বিয়াই-পুত্রার কমিশন বাণিজ্য ছিলো তুঙ্গে
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৪, ১২:৪০ এএম
ফয়েজ উদ্দিন লাভলুর ছেলে মিনহাজুল ইসলাম ভিকি । তবে ভিকির সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি শামীম ওসমানের ছেলে অয়ন ওসমানের সমন্ধি। ছোট বোনকে অয়ন ওসমানের সাথে বিয়ে দেওয়ার পর ভিকি হয়ে উঠেন বেপরোয়া। নিজেকে কখনো কখনো ভিকি ওসমান বলেও পরিচয় দিতেন। পুরো মাসদাইর এলাকায় ভিকির বাহিনী ছিলো। তবে এই বাহিনীতে বেশির ভাগই ছিলো মাদকাসক্ত কিশোর। বাবা ফয়েজ উদ্দিন লাভলুও বিয়াই শামীম ওসমানের প্রভাবে এলাকায় নিজ বাড়িতে গড়ে তুলেছিলেন নিজস্ব আদালত।
এই আাদলতে তিনিই ওকিল আবার তিনিই বিচারক। তিনিও ছেলে ভিকির পাশাপাশি তার আদালতে বিভিন্ন বিরোধপূর্ন সম্পতি ও পাওনা টাকা উদ্ধারে আদালত বসিয়ে নিজের আখের গুছাতেন বলে অভিযোগ। কোটা সংস্কার আন্দোলনে যখন পুরো জেলা টালমাটাল তখনই শামীম ওসমানের বিয়াই ফয়েজ উদ্দিন লাভলু ও তার ছেলে ভিকি গা ঢাকা দেন। তবে বাপ-বেটা উভয়ে এখনো মাসদাইর এলাকার পাশে একটি বহুতল ভবনে আত্মগোপনে রয়েছেন বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছেন। অপেক্ষায় আছেন যে কোনো সময় নারায়ণগঞ্জ ছেড়ে অন্যত্র পাড়ি জমানোর।
ওসমান পরিবারের সাথে ঘনিষ্ঠ ব্যাক্তিদের দাপটে অনেকের ঘরে থাকাই দায় ছিলো। সেই সাথে যদি শামীম ওসমানের বিয়াই আর তার পুত্রা হয়,তাহলে তাদের বৃহস্পতি কতোটা তুঙ্গে থাকতে পারে তা সহজেই অনুধাবন করার মতো। শামীম ওসমানের ছেলে অয়নকে বিয়ে করান ফতুল্লার মাসদাইর এলাকার ফয়েজ উদ্দিন লাভলুর মেয়ে ইরফানা আহম্মেদ রেশমীকে। বোনের বিয়ের পর ভিকি মাসদাইর এলাকায় হয়ে উঠেন অঘোষিত নিয়ন্ত্রক।
বোন জামাই অয়নের ক্ষমতাকে পুঁজি করে ভিকি বিসিক শিল্প নগরীর আশপাশ ও কেতাব নগরের কিছু প্রতিষ্ঠানে প্রভাব বিস্তার করেন। এলাকায় আধিপত্য ধরে রাখতে ভিকি এলঅকায় বিশাল একটি বাহিনী গড়ে তুলেছিলেন। এই বাহিনীর বেশির ভাগ সদস্যই ছিলেন মাদকাসক্ত। এই বাহিনী যাকে খুশি তাকে ধরে নিয়ে গিয়ে ভিকির ভয় ভীতি দেখিয়ে মোটা অংকের টাকা হাদিয়ে নিতেন।
শুধু তাই-ই নয়, মাসদাইরের নিজ বাড়িতে নিজেই বসাতেন আদালত। একদিকে ছেলে ভিকির আদালত অপরদিকে ািছলো ফয়েজ উদ্দিগন লাভলুর আদালত। উভয় আদালতের কাজই ছিলো জমি সংক্রান্ত ও পাওনা টাকা নিয়ে সালিশ বসানো। তবে এই সালিশে বাদীর তেমন কোনো উপকার হতো না। বাদী কারো কাছে ১০ লাখ টাকা পাওনা হলে ভিকি বা লাভলুর আদালত কমিশনের মাধ্যমে সেই টাকা উঠিয়ে দিতেন। ১০ লাখ পাওনা টাকার মধ্যে বাদী পেতেন ৪ লাখ বাকি টাকা লাভলু ও তার ছেলের পকেটেই চলে যেতো। আর এ ধরনের কমিশন বানিজ্য গত কয়েক বছর ধরেই করে গেছেন বাপ বেটা মিলে মিশে।
