মাসদাইরে জাহিদ-ফেরদৌস কাশীপুরে শহীদ-বাপ্পি বেপরোয়া
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ১০ মে ২০২৬, ১২:০০ এএম
মাসদাইরে জাহিদ-ফেরদৌস কাশীপুরে শহীদ-বাপ্পি বেপরোয়া
# র্যাব ও পুলিশের উপর হামলা করেও পার পেয়ে যাচ্ছে
# কাশীপুরে শহীদ-বাপ্পি খুলেছেন মাদকের কারখানা
# মূলহোতাদের চিহ্নিত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনবো : এডি.এসপি
রাজনৈতিক ছত্রছায়া যেন এক অভিশপ্ত আর্শীবাদ। সেটা কেউ পেলে দিন যতই যায় হয়ে উঠে হিংস্র বেপরোয়া। এবার যেন সেই বেপরোয়ার মাত্রা হার মানিয়েছে মাসদাইর ও কাশীপুরে। ২৪ ঘন্টার ব্যাবধানে মাসদাইরে র্যাব সদস্যদের ওপর হামলার পর কাশীপুরের দেওভোগ হাশেমবাগ এলাকায় পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে তিন আসামীকে পুলিশ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়। উভয় দুটি ঘটনায় পিছনের মূলহোতা মাসদাইরের বেয়ালীখালের জাহিদ-ফেরদৌস ও কাশীপুরের শহীদ-বাপ্পি এখনো অধরা। এই দুই বাহিনী বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে পাত্তা না দিয়ে একের পর এক অপকর্ম পরিচালনা করেই যাচ্ছেন, কিন্তু দেখার কেউ নেই। যার কারণ হিসেবে দিন শেষে উঠে আসে রাজনৈতিক শেল্টার। যাকে ঘিরে একের পর এক অপকর্ম পরিচালনা করে পাচ্ছেন ছাড়।
এদিকে জানা গেছে, ফতুল্লার মাসদাইর, ঘোষেরবাগ, গলাচিপা এলাকাতে একচ্ছত্রভাবে মাদক ব্যবসার নিয়স্ত্রক হলেন জাহিদ। তার নেতৃত্বে রয়েছে বেশ কয়েকজন ছিনতাইকারী ও ডাকাত। তাদেরকে দিয়ে বিভিন্নস্থানে এসব অপরাধগুলো করানো হয়। ২০২৫ সালের ১৬ নভেম্বর মাসদাইরে প্রকাশ্যে হামলা ও গুলির ঘটনায় অভিযুক্ত সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসায়ী জাহিদকে ধরতে র্যাবের তৎপরতা টের পেয়ে ছোরা গুলিতে জবা নামে একজন নারী গুলিবিদ্ধ হয়েছে। এর আগেরদিন ১৫ নভেম্বর সন্ধ্যায় মাসদাইর এলাকায় নাসিক ১৩নং ওয়ার্ড কৃষক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক নাহিদুর রহমান পারভেজের ওপর ছুরিকাঘাত ও গুলির ঘটনা ঘটায় জাহিদ ও তার সহযোগীরা।
২০২৪ সালের ২৪ জুলাই ফতুল্লা মডেল থানার এসআই সামছুল হক সরকার সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে মাসদাইর ঘোষের বাগ এলাকায় মাদক মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি জাহিদকে গ্রেপ্তার করতে যান। জাহিদকে ঘটনাস্থলে না পেয়ে তারা যখন ফিরে আসছিলেন তখনই পেছন থেকে জাহিদের সহযোগীরা এসআই সামছুল হক সরকারের ডান হাতের কনুইয়ের নিচে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায়। ওই বছরের ১৮ মার্চ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভিযানে আটক ৪ আসামিকে হামলা চালিয়ে ছিনিয়ে নিয়ে যায় জাহিদ ও তার সহযোগী মাদক ব্যবসায়ীরা।
