দুদকের গণশুনানিতে ২৮ সংস্থার বিরুদ্ধে ৫৫ অভিযোগ
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৪, ১১:১৬ পিএম
নারায়ণগঞ্জে দুদকের ১৬৮তম আয়োজিত গণশুনানিতে আশানুরূপ সাড়া পাওয়া গেছে। নারায়ণগঞ্জের সম্বন্বিত কার্যালয় স্থাপনের পর প্রথমবারের মতো দুদকের গণশুনানি নারায়ণগঞ্জে অনুষ্ঠিত হয়েছে। দুদকের গণশুনানিতে মোট ৫৫টি অভিযোগ উত্থাপিত হয়। এর মধ্যে রয়েছে ডিপিডিসি, নির্বাচন অফিস, তিতাস, জেলা সমবায়, ভূমি, হাসপাতাল, পুলিশ, আনসার ভিডিপি, ট্রেনিং ইনস্টিটিউট ইত্যাদি।
অভিযোগগুলোর মধ্যে পাঁচটি অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য পাঠানো হয়। আটটি অভিযোগ তাৎক্ষণিক সমাধান করা হয়। বাকি অভিযোগগুলো ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করার সুপারিশ করা হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ শহরের শিল্পকলা মিলনায়তনে দুদকের গণশুনানিতে জেলার ২৮টি সংস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ দেন সাধারণ মানুষ। দুর্নীতির অভিযোগ ওঠা প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মঞ্চে ডেকে এনে অভিযোগের ব্যাখ্যা চান দুদক কমিশনার (তদন্ত) জহুরুল হক।
গণশুনানিপূর্বক আলোচনায় দুদক কমিশনার (তদন্ত) জহুরুল হক বলেন, ‘দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের আমরা একটু বেশি সম্মান করি। এতে সে দুর্নীতি করতে আরও উৎসাহিত হয়। বিশ্বের কোনো দেশ দুর্নীতিগ্রস্তদের সম্মান করে না। আপনারা এদের ঘৃণা করুন। শুধু বলবেন, দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের আমরা পছন্দ করি না। এটা সাহস করে বলতে পারলে দেশের ৮০ ভাগ দুর্নীতি কমে যাবে। নারায়ণগঞ্জ ধনী ও প্রভাবশালী এলাকা। যার প্রভাব বেশি, তার দুর্নীতিও বেশি। বিনা দুর্নীতিতে প্রভাবশালী হওয়া যায় না।’
জহুরুল হক বলেন, দুর্নীতিবাজ, জনগণকে এ দেশের মালিকানা দেওয়া হয়েছে। তাই আপনারা যারা সাধারণ জনগণ, তারা দুর্নীতিবাজকে সরাসরি দুর্নীতিবাজ বলতে শিখুন। এখানে যারা অভিযোগ দিবেন তাদের যেন কোনো প্রকার হয়রানি করা না হয় এবং প্রতিটি অভিযোগের বিষয়ে দুদক অত্যন্ত কঠোর থাকবে। আপনাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দায়িত্ব দুদকের। কিন্তু কেউ অন্যায্য অভিযোগ দিলে দুদক সেটি গ্রহণ করবে না।
তিনি বলেন, তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জ ধনী এলাকা, এখানে প্রভাবশালীর সংখ্যা বেশি। আর প্রভাবশালীরাই বেশি দুর্নীতি করে। অনেকেই এসে অভিযোগ করেন, আমার জমি অধিগ্রহণ করা হলেও সরকার আমাকে টাকা দিচ্ছে না। পরে খতিয়ে দেখা যায়, তার জমির খাজনা, খতিয়ান, নামজারি কিছুই ঠিক নেই। তাহলে অফিসার তাকে কীভাবে টাকা দিবে! কেউ হিংসাত্মক মনোভাব নিয়ে অভিযোগ দায়ের করবেন না।
দুদকের এই গণশুনানীতে ভুক্তভোগীদের নানা অভিযোগের বিষয়টি উঠে আসে। ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক মোকসেদ হোসেনের চাহিদা অনুযায়ী ৮৫ হাজার টাকা ঘুষ দিয়েছিলেন রূপগঞ্জের বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম। কিন্তু ঘুষ নেওয়ার কয়েক দিন পরই বদলি হয়ে অন্যত্র চলে যান মোকসেদ। টাকা ও তদন্ত উভয় ক্ষেত্রেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে তিনি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ দিয়েছেন। দুদকে অভিযোগের খবর পেয়ে বেশ কিছু টাকা পরিশোধ করেছেন অভিযুক্ত সেই পুলিশ কর্মকর্তা।
নারায়ণগঞ্জে দুদকের শুনানিতে হাজির হয়ে সাইফুল ইসলাম এসব অভিযোগ তুলে ধরে বলেন, ‘রূপগঞ্জে আমার জমি ভূমিদস্যুরা দখল করে নিচ্ছিল। আমি এই ঘটনায় মামলা করি। মামলার তদন্তভার পড়ে সিআইডির পরিদর্শক মোকসেদ হোসেনের ওপর। তিনি আমাকে বলে তদন্ত করতে কিছু খরচ লাগে। আমার কাছে ১ লাখ টাকা চাইলে আমি তাঁকে ৮৫ হাজার টাকা দিই। এর কয়েক দিন পরে তিনি বদলি হয়ে অন্যত্র চলে যায়। তাঁকে ফোন দিয়ে বলি আপনি আমার টাকাও নিলেন, কাজ করে দিলেন না।’
অভিযোগ শুনে দুদকের মহাপরিচালক আক্তার হোসেন বলেন, ‘অভিযুক্ত কর্মকর্তা এবং আপনি দুজনেই নিজেদের স্বার্থে সুবিধা চেয়েছেন। ঘুষ চাওয়ার পরে আপনি সিআইডির সিনিয়র কর্মকর্তাকেও এই বিষয়ে কোনো অভিযোগ দেননি। এ ক্ষেত্রে দুজনেই সমান অপরাধী। আপনাদের দুজনের বিরুদ্ধেই তদন্ত করবে দুদক।’
পুলিশের ডিএসবি শাখার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনেন রিপন নামে আরেক ভুক্তভোগী। তিনি বলেন, ‘পাসপোর্ট তৈরির জন্য পুলিশ ভেরিফিকেশনের দায়িত্ব দেওয়া হয় জেলা পুলিশের ডিএসবি শাখাকে। কিন্তু দীর্ঘদিন আমার ভেরিফিকেশন রিপোর্ট দেওয়া হচ্ছে না। ফলে আমি আমার পাসপোর্ট থেকে বঞ্চিত হচ্ছি।’
অভিযোগ শুনে দুদক কমিশনার (তদন্ত) জহুরুল হক ডিএসবির উদ্দেশে বলেন, ‘পাসপোর্ট আটকে রাখার অভিযোগ অনেক। আপনারা কেন এগুলো আটকে রাখেন? দ্রুত সময়ের মধ্যে রিপোর্ট দেবেন। যত দ্রুত সময়ের মধ্যে রিপোর্ট দেওয়া যায়। অহেতুক হয়রানি যেন না হতে হয় সাধারণ মানুষকে।’
গণশুনানিতে জেলা প্রশাসক মাহমুদুল হকের পরিচালনায় আরও বক্তব্য দেন দুদকের ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার মোরশেদ আলম, দুদক মহাপরিচালক আক্তার হোসেন, জেলা পুলিশ সুপার গোলাম মোস্তফা রাসেল, দুদক নারায়ণগঞ্জের সম্বন্বিত কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মইনুল হাসান রওশনী প্রমুখ।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাহমুদুল হক তার বক্তব্যে বলেন, ‘আজকে দুর্নীতি দমন কমিশনের যে গণশুনানি হলো, এখানে বিভিন্ন মানুষি তাদের অভিযোগ জানালেন। আয় বহির্ভূত সম্পদের অভিযোগও আমরা পেয়েছি। মোট ৫৫টি অভিযোগ এখানে পেয়েছি। তার মধ্যে ৫টি অভিযোগ তন্দন্তের জন্য নেওয়া হয়েছে, এটি প্রমাণিত হলে পরে এটি মামলার দিকে যাবে।
এছাড়া ৫০টি অভিযোগের এখানে তাৎক্ষনিক প্রতিকার দেওয়া হয়েছে। আপনারা দেখেছেন বিভিন্ন দপ্তরের প্রধানগণ এখানে রয়েছেন, এমনকি আমার দপ্তরেরও কয়েকটি অভিযোগ এখানে রয়েছে। সমস্যা সমাধানে বিভিন্ন দপ্তরের কাউকে এক সপ্তাহ সময় দেওয়া হয়েছে, আবার কাউকে পাঁচ দিনের সময় দেওয়া হয়েছে। অনেককে আবার আজকের কথাও বলা হয়েছে। সুতরাং এই গণশুনানি অত্যন্ত সার্থক এবং সফল হয়েছে।’
জেলা প্রশাসক আরো বলেন, দুর্নীতি এদেশে নতুন নয়। এটি অনেক পুরোনো। চানক্যের অর্থশাস্ত্রে দুই হাজার বছর আগে বলা হয়েছে, এই ভূখণ্ডে চল্লিশ প্রকারের দুর্নীতি হতে পারে। দুদকের আজকের আয়োজন সরকারি অফিসে সেবাপ্রার্থীরা কী ধরনের হয়রানি হচ্ছেন তা জানতে। সরকারি দপ্তরগুলো যদি ৫০ ভাগ সেবাও দিতে পারে তাও মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে পারে। তবে আমাদের কিছু সিস্টেমেটিক ত্রুটি আছে। আমার অফিসে প্রতিদিনই গণশুনানি হয়। সকাল থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সেবাপ্রার্থীরা যান।
জেলা পুলিশ সুপার গোলাম মোস্তফা রাসেল বলেন, এটা দুদকের খুব ভালো একটি উদ্যোগ। এর মধ্য দিয়ে সেবা দাতা ও সেবা গ্রহিতার মধ্যে একটি বন্ধন তৈরি হবে। আমাদের মুল উদ্দেশ্য হচ্ছে, সমাজের মধ্য থেকে দুর্নীতি নামক ব্যাধিটাকে উচ্ছেদ করা। আমি মনে করি, এটা ব্যক্তি পর্যায় থেকে শুরু করতে হবে। যদি আমি নিজে মনে করি যে, আমি দুর্নীতি করবো না; তাহলে এটা দুর করা সম্ভব হবে। আমি সব সময় বলে থাকি, একজন ব্যাক্তির দায় একটি প্রতিষ্ঠান নিতে পারে না। একটি প্রতিষ্ঠানে যদি এক’শ জন লোক থেকে থাকে তাহলে, তার মধ্যে ৯৫ ভাগের বেশি মানুষ ভালো। দুই-একজন কর্মকর্তার জন্য প্রতিষ্ঠানের দায়ভার নেওয়া ঠিক হবে না।


