মন্ত্রণালয়, সংস্থা, দপ্তর ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ দেশের সর্ব ক্ষেত্রে সব অপরাধীর বিচার করা হবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে বঙ্গভবনে শপথ নেওয়ার পর জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে তিনি এই ঘোষণা দেন।প্রধান উপদেষ্টা বলেন, অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে সরকার গঠন হয়েছে তা মানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করবে।
অরাজকতার বিষবাষ্প যে ছড়াবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পূর্ণ শক্তি দিয়ে তা ব্যর্থ করবে। স্বাধীনতার সব অর্জন ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে হবে। সরকারি প্রতিষ্ঠান দিয়ে স্বৈরাচার সরকার নিজেদের ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রেখেছিল। এসব প্রতিষ্ঠানের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনা হবে। যারা অপরাধ করেছে তাদের আইনের আওতায় এনে শিগগিরই উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া হবে। এই কথা সব মন্ত্রণালয়, সংস্থা, দপ্তর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য প্রযোজ্য।
সর্বত্র অপরাধীর বিচার হবে।তিনি বলেন, প্রত্যেকটি অফিসের দায়িত্বরতরা নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে দ্বিতীয় স্বাধীনতা উপভোগ করবেন। দেশের মর্যাদাকে গৌরবের শীর্ষে নিয়ে যাবেন। সবাইকে নির্ভয়ে ও আনন্দচিত্তে নিজ নিজ কর্মস্থলে নিজের জায়গা থেকে সামর্থ্য নিয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে নতুন সরকারপ্রধান বলেন, দেশের সব মানুষকে স্বাধীন, নির্ভয়, নির্ভার, নিরুদ্রেক থাকার নিশ্চয়তা দেওয়ার জন্য ছাত্ররা শহীদ হয়েছেন। তারা গণঅভ্যুত্থান করেছেন। এই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সৃষ্ট সরকার সবার সরকার। এখানে সবার আকাঙ্ক্ষা পূরণের সরকার থাকবে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, অরাজকতার বিষবাষ্প যে-ই ছড়াবে বিজয়ী ছাত্রজনতাসহ মুক্ত মানসিকতার মানুষ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পূর্ণ শক্তি তাদের ব্যর্থ করে দেবে।
শেখ হাসিনা সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, নিষ্ঠুর স্বৈরাচারী সরকার দূর হয়ে গেছে। কাল সূর্য উদয়ের সঙ্গে সঙ্গে গণতন্ত্রের, সুবিচারের, মানবাধিকারের, নির্ভয়ে মতপ্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতার জন্য, সকলের স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনের ধারণের সুযোগ প্রদানের জন্য সচেষ্ট সরকারের বলিষ্ঠ সান্নিধ্য ও সহমর্মিতা দলমত নির্বিশেষে সবাই উপভোগ করবে, এটিই আমাদের লক্ষ্য। আপনারা আমাদের লক্ষ্য পূরণে সহযোগিতা করুন।
নতুন সরকারপ্রধান বলেন, সারা বিশ্ব আজ বলছে শাবাশ বাংলাদেশ, শাবাশ বাংলাদেশের ছাত্রজনতা। এই অর্জনটাকে আরও অনেক দূর নিয়ে যেতে চাই।
ড. ইউনূস বলেন, আমাদের ছাত্রজনতার জন্য এটি খুব কঠিন কাজ নয়। তরুণরা অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে। তারা সেজন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। সকলে যদি ঐক্যবদ্ধ থাকে আর ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম পরিহার করে, তাহলে বিজয় তাদেরই হবে।
শপথ অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, বিএনপি, জামাত, জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা এবং পেশাজীবীরা অংশ নেন। তবে আওয়ামী লীগ ও তাদের মিত্র ১৪ দলের কেউ ছিলেন না।
অন্তর্র্বতী সরকারের প্রধান নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ অন্যান্য উপদেষ্টাদের শপথ পড়ার অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এসেছিলেন প্রায় ৫০০ জন অতিথি। দরবার হলে প্রথম সারির মাঝখানে বসেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তার বাম দিকে বসেন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, এরপর বসেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। এরপর অন্তবর্তী সরকারের অন্যান্য উপদেষ্টারা বসেন।
প্রধান উপদেষ্টার ডান দিকে বসেন সেনাবাহিনী প্রধান ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল এম নাজমুল হাসান, বিমানবাহিনীর প্রধান হাসান মাহমুদ খাঁন। এরপর বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের, জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান সালমা ইসলাম, এলডিপির সভাপতি অলি আহমদ, নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব, জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) সভাপতি আন্দালিব রহমান পার্থ।
দ্বিতীয় সারিতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, জমির উদ্দিন সরকার, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সেলিমা রহমান, আবদুল্লাহ আল নোমান, হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, আব্দুল আউয়াল মিন্টু, জয়নুল আবেদীন, শামসুজ্জামান দুদু, আমানউল্লাহ আমান, মাহবুব উদ্দিন খোকনসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের বসতে দেখা যায়। একই সারিতে সিপিবির নেতা মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম,
গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স, বাংলাদেশ জাসদের সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়া, মোস্তাক হোসেন, এনডিএমের ববি হাজ্জাজ, সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়ার ছেলে রেজা কিবরিয়া, গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নূর, এনপিপির ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, এলডিপির শাহাদাত হোসেন সেলিম, বাংলাদেশ জাতীয় দলের সৈয়দ এহসানুল হুদা, জাগপার খন্দকার লুৎফর রহমান, বাসদের খালেকুজ্জামান ভূঁইয়া, সাম্যবাদী দলের (১৪ দল বিরোধী অংশ) সৈয়দ নুরুল ইসলাম।
দ্বিতীয় সারিতে নতুন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামানকে দেখা গেছে। হুইল চেয়ারে করে এ সারিতে বসেন বিশিষ্ট আইনজীবী ড. কামাল হোসেন। এরপর তৃতীয় সারিতে বসেন বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতরা। শপথ অনুষ্ঠানে প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানকে দেখা যায়নি। তার আসনটি শূন্য ছিল। অপরদিকে বিকল্পধারার যুগ্ম মহাসচিব মাহী বি চৌধুরী বিএনপি নেতাকর্মীদের তোপের মুখে প্রবেশ করতে পারেননি। তবে দলটির মহাসচিব মেজর অব. আব্দুল মান্নান শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দেন।
শপথ অনুষ্ঠান শেষে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক সাংবাদিকদের বলেন, ‘মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এই সরকারের প্রধান কাজ হবে অবাধ গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করে অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। একইসঙ্গে যত কালা কানুন আছে সেগুলোকে বাতিল করতে হবে।’ মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম সাংবাদিকদের বলেন, ‘সরকার যেন বেশি এজেন্ডা নিয়ে কাজ না করে নির্দিষ্ট এজেন্ডা নিয়ে কাজ করে।’
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। উপদেষ্টারা হলেন- বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহ উদ্দিন আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক ড. আসিফ নজরুল, মানবাধিকারকর্মী আদিলুর রহমান খান, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল হাসান আরিফ, সাবেক পররাষ্ট্র সচিব তৌহিদ হোসেন, পরিবেশ আইনজীবী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, নির্বাচন পর্যবেক্ষক শারমিন মুর্শিদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা ফারুকী আজম, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রি. জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান সুপ্রদীপ চাকমা, চিকিৎসক বিধান রঞ্জন,
ইসলামি চিন্তাবিদ আ ফ ম খালিদ হাসান, উন্নয়নকর্মী ফরিদা আখতার, গ্রামীণ ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক নূরজাহান বেগম, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক মো. নাহিদ ইসলাম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। বিধান রঞ্জন, সুপ্রদীপ চাকমা ও ফারুকী আজম ঢাকার বাইরে থাকায় আজ শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হননি বলে সচিব জানান।
এদিন দুপুর ২টা ১০ মিনিটে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস থেকে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফেরেন ড. ইউনূস। তাকে স্বাগত জানিয়েছেন সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, অন্য দুই বাহিনীর প্রধান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কেরা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। অলিম্পিক কমিটির আমন্ত্রণে বিশেষ অতিথি হিসেবে প্যারিসে গিয়েছিলেন ড. ইউনূস। সেখানে তিনি চিকিৎসা নিয়েছেন, তার একটি ছোট অস্ত্রোপচার হয়েছে।
ঢাকায় ফিরে প্রথম বক্তৃতায় ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করাই হবে আমার প্রথম কাজ। কারও ওপর কোনো হামলা যেন না হয়। দেশবাসী যদি আমার ওপরে বিশ্বাস রাখেন, ভরসা রাখেন, তাহলে নিশ্চিত করেন দেশের কোনো জায়গায় কারও ওপর হামলা হবে না। তিনি বলেন, আজ আমাদের গৌরবের দিন। যে বিপ্লবের মাধ্যমে নতুন বিজয় দিবস সৃষ্টি করল তরুণেরা সেটাকে সামনে রেখে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।
যারা এটা সম্ভব করেছে, যে তরুণ সমাজ তাদের প্রতি আমি আমার কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। তারা বাংলাদেশকে রক্ষা করেছে। নতুন করে পুনর্জন্ম দিয়েছে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর দেশ পরিচালনার জন্য অন্তর্র্বতী সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। গত মঙ্গলবার দ্বাদশ জাতীয় সংসদ ভেঙে দেন রাষ্ট্রপতি। ওইদিন রাতে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে তিন বাহিনীর প্রধান ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় অন্তর্র্বতী সরকারের প্রধান হবেন ড. ইউনূস।