একইভাবে গত (৫ মে) শহরের দেওভোগ লিচু বাগ এলাকায় র্যাব-১১–এর সাদাপোশাকের একটি গোয়েন্দা দল মাদকের আস্তানা রেকি করতে সেখানে যায়। তারা সেখানে পৌঁছানোর পরপরই কিছু বুঝে ওঠার আগেই অতর্কিত ধারালো অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তাদের ওপর হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। তারা র্যাবের তিন সদস্যকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে রক্তাক্ত জখম করে। পরে তাঁদের উদ্ধার করে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে (ভিক্টোরিয়া) ভর্তি করা হয়। তাঁদের মধ্যে গুরুতর অবস্থায় উপপরিদর্শক(এসআই) নজিবুল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। আহত অন্য দুজন হলেন মাহী (২৫) ও ইব্রাহিম (২৫)। জানা গেছে এই হামলার নেতৃত্বে ছিলেন সেই জাহিদ ও ফেরদৌস বাহিনী।
গত ২০২২ সালের (১৯ জানুয়ারী) কাশীপুরের জোড়া খুনের মামলার আসামি ছিলেন সাব্বির হোসেন শহিদ ও সিকদার বাপ্পি। ইতিমধ্যে শহীদের বিরুদ্ধে একাধিক মাদকের মামলা রয়েছে। কিন্তু ছিঁচকে বাপ্পি আড়ালে মাদক নিয়ন্ত্রণ চালায়। আর এলাকায় খাজার মুরিদান দাবি করে থাকেন। জানা গেছে, বিতর্কিত সাব্বির হোসেন শহিদ ও সিকদার বাপ্পির বিরুদ্ধে শহরের ডিআইটি থেকে শুরু করে নিতাইগঞ্জ, বাবুরাইল কাশীপুরের খিলমার্কেট, বাংলাবাজার হোসাইনি নগর, হাটখোলা, আম বাগান, চৌধুরীবাড়ি, শহীদনগর, গোগনগর, পাইকপাড়া, নামাপাড়া, শাসনগাঁও, ভোলাইল হয়ে পঞ্চবটি পর্যন্ত বিশাল এই এরিয়া জুড়ে মাদকের একছত্র নিয়ন্ত্রক।
একক নিয়ন্ত্রিত বিশাল এই মাদকের সাম্রাজ্যে হাত বাড়ালেই মিলে গাঁজা থেকে শুরু করে হেরোইন, ইয়াবা, ফেন্সিডিল ও মদ। শুধু মাদকের ডিলারশীপই নয় শহিদের মাধ্যমেই উল্লেখিত এলাকা গুলো জমি দখল, অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় সহ ছিনতাই ডাকাতি সকল কিছুর নিয়ন্ত্রক এই শহিদ-বাপ্পি। তা ছাড়া বাবুরাইলের সাবেক সন্ত্রাস হাসানের রূপ নিয়ে তার স্ত্রী বিভার ছত্রছায়ায় নিতাইগঞ্জ ট্র্কা স্ট্যান্ডের দায়িত্ব পেয়ে খাচ্ছেন লুটে পুটে। মাসে চাঁদাবাজি করে হাতিয়ে নিচ্ছেন ২০ লাখ টাকার ও বেশি। তাছাড়া উল্লেখিত এলাকাগুলোকে যদি অপরাধের স্বর্গরাজ্য বিবেচনা করা হয় তবে সেই রাজ্যের স্বঘোষিত সম্রাট হয়ে উঠেছে এই সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসায়ী শহিদ ও চিশতী সিকদার বাপ্পি।
বর্তমানে এরা কাশীপুরে ডাইস দিয়ে মাদক তৈরির কারখানা খুলেছেন। এভাবেই বিশাল সিন্ডিকেট তৈরি করছেন। অপকর্মে তাদের আরেক সহযোগী রয়েছে এক কথিত সাংবাদিক। যিনি আইনশৃঙ্খলা ম্যানেজ তাদের সহযোগীতাসহ কাশীপুরের বাঁশমুলি ও প্রধান বাড়ি এলাকায় শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী রাজু-সাজু-রাসেল বাহিনীর উপর হামলা চালিয়ে সেই এলাকার মাদক বর্তমানে নিজেই নিয়ন্ত্রণ করছেন। এদিকে বর্তমানে কাশীপুর ও সৈয়দপুরের অস্থায়ী পশুর হাট নিয়ে অরাজকতা করার পায়তারার অভিযোগ উঠেছে এই বাহিনীর বিরুদ্ধে। হাটে গরুর নামে বিভিন্ন জেলা থেকে নারায়ণগঞ্জে মাদক ঢোকানোর টেন্ডার নিয়েছেন এই শহীদ-বাপ্পি বাহিনী।
এদিকে গত বুধবার (৬ মে) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে কাশিপুর ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের পশ্চিম দেওভোগের হাশেমবাগ এলাকায় চাঁদা না পেয়ে লুটপাটের অভিযোগে ঘটনাস্থলে পুলিশ ৫ জনকে আটক করে। পরবর্তীতে আটককৃতদের পুলিশের থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যায় শহীদ বাহিনীর সদস্য মাদকব্যবসায়ী ফয়সাল ওরফে ওয়ান পিস ফয়সাল। কিন্তু প্রশাসন এতে নিরব ভূমিকা পালন করছেন। জানা গেছে, অবসরপ্রাপ্ত এক পুলিশ কনস্টেবলের নির্মাণাধীন বাড়িতে চাঁদা না পেয়ে লুটপাটের অভিযোগে অভিযান চালায় পুলিশ। ঘটনাস্থলে গিয়ে লুটপাটে বাধা দিয়ে তিনজনকে হাতেনাতে আটক করা হয়। পরে ওই ব্যক্তিদের সহযোগীরা দলবদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলে জড়ো হয়।
এ সময় তারা পুলিশের কাছ থেকে জোরপূর্বক আটক ব্যক্তিদের ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায়। পুলিশ জানায়, ছিনিয়ে নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ডেভিড (২৮) ও রাসেল (৩০) নামে দুজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। পুলিশ অভিযান চালালে তারা নিজেদের ‘আজাদের লোক’ বলে দাবি করে। তারা পুলিশকে জানায়, তারা যে ভ্যানগাড়ি নিয়ে এসেছিল তাতে মালামাল তোলার জন্য তাদের পাঠানো হয়েছিল এবং তারা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছিল।
কিন্তু পরবর্তীতেতে জানায় যায়, ছিনিয়ে নেওয়া ওই ব্যক্তি যুবদল নেতা সাব্বির আহমেদ শহিদ ও যুবদল নেতা সিকদার বাপ্পির লোক। শহীদ ও বাপ্পির নির্দেশনায় তাদেরকে পুলিশের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয় স্থানীয় মাদকব্যবসায়ী ফয়সাল ওরফে ওয়ান পিস ফয়সাল বাহিনীর সদস্যরা। বর্তমানে মাসদাইরে র্যাব ও কাশীপুরে পুলিশের উপরে হামলা চালিয়ে ও মূলহোতারা অধরা, এখনো ঘুরছেন এলাকায়। ব্যবস্থা নিচ্ছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ক্ষোভ বাড়ছে এলাকাবাসীর।
এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) তারেক আল মেহেদী যুগের চিন্তাকে বলেন, ঘটনার দিনই আমরা মাসদাইর ও ফতুল্লায় ব্যাপক অভিযান পরিচালনা করেছি। এখনো আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে আমাদের অভিযান চলমান। আর আপনারা অবগত রয়েছেন সবসময়ই মূলহোতা আড়ালেই থাকে এদের আমরা চিহ্নিত করে দ্রুতই আইনের আওতায় আনবো। আজকে আমরা বিহারী ক্যাম্পে অভিযান চালিয়েছি, এমনভাবেই নিয়মিত বিভিন্ন স্পটে আমাদের অভিযান চলমান থাকবে।


