Logo
Logo
×

বিশেষ সংবাদ

ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোতে অস্থিরতার নেপথ্যে

Icon

যুগের চিন্তা রিপোর্ট

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০৫:২২ পিএম

ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোতে অস্থিরতার নেপথ্যে
Swapno

 

 

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে দেশে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর অস্থিরতা চলছে বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনে।  অনেক ব্যবসায়ী সংগঠনে নতুন কমিটি গঠনেরও দাবি উঠেছে। এরই মধ্যে কিছু সংগঠনে পরিবর্তন এসেছে। তবে যৎসামান্য পরিবর্তনে নাখোশ ব্যবসায়ীরা। বিকেএমইএ সেই ২০১০ সাল থেকে এককভাবে ফ্যাসিস্ট সরকারের আজ্ঞাবহ ওসমান পরিবারের সেলিম ওসমানের দখলে ছিল।  নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স দখলে ছিল সেলিম ওসমান তথা ওসমান পরিবারের আজ্ঞাবহ কর্মচারী খালেদ হায়দার খান কাজলের দখলে। 

 

এছাড়া  নারায়ণগঞ্জ ইয়ার্ন মার্চেন্ট এসোসিয়েশন ছিল সেলিম ওসমান-শামীম ওসমানের আরেক মাসেল ম্যান লিটন সাহার দখলে, নারায়ণগঞ্জ হোসেয়ারি সমিতি সেলিম ওসমানের কল্যানে দখলে ছিল নাজমুল আলম সজলের। মূলত এসব সংগঠনে নির্বাচন তো দূরের কথা সিলেকশনই ছিল মূল কথা। ২০১০ থেকে যারাই এসব বড় বড় ব্যবসায়িক সংগঠনে স্থান পেয়েছে তারা সবাই ছিল ওসমান অনুগত। এসব সংগঠন ছাড়াও নারায়ণগঞ্জের সকল ব্যবসায়ীক সংগঠনের নেতৃত্ব দখলে ছিল মূলত ওসমান পরিবারের আজ্ঞাবহদের। 

 

খালেদ হায়দার খান কাজল- মোর্শেদ সারোয়ার সোহেল, লিটন সাহা, শাহাদাৎ হোসেন সাজনু, নাজমুল আলম সজলদের দিয়েই সেলিম ওসমান সকল ব্যবসায়ীক সংগঠন, প্রশাসনে তদবীর, হুমকি-ধমকি, ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা উত্তোলনের কাজ চালাতেন। পটপরিবর্তনের পর ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর শীর্ষপদে থাকা ব্যক্তিরা কেউ কেউ পদত্যাগ নাটক আবার কেউ কেউ হত্যা মামলায় আসামি হয়ে গা ঢাকা দিয়েছেন। তাদের অবর্তমানে আবারো নির্বাচন ব্যতিত ওসমানদের ‘বি টিম’ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করছেন।

 

 এতে ব্যবসায়ীদের তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিত নারায়ণগঞ্জের প্রায় সকল ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোতে অস্থিরতা বিরাজ করছে। নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স থেকে কয়েকটি হত্যা মামলায় আসামি হওয়ার পর অপসারণ না করে পদত্যাগ নাটক করে সরেছেন কুখ্যাত খালেদ হায়দার খান কাজল। তবে তার ভাই সোহেল আক্তার সোহান এখনও বিকেএমইএ ও চেম্বারের দায়িত্বে। আছেন মোর্শেদ সারোয়ার সোহেলও। যে মূলত খালেদ হায়দার খান কাজলের মতোই ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সেলিম ওসমানের পক্ষে নিয়োজিত ছিলেন।

 

বিগত সময়ে বিতর্কিত খালেদ হায়দার খান কাজলের প্রশংসা করে সেলিম ওসমান তাঁর কুকর্মের ফিরিস্তি দিয়ে গর্ব সহকারে বলতেন,  ‘নারায়ণগঞ্জে ১০টি জাতীয় ভিত্তিক ও জেলা ভিত্তিক ৩৮টি ব্যবসায়ী সংগঠন, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, জেলা প্রশাসন, জেলা ক্রীড়া সংগঠন সহ অন্যান্য সামাজিক সংগঠনের যে কোন দায়িত্ব চেম্বার সভাপতি (খালেদ হায়দার খান কাজল) নিজের কাজ মনে করে সমস্ত কাজগুলি নিখুতভাবে সম্পূর্ণ করতেন।’

 

জেলা ক্রীড়া সংগঠনের বারোটা বাজিয়েছেন শামীম ওসমানের শ্যালক তানভীর আহম্মেদ টিটুসহ তার আজ্ঞাবহ সিন্ডিকেট। আর নারায়ণগঞ্জে ১০টি জাতীয় ভিত্তিক ও জেলা ভিত্তিক ৩৮টি ব্যবসায়ী সংগঠনের বারোটা বাজিয়েছেন সেলিম ওসমান-শামীম ওসমান-খালেদ হায়দার কাজল সিন্ডিকেটের আজ্ঞাবহ লোকজন। যারাই ওসমানদের পারপাস সার্ভ করেননি কিংবা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন গত ১৬ বছর তারা নেতৃত্বে আসা তো দূরের কথা, সংগঠন নিয়ে টু শব্দ করার সাহস পাননি। 

