কাজী তানজিলা হোসেন একজন পশুপ্রেমী। গতকাল বুধবার বিকেল ৪টার দিকে তিনি এসেছিলেন নগরীর রাসেল পার্কে। বেড়াতে আর কুকুর বেড়ালদের পানি খাওয়াতে। পার্কে কথা হচ্ছিল তাঁর সঙ্গে। বললেন, বাসা থেকে আসতে আসতে তিনি চাষাড়া রেললাইনে নেমেছিলেন কয়েকটি কুকুরকে পানি খাওয়াতে। তবে প্রচণ্ড গরমের কারণে বেশিক্ষণ চাষাড়ায় থাকেননি। চলে এসেছেন শেখ রাসেল পার্কে।
পশুপ্রেমীদের সংগঠন ‘আমরা প্রাণবিক বন্ধু’র সদস্য তানজিলা রাসেল পার্কে প্রায়ই আসেন পরিবারের অন্যদের নিয়ে। তাঁর কাছে মনে হয়েছে নগরীর যে কোনো অংশের তুলনায় এ পার্কের তাপমাত্রা কম। বছরের যে কোনো সময়ই এখানে তুলনামূলক আরামদায়ক আবহাওয়া থাকে। এর সঙ্গে ফুলের গন্ধ, পাখির কলতান, বেড়াতে আসা শিশুদের মিষ্টি পদচারণা– সব মিলিয়ে একটা মোহময় পরিবেশ তৈরি হয়।
শিশুসন্তান আরিয়া ও স্ত্রী মরিয়মকে নিয়ে সিদ্ধিরগঞ্জের গোদনাইল থেকে রাসেল পার্কে এসেছিলেন আলোকচিত্রশিল্পী সাব্বির আহাম্মেদ রিংকু। গোদনাইলে তিনি যেখানে থাকেন, তার পশ্চিম দিকে কিছুটা এগোলে ডিএনডি খাল। পূর্ব দিকে অল্প গেলেই শীতলক্ষ্যা নদী। এরপরও সেখানকার তুলনায় রাসেল পার্কে উত্তাপ কম বলে জানালেন রিংকু।
তাই তিনি পরিবার নিয়ে এই তপ্ত সময়ে কিছুটা শান্তির খোঁজে আরও বহু মানুষের মতো রাসেল পার্কে এসেছেন বলে জানালেন। রিংকু জানান, তাঁর বাসার আশপাশে খাল ও নদী থাকলেও গাছ খুবই কম। এ কারণে সে জায়গা রাসেল পার্কের মতো অপেক্ষাকৃত শীতল না।
তানজিলা ও রিংকুর কথার সত্যতা পাওয়া গেল নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নগর পরিকল্পনাবিদ মাঈনুল ইসলামের দেওয়া তথ্যে। তিনি জানান, বিকেল ৪টায় রাসেল পার্কের তাপমাত্রার তুলনায় এর অদূরে নগরীর ২ নং রেলগেটে যেখানে একটি মিনি পার্কে কিছু গাছ থাকলেও জলাশয় নেই।
সেখানকার তাপমাত্রা ছিল প্রায় তিন ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। চাষাড়া মোড়ে যেখানে গাছ ও জলাশয় দুটির অভাবই প্রকট, সেখানে রাসেল পার্কের তুলনায় তাপমাত্রা প্রায় চার ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল।
তবে নারায়ণগঞ্জ শহরের চাইতেও গতকাল তাপমাত্রা বেশি ছিল সদর উপজেলার ফতুল্লা পোস্ট অফিস এলাকায়।
শুধু গতকাল নয়, সারা বছরই রাসেল পার্কের তাপমাত্রা নগরীর অন্য যে কোনো বৃক্ষ ও জলাশয়বিহীন জায়গার চাইতে কম থাকে, বললেন সিটি করপোরেশনের নগর পরিকল্পনাবিদ। তিনি জানান, জানুয়ারিতে যখন নগরীর বৃক্ষ জলাশয়বিহীন জায়গার গড় তাপমাত্রা ২৩.৫ ডিগ্রি ছিল তখন রাসেল পার্কের গড় তাপমাত্রা ছিল ১৯.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
একইভাবে সারা বছরই রাসেল পার্কের গড় তাপমাত্রা ২ থেকে ৫ ডিগ্রি পর্যন্ত কম থাকে। রাসেল পার্কের মতোই বাবুরাইল খাল ও ডিএনডি খালও বৃক্ষশোভিত করার পরিকল্পনা সিটি করপোরেশনের রয়েছে বলে তিনি জানান।
রাসেল পার্কের উদাহরণ টেনে প্রকৃতিপ্রেমীরা দাবি জানাচ্ছেন, নগরীকে বৃক্ষশোভিত করতে ও জলাশয়ে পূর্ণ করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার।
পেশাদার বিজ্ঞান বক্তা ও বিজ্ঞান লেখক আসিফ বলেন, জলাশয় থাকলে পানি বাষ্প হয়ে যায়। ফলে ঐ এলাকার তাপমাত্রা কমে যায়। আবার গাছ থাকলে রৌদ্রের কিরণকে মাটিতে পড়তে বাধা দেয়। ফলে স্থানীয় তাপমাত্রা কম থাকে। রোদের আলো কাজে লাগিয়ে গাছ খাদ্য তৈরি করে। এসব কিছু স্থানীয় তাপমাত্রা কমিয়ে রাখে।
রাসেল পার্ক পরিবেশবান্ধব স্থাপনার একটি দারুণ উদাহরণ। ডিএনডি এলাকার ১৮৮ কিলোমিটার খাল রয়েছে। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনেরও আরও জলাশয় রয়েছে। ডিএনডির বাইরে ও ভেতরে এসব খালকে ঘিরে রাসেল পার্কের মতো পরিকল্পনা করা দরকার। আরও জলাশয় তৈরি ও পুরোনো জলাশয় রক্ষা করা দরকার। তাহলে নারায়ণগঞ্জ শহর ও আশপাশের বিশাল এলাকার তাপ কমিয়ে আনা সম্ভব।
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন ৫৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকা ব্যয়ে এ পার্ক তৈরি করে। আয়তন প্রায় ১৮ একর। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের কনিষ্ঠ পুত্র শেখ রাসেলের নামে পার্কের নামকরণ করা হয়। গত বছর ১৩ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এর উদ্বোধন করেন। এন. হুসেইন রনী /জেসি


