাজত নেতারা। এছাড়া নারায়ণগঞ্জ চারুকলা ইন্সটিটিউট এবং নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীকে নিয়েও কটূক্তি করেন হেফাজত নেতবৃন্দ।
এ ব্যাপারে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল হাই ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জাতীয় পরিষদের অন্যতম সদস্য এড. আনিসুর রহমান দিপু সরব হন। উল্টো এঘটনায় একটি সমাবেশ ডেকে এড.দিপুকে নানাভাবে হুমকি দেন হেফাজত নেতারা।
তবে এব্যাপারে এখন অবধি কোন প্রতিক্রিয়া কিংবা নিন্দা দিতে দেখা যায়নি আওয়ামী লীগ নেতাদের। অনেকে বলছেন, হেফাজতের হুঙ্কারে চুপসে থাকেন আওয়ামী লীগ নেতারা। অতীতেও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও সরকার প্রধানকে নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করেন হেফাজত নেতা মাওলানা আবদুল আউয়াল ও হেফাজত নেতা মাওলানা ফেরদৌসুর রহমান। তখনও এব্যাপারে কোন শক্ত পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি আওয়ামী লীগ নেতাদের। এতে তাদের সাংগঠনিক দৈন্যতার বিষয়টি প্রকাশ পেয়েছে।
৭ মে বিকেলে দেওভোগ মাদরাসার সামনে দেওভোগ শাখার ওলামা পরিষদের আয়োজিত অনুষ্ঠানে আওামী লীগ নেতাদের গোনায় ধরেন না বলে মন্তব্য করেছেন হেফাজত নেতা নারায়ণগঞ্জ মহানগর ওলামা পরিষদের সভাপতি মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান তিনি বলেন, ‘নামাজের সময় তোমরা গান বাজাইবা, আবার উল্টা আমাদের বিরুদ্ধে মামলা দিবা, এতো গাজাখুরি বক্তব্য নারায়ণগঞ্জ বাসী তোমাদের কাছ থেকে শুনতে চাইনা।
হয়তো কোন পদ-পদবী পাওয়ার জন্য এই রাস্তায় আগায়ছে, উনাকে রাস্তা দেখাইয়া সঠিক রাস্তায় আসার জন্য বলছি, আরে ব্যাটা আলেমদের পায়ে ধর ব্যাটা পদ-পদবী কতগুলো লাগে তরে শেখ হাসিনায় এমনিতেই দিয়া দিবো। পরিষ্কার ভাষায় বলতে চাই সামনে কর্মসূচি আসছে, কেনো? এদেরকে আমরা গোনায় ধরি না। আগেও বলছি আমাগো কয় গোনায় ধরতে কইছে। আরে ব্যাটা গোনায় ধরস দেইখাই তো সিটি করপোরেশনের মতো একটা গ্রহণযোগ্য প্রতিষ্ঠান আমাদের নামে মিথ্যা মামলা করস।
সাবধান করে দিচ্ছি এই মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার না করলে নারায়ণগঞ্জে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলবে। নারায়ণগঞ্জের রাজপথে আমরা আন্দোলন করেছি, এখনও আমরা আন্দোলন করছি, ভবিষ্যতে দেখাইয়া দেবো কতো ধানে কত চাউল। দেখবো তাদের খুঁেজ পাওয়া যায় কিনা, সেদিন তাওহীদি জনতা ভয়ে নারায়ণগঞ্জ থেকে আমরা না আপনারা পালাবেন।
এই সস্তা জনপ্রিয়তা আপনারা নিতে যাইয়েন না, আপনারা কেন এই নোংরা খেলা শুরু করেছেন। এই নোংরা খেলার যদি সমাপ্ত না করেন সামনে কর্মসূচি আসতাছে আল্লামা আব্দুল আউয়ালসহ আবু তালেহ হাজী সাহেবসহ দেখাবো খেলা কাকে বলে। আপনার কয়জন রাখতে পারেন, আমরা কয়জন রাখতে পারি। বাপের ব্যাটা যদি হয় আমাদের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করুন আর যদি কাপুরুষ হয়ে থাকেন সামনে আর একটা কথা বলারও অধিকার রাখবেন না।’
একই অনুষ্ঠানে হেফাজত তো মহানগর উলামা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক হারুন-উল-রশিদ বলছেন, ‘আমরা ভেসে আসি নাই, ফু-দিয়ে আমাদের উড়িয়ে দেবেন, আপনারা এতো গরম দেখিয়েন না। আনিসুর রহমান সাহেব বলেছেন আপনি বাড়ির থেকে বের করে ধরে নিয়ে আসবেন, চোখ উখরিয়ে ফেলবেন, আপনার এতো বড় ক্ষমতা, আব্দুল আউয়াল সাহেব ত দূরের কথা, মাওলানা ফেরদাউসুর ত দূরের কথা, আমি ত দূরের কথা আমার এক লাজক সদস্যের ঠেলা আপনি সামলাতে পারবেন না।
আপনাদের সুস্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিচ্ছি আপনার মুখকে সামলান, মুখ সামলিয়ে কথা বলোন, আনিসুর রহমান সাহেব মুখ সামলিয়ে কথা বলবেননা, না হলে আপনার মুখে তালা লাগিয়ে দেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, আনিসুর রহমান সাহেব আপনার বক্তব্য শুনে বলতে চাই, আপনার থেকে বড় মূর্খ নারায়ণগঞ্জে আর কেউ নাই, আপনি বলেছেন আপনার কাছে এজহার আছে, আপনি এই এজহার ধুয়ে-ধুয়ে সকাল-সন্ধ্যায় পানি খাইয়েন।
এই এজহার এটা মিথ্যা এজহার, এটা নিয়ে সমস্যা হয়েছে, এটা সমাধান হয়েছে, একটা মিমাংসায় বিষয়ে আপনি আবার এটা টেনে এনে নারায়ণগঞ্জের ভেতর একটা উচ্ছৃঙ্খল পরিবেশ করার চেষ্টা করেছেন। আপনাকে সুস্পষ্ট ভাষায় বলে দেই আপনি সোজা হয়ে যান। আপনাকে সাবধান করে দিচ্ছি আপনার মুখে তালা লাগান, রফিউর রাব্বি আপনার মুখেও তালা লাগান, সামনে আর বাড়ার চেষ্টা কইরেন না। আপনাদের যদি এতই সাহস থাকে তাহলে চিপার মধ্যে প্রোগ্রাম করেন কেনো। এক চিপার মধ্যে দুইটা মাইক দিয়া, চারজন নিয়া আপনারা সেখানে প্রোগ্রাম করেন।’
এদিকে এসব ঘটনায় এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগ নেতাদের পক্ষ থেকে কোন প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। শেখ রাসেল পার্ক ও চারুকলা ইন্সটিটিউট নিয়ে হেফাজত নেতাদের কটূক্তি প্রসঙ্গে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল হাই মন্তব্য করেন, ‘আমি বেশ কয়েকবার হেফাজতের এই দুই নেতার বিরুদ্ধে প্রশাসনের কাছে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছি।
ব্যবস্থা না নেয়ায় তারা ধৃষ্টতা দেখিয়েই যাচ্ছে। এটা তারা চালিয়ে যেতেই থাকবে। আমি জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার সাহেবের সাথে দেখা করে আবারও এনিয়ে কথা বলবো। এ্যাকশনে না গেলে এটা তারা করতে থাকবে এটাই স্বাভাবিক। তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসন শক্ত ব্যবস্থা নিবে এটা আমরা আশা করি। এগুলোর মধ্যে শয়তানি আছে। এগুলোকে অবিলম্বে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হোক। আমরা আওয়ামী লীগের সেন্ট্রাল নেতাদের সাথেও এদের বিষয়ে কথা বলেছি। শক্ত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি আবারো জানাবো।’
এ ছাড়া বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জাতীয় পরিষদের অন্যতম সদস্য সিনিয়র আইনজীবী আনিসুর রহমান দিপু এবিষয়ে মন্তব্য করেছিলেন, ‘যেহুতু তাদের নামে আইনশৃঙ্খলা কর্তৃপক্ষকে বার বার বলা সত্ত্বেও তারা শক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। আমাদের আবদুল হাই সাহেব বারবার এনিয়ে কথা বলেছেন কিন্তু অজ্ঞাত কারণে তারা আইনের আওতায় আসেনি।
এতে করে তাদের সাহস অনেক বেড়ে গেছে। তারা ধরাকে সরা জ্ঞান করছে। মসজিদকে রাজনৈতিক কার্যালয় বানিয়ে মাওলানা আউয়াল নেত্রী সম্পর্কেও নানা সময় আপত্তিকর কথা বলেছে মিম্বারে বসে। এনিয়ে মিডিয়ায় আমরা নারায়ণগঞ্জের মানুষ প্রশাসনের কাছে বিষয়টি খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছিলাম।
কোন সাহসে কার ইঙ্গিতে সে মিম্বারে বসে বারবার প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে কথা বলে, প্রগতিশীল রাজনীতিকদের নিয়ে কথা বলে যেগুলোর বেশিরভাগই আপত্তিকর কথা। এব্যাপারে তাদের আজও আইনের আওতায় না নিয়ে আসায় এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না করায় তারা এসব থেকে ক্ষ্যান্ত হবেনা। তারা এখন দেশের আবহকালের ঐতিহ্য সংস্কৃতি নিয়ে কথা বলছে, একসময় এগুলো পাকিস্তানিরা বলতো, বাধা দিতো।
সাম্প্রদায়িক মৌলবাদীদের যা যা করা দরকার প্রত্যেকটা কর্মকাণ্ডই তারা করে যাচ্ছে কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এব্যাপারে কোন ব্যবস্থা নিচ্ছেনা। এদের বিরুদ্ধে এখনই দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নেয়া হলে তাহলে আমি বিশ্বাস করি হেফাজতের পেছনে যে জঙ্গিবাহিনী আছে সেগুলো উৎসাহিত হবে, যেকোন সময় তারা নারায়ণগঞ্জের বড় ধরণের ঘটনা ঘটাতে পারে।’