 

মূলত গত ১৬ বছর এসব সংগঠন চলেছে সেলিম ওসমানের আজ্ঞাবহ টিম দিয়ে। এখন পটপরিবর্তনের পর সেলিম ওসমানের আজ্ঞাবহ ‘বি টিম’ এসব সংগঠনের নেতৃত্ব নিয়ে দৌড়ঁঝাপ করছে। ইয়ান মার্চেন্ট এসোসিয়েশনে হত্যা মামলার আসামি হয়ে পলাতক লিটন সাহার কুকর্ম ঢাকতে সংগঠনের এফডিআর ভেঙে টাকা পরিশোধ করছেন তাদের আজ্ঞাবহ মোজাম্মেলক হক ও টুপি মজিবুর নামে ব্যবসায়ী। এরমধ্যে লিটন সাহা সেলিম ওসমান-শামীম ওসমানকে আব্বা ডাকতেন লিটন সাহা, আর লিটন সাহাকে আব্বা বলে সম্বোধন করতেন টুপি মুজিবর। 

 

ব্যবসায়ী সংগঠনর নেতৃত্ব কিভাবে গঠিত হতো এগুলো নিয়ে অনেক হাস্যরসাত্মক ঘটনা চর্চিত ব্যবসায়ীক মহলে। বিকেএমইএ’তে যারা বর্তমানে দায়িত্বে আছেন তাঁরা গত ১৬ বছরের বেশি সময় ধরেই ওসমান পরিবার তথা সেলিম ওসমানের আজ্ঞাবহ ছিলেন।

 

ক্রান্তিকালে বিতর্কিত খালেদ হায়দার খান কাজলের বিদায়ের পর চেম্বার অব কমার্সে দায়িত্ব নিয়েছেন সজ্জন ব্যবসায়ী মডেল গ্রুপের সভাপতি মাসুদুজ্জামান। তিনি বোধ হয় ওসমানদের প্রেআত্মাদের চড়াও হওয়ার বিষয়টি ধরতে পেরেছেন। সম্প্রতি ব্যবসায়ীদের সাথে প্রশাসনের এক মতবিনিময় সভায় তিনি বলেছন, ‘বিকেএমইএ যদি চায় তবে তাদের একজন সহসভাপতি দিয়ে চেম্বার অব কমার্সটাকে পরিচালিত করেন। বিকেএমইএর কারণে আমরা অবহেলিত হচ্ছি।’

 

নারায়ণগঞ্জের সকল ব্যবসায়ী সংগঠনে  ব্যবসায়ী নেতাদের ক্ষোভের মূলে অনেক ব্যবসায়ী সংগঠনের নির্বাচনে কারচুপি, ভুয়া ভোটার দিয়ে ভোটগ্রহণ ও বলপ্রয়োগ করে প্রার্থীকে নির্বাচন থেকে সরিয়ে দেওয়ার মতো বিষয়গুলো রয়েছে। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বঞ্চিত ব্যবসায়ীরা দাবি তুলছেন নেতৃত্ব পরিবর্তনের। ব্যবসায়ীরা বলছেন, দলীয় ব্যানারে প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে নেতৃত্বে এসে ব্যবসায়ীর স্বার্থ সংরক্ষণে ব্যর্থ হয়েছেন নেতারা। 

 

এ অবস্থায় এই নেতাদের পরিবর্তে ব্যবসায়ী মহলের সমস্যা সমাধানে নতুন নেতা নির্বাচন করতে চান তারা। নির্বাচনের নামে বিগত সময়ে সিলেকশন দুর্বৃত্ত নেতৃত্ব চাপিয়ে দেয়া হয়েছিলো নারায়ণগঞ্জের সকল সংগঠনের ব্যবসায়ীদের উপর। নানা অজুহাতে সেলিম ওসমানের আঙুলের ইশারায় কাজলের নির্দেশে ব্যাপক চাঁদাবাজির রাজরাজত্ব তৈরি করে অত্যাচারের খড়গ চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল ব্যবসায়ীদের উপর।

 

খোঁজ নিয়ে জানা য়ায়, অনেক ব্যবসায়ী সংগঠনের মাঝে নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষত ছাত্র আন্দোলনের সময় তাদের ভূমিকাও ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। সরকার পতনের পর পদত্যাগ নাটক করে সটকে পড়েছে সেলিম ওসমান। তার সাথে কাজলসহ অন্যরাও। এখন তাদের অবর্তমানে ওসমানদের ‘বি টিম’ আগামী দিনে ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃত্ব দিয়ে অতীতের কর্মকান্ড ধরে রাখতে চায়।  ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর কিছু পদে পরিবর্তন এসেছে। 