কোটা সংস্কার আন্দোলনের পর শামীম ওসমান ও তার পরিবারের সাথে সাথে ভিকি ও তার পরিবার মাসদাইরের বাড়ি থেকে গা ঢাকা দেন। তবে তারা মাসদাইর এলাকায় একটি বহুতল ভবনে আত্মগোপনে আছে বলেও একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছেন। সূত্রের দাবী, ভিকি ও তার বাবা লাভলু ওসমান পরিবারে আত্মীয়তার সুযোগে যে অপকর্ম করেছেন এ কারনে যে জনরোষের সৃষ্টি হয়েছে তা থেকে বাঁচতেই এখন আত্মগোপনে চলে গেছেন। তবে এখনো নারায়ণগঞ্জ ছাড়তে পারেননি বাপ বেটা।
উল্লেখ্য, মাসদাইরের একটি শিল্প প্রতিষ্ঠানের সিকিউরটি গার্ডকে তুলে নেয়ার অভিযোগ উঠেছিলো ভিকির বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় মিনহাজউদ্দিন ভিকিকে আটক করেছিলো পুলিশ। পরে থানা থেকে ভিকিকে ছাড়িয়ে নিয়ে যান তার বাবা ফয়েজউদ্দিন লাভলু। এ বিষয়ে শোভন গ্রুপের মালিক ও বিকেএমইএ’র সাবেক সহ সভাপতি আবু মো. সিদ্দিক থানায় মামলা দেয়ারও প্রস্তুতী নিয়েছিলেন।
শিল্পপতি আবু মো. সিদ্দিক তৎকালীন সময়ে সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, তার মালিকানাধীন মাসদাইরের শোভন গার্মেন্টের একজন গার্ডকে ধরে নিয়ে যায় ফয়েজ উদ্দিন লাভলুর ছেলে ভিকি। খবর পয়ে তাৎক্ষনিক তিনি ভিকিদের বাড়ি মাসদাইর গুলশান ভিলায় ছুটে যান। ভিকির কাছে জানতে চান কেন তার গার্ডকে ধরে আনা হয়েছে। এ প্রশ্নের কোন জবাব না দিয়ে ভিকি উল্টো তার সাথে খারাপ আচরণ করে।
এক পর্যায়ে ভিকি বলে, বন্দুকটা আন। এরপর বিষয়টি আবু সিদ্দিক পুলিশকে জানায়। পুলিশ এসে ভিকিদের বাড়ি থেকে ওই গার্ডকে উদ্ধার করে আর ভিকিকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। ২০১৯ সালের ৩০ আগস্ট রাতে চাষাঢ়ায় কামাল হোসেন নামের এক সিএনজি চালকে মারধর করার অভিযোগে মামলার প্রেক্ষিতে পরের দিন ৩১ আগস্ট সন্ধ্যায় ভিকিকে গ্রেপ্তার করেছিলো ডিবি পুলিশ। তারও আগে পশ্চিম মাসদাইর এলাকায় জনৈক জুয়েলকে ধরতে পিস্তল উচিয়ে মহড়া দেয়ার ভিডিও চিত্র পাওয়া গিয়েছিলো। এছাড়া শহরের নিতাইগঞ্জ এলাকায় চটের বস্তা নিয়ে হুমকি, জামতলায় একটি বাড়ি দখলের অভিযোগ উঠেছিলো ভিকির বিরুদ্ধে।


