নারায়ণগঞ্জের পত্রিকার পাতা কিংবা নিউজ পোর্টালে চোখ ভুলালে চোখের সামনে আসে এখানকার বিভিন্ন দপ্তরের দুর্নীতির খবর। এরমধ্যে প্রায় প্রতিদিনই চিকিৎসা সেবা, ভূমি সেবা ও তিতাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানী ও ডিপিডিসিসহ আরও বেশ কয়েকটি গুরত্বপূর্ণ সেবা প্রতিষ্ঠানের মধ্য থেকে কোন না প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতির থাকেই বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। এবার এই বিষয়গুলো নিয়ে বেশ আঁটসাঁট বেধে নেমেছেন দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) নারায়ণগঞ্জ।
বিশেষ করে গত ৬ জুন নারায়ণগঞ্জে অনুষ্ঠিত দুদকের গণশুনানির পর বিষয়টি খুবই গুরুত্বের সাথে নিয়েছে দুদক। এরই মধ্যে চিকিৎসা সেবার বিষয়ে নারায়ণগঞ্জের দুটি সরকারী হাসপাতালসহ এখানে অবস্থিত ব্যক্তি মালিকানাধীন চিকৎসাকেন্দ্র ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিষয় সতর্ক বার্তা দিয়েছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার (তদন্ত) জহুরুল হক। ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর সাথে ডাক্তারদের সম্পর্কের বিষয়টি খতিয়ে দেখাসহ বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করার দায়িত্ব দুদক নিবে বলেও ঘোষণা দেন তিনি। তবে এরই মধ্যে চিকিৎসা সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্নীতি ও অনিয়ম যাচাই বাছাইয়ে খুব শীঘ্রই মাঠে নামছে দুর্নীতি দমন কমিশন নারায়ণগঞ্জ।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, খুব শীঘ্রই নারায়ণগঞ্জ দুদক জেলার দুটি সরকারী হাসপাতাল ও বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অনিয়ম ও দুর্নীতি তদন্তের মাঠে নামছে। যে সকল ডাক্তারদের রুমের সামনে টোকেনসহ দালালদের ঘুরতে দেখা যাবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানা গেছে। তাছাড়া কোন্ ডাক্তার কতদিন যাবত টোকেন দেন, কোন ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সাথে তাদের হিসাব-নিকাশ তারও ব্যখ্যা নেওয়া হবে।
একই সাথে ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে তারা কত পার্সেন্ট কমিশন পান, হাসপাতালের কোন্ কোন্ মেশিন অকেজো আছে, তা সত্যিই অকেজো নাকি সাজানো নাটক তা খতিয়ে দেখবে দুদক। অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জের বেসরকারি চিকিৎসা সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কোন প্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহা পরিচালকের কাছ থেকে পাওয়া লাইসেন্স আছে কি না, তাদের ট্রেড লাইসেন্সগুলো ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নামে নেওয়া কি না, তাদের কাছে পরিবেশের ছাড়পত্র আছে কি না এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চুক্তিপত্র আছে কি না
এসব বিষয় খতিয়ে দেখবে দুদক। এই তদন্তের যাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম পাওয়া যাবে এবং সরকারী হাসপাতালের যেসব ডাক্তারের বিরুদ্ধে এসব অনিয়মের সাথে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যাবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে দুদক।
নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর দুর্নীতি নিয়ে দীর্ঘদিন যাবতই অভিযোগ করে যাচ্ছেন নারায়ণগঞ্জবাসী। স্থানীয়দের অভিযোগ, জেলা শহরে অবস্থিত দুটি সরকারী হাসপাতালের একটি হলো খানপুর ৩০০শত শয্যা হাসপাতাল এবং অপরটি হলো নারায়ণগঞ্জ জেনারেল (ভিক্টোরিয়া) হাসপাতাল।
এই হাসপাতালগুলোর প্রতিটি স্তরেই দুর্নীতি ও অনিয়ম। হাসপাতালের প্রায় প্রতিটি বিভাগেই এখন সেবার চেয়ে অর্থের দিকটাকে প্রাধান্য বেশি দিচ্ছে বলে মনে করেন তারা। এখানকার ডাক্তারগণ রোগীদের চিকিৎসা না করে প্রায় সময়ই তাদের প্রাইভেট চেম্বারে যাওয়ার জন্য উৎসাহিত করেন বলে বিভিন্ন সময় অভিযোগ আসে। রোগীদের বেশি একটা সময় না দিয়ে দালালদের সময় দেন বলেও অভিযোগ আসে।
এখান চিকিৎসা নিতে আসা বিভিন্ন রোগী ও তাদের পরিবার থেকে প্রায়ই অভিযোগ আসে, হাসপাতালের মূল ফটকের সামনে রোগীরা প্রবেশ করার সময় থেকেই দালালরা পিছু নিয়ে তাদের প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার প্রলোভন দেখাতে শুরু করেন। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সরেজমিনে যাচাই করতে গেলে বিষিয়টি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মিডিয়া কর্মীদেরও চোখে পড়ে। যা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দেখেও না দেখার ভান করে থাকেন বলে মনে করেন তারা।
অভিযোগের মধ্যে আরও আছে এখানে চিকিৎসা নিতে আসা বেশিরভাগ রোগীদেরই প্রয়োজনের তুলনায় বেশি টেস্ট করার পরামর্শ দেন ডাক্তারগণ। তাদের আর্থিক স্বচ্চলতা যাচাই-বাছাই না করে শুধুমাত্র নিজেদের অর্থলোভের কারণে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি আবার অনেক সময় প্রয়োজন না হলেও টেস্ট করার জন্য উপদেশ দেন ডাক্তারগণ এবং এজন্য তাদের পছন্দ মতো বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারের টোকেন বা স্লিপ ধরিয়ে দেন রোগীদের হাতে। অভিযোগ আছে, এসব ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সাথে কমিশন ভিত্তিক চুক্তি আছে তাদের। অর্থাৎ ‘যত টেস্ট, তত টাকা’ এমন চুক্তির কারণে তারা অনেক সময় অমানবিক হয়ে পড়েন।
শুধুমাত্র ডাক্তারদের সাথে সখ্যতার মাধ্যমেই হাসপাতালগুলোর আশেপাশে ব্যাঙের ছাতার মতো ডায়াগনস্টিক সেন্টার গড়ে উঠেছে। অনেক সময়ই ডাক্তারগণ তাদের নিজেদের চুক্তি করা প্রতিষ্ঠানে রোগীদের নিয়ে যাওয়া নিশ্চিত করতে তাদের সাথে হাসপাতাল থেকে স্টাফদের সঙ্গী হিসেবে পাঠিয়ে দেন। সে সব স্টাফরা রোগীদের দালালদের হাতে পৌছিয়ে দেন। অন্যদিকে এসব বেসরকারী চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগই কোন নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে শুধুমাত্র হাসপাতালের ডাক্তারদের উপার ভরসা করেই প্রতিষ্ঠিত।
অনেকেরই না আছে পরিবেশের ছাড়পত্র, না আছে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চুক্তিপত্র, না আছে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ট্রেড লাইসেন্স এবং না আছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইসেন্স। অনেকেই আবার কাগজপত্র প্রসেসিংয়ে আছে বলে বছরের পর বছর চালিয়ে যাচ্ছেন তাদের কার্যক্রম। এসব বিষয়ে বিভিন্ন সময় মিডিয়ায় সংবাদ প্রকাশ হয়ে আসছে। গত ৬ জুন অনুষ্ঠিত দুদকের গণশুনানিতে যার সর্বশেষ বহি:প্রকাশ ঘটে। তবে দুদকে তদন্তের এই বিষয়গুলো প্রমাণসহ বেরিয়ে আসবে বলে আশাবাদী নারায়ণগঞ্জবাসী।