 

যদিও এখনো ব্যবসায়ীদের ভেতরগতভাবে আন্দোলন ও তীব্র অসন্তোষ চলছে পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার দাবিতে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একটি স্বার্থান্বেষী ও স্বৈরাচারী শাসকের কতিপয় ব্যক্তির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হওয়ার কারণে সংগঠনগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম আজ প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে।

 

গত একদশক ধরে সেলিম ওসমান ও খালেদ হায়দার খান কাজলের ঘনিষ্ট হিসেবে নানা মহলে দৌড়ঁঝাপ করতে দেখা গেছে, এফবিসিসিআই এর সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি মোহাম্মদ আলী, বাংলাদেশ নীট ওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারাস এন্ড এক্সপোটারস এসোসিয়েশন সাবেক সভাপতি মঞ্জুরুল হক, বাংলাদেশ হোসিয়ারি এসোসিয়েশনের সাবেক সহ-সভাপতি রাশেদ সারোয়ার, বাংলাদেশ নীট ডাইং ওনার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন খসরু, বাংলাদেশ পাট আড়ৎদার সমিতি এর সভাপতি আলহাজ্ব ফয়েজ উদ্দিন লাভলু, 

 

বাংলাদেশ পাল্স এন্ড লেনটিল ক্রাশিং মিল্স ওনার্স এসোসিয়েশন সভাপতি এড. সুলতান উদ্দিন নান্নু, বাংলাদেশ ক্লথ মার্চেন্ট এসোসিয়েশন, সহ সভাপতি মজিবুর রহমান, বাংলাদেশ নিটিং ওনার্স হোসিয়ারি এসোসিয়েশনের সিনিয়র সহ সভাপতি আবুল বাশার, সহ সভাপতি রকিবুল হাসান, বিকেএমইএ এর পরিচালক আব্দুল হান্নান, খন্দকার সাইফূল ইসলাম, রতন কুমার সাহা।  এছাড়াও  চেম্বার অব কমার্সের সিনিয়র সহ সভাপতি মোরশেদ সারোয়ার সোহেল, 

 

চেম্বারের পরিচালক ফারুক বিন ইউসুফ পাপ্পু, সাহাদাত হোসেন ভূইয়া সাজনু, সোহেল আক্তার সোহাকে। এদের মধ্যে অনেকে সরে দাঁড়িয়েছেন, আবার অনেকে স্বপদে বহাল, আবার কেউ কেউ তার অধিনস্ত ও আজ্ঞাবহদের দায়িত্ব সপেছেন। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ওসমান পরিবারের প্রেসক্রিপশনে ব্যবসায়ীদের নেতা বনে গেছেন গত ১৬ বছরে এমন কোন ব্যক্তি কিংবা ব্যবসায়ীকে যাতে ব্যবসায়ীদের সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে আনা না হয়, যদি সংস্কারের পর ভোটের মাধ্যমে নেতৃত্বে আসতে পারেন তবে সেটি ভিন্ন কথা।  

 

তবে অনেকেই বলছেন, বিকেএমইএসহ নারায়ণগঞ্জের জাতীয় ভিত্তিক সংগঠনগুলোর নেতৃত্বের ক্ষেত্রে বিজেএমইএ’র পথ অনুসরণ করলেই ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোতে ভালো সংস্কার সম্ভব।  গত ১১ সেপ্টেম্বর এফবিসিসিআইয়ে মো. হাফিজুর রহমান ও ই-ক্যাবে মোহাম্মদ সাঈদ আলীকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (মহাপরিচালক বাণিজ্য সংগঠন) ড. নাজনীন কাউসার চৌধুরীর সই করা আদেশে এ বিষয়ে বলা হয়েছে, নিয়োগকৃত প্রশাসক ১২০ দিনের মধ্যে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নির্বাচিত কমিটির কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করবেন।’


ব্যবসায়ীরা বলছেন, আমরা ভোটের অধিকার ফিরিয়ে আনতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ কামনা করি। একজন প্রশাসকের অধীনে নির্বাচন হয়, যেখানে সবাই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। নির্বাচনের মাধ্যমে জয় পেলে সেই নেতৃত্ব অ্যাসোসিয়েশনের জন্য কাজ করে, সংগঠনকে বুঝতে পারে। কিন্তু বিনা ভোটে নেতৃত্ব এলে সেটা হয় না।। ব্যবসায়ীদের সমস্যা সমাধানে কাজ করবে সংগঠন, কিন্তু এতদিন সেটা হয়নি। সাধারণত ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সদস্যদের মতামত নেওয়া হতো না সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে নেতা নির্বাচিত হলে সেই নেতা সদস্যদের কাছে দায়বদ্ধ থাকেন। এতে সংগঠন যেমন সঠিকভাবে পরিচালিত হয়, ব্যবসায়ীদের দাবি-দাওয়ারও সমাধান হয়।

 

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন