নারী আইনজীবীদের ‘নর্তকী’ সম্বোধন করে ফের সমালোচিত বিএনপির টিপু
যুগের চিন্তা রিপোর্ট
প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬, ১২:০০ এএম
নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব এড.আবু আল ইউসুফ খান টিপু।
# এই ধরণের মন্তব্যের মাধ্যমে অপরাধীরা সাহস পায় : মহিলা পরিষদ সভাপতি
# নারীদের অসম্মানকারী সমাজের ও জাতির শত্রু : আইনজীবী সমিতির সভাপতি
# আমরা এতে বিব্রত বোধ করছি : আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক
# এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ : ‘বাংলাদেশ ল ইয়ার্স কাউন্সিল’ জেলা সভাপতি
# কুরুচিপূর্ণ বক্তব্যে বিএনপির ভাবর্মূতি ক্ষুন্ন করেছে : না.গঞ্জ প্রেসক্লাব সভাপতি
# তরুণ রাজনীতিবিদদের জন্য এমন বক্তব্য নেতিবাচক উদাহরণ : না.গঞ্জ প্রেসক্লাব সাধারণ সম্পাদক
# নারীদের প্রতি সম্মান রেখে কথা বলবেন : এনসিপি জেলার সভাপতি
# তাঁর এই বক্তব্যের জন্য দুঃখপ্রকাশ করা উচিৎ : এড. বাঁধন
# আমি তার বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর কাছে ন্যায় বিচার চাই : এড.আমেনা আক্তার শিল্পী
বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব এড.আবু আল ইউসুফ খান টিপু। নারায়ণগঞ্জ আইনজীবী সমিতির এক নারী সদস্যকে লাঞ্ছিত করার ৪৮ ঘন্টার মধ্যে এবার আইনজীবী সমিতির নারী আইনজীবীদের নিয়ে অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য দিয়ে সমালোচিত তিনি। এনিয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়েছে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্টজনেরা। তারা অবিলম্বে বিএনপি হাইকমান্ডকে টিপুর ব্যাপারে ব্যবস্থাগ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন।
এড.আমেনা আক্তার শিল্পী যিনি বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ জেলা আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর, তাকে লাঞ্ছিত করার ঘটনায় এড.টিপুকে নিয়ে ব্যাপক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। এর রেশ কাটতে না কাটতে গতকাল আইনজীবী সমিতি ভবনের সামনে প্রকাশ্যে সহকর্মী নারী আইনজীবীদের নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করেন। বিএনপির এই নেতা দাবি করেন, ‘এই কোর্টে (নারায়ণগঞ্জ) কয়েকজন নর্তকী আছে যারা পুরুষদের নিয়ে ঘুরতে ভালোবাসে। আইন পেশা করে না, খালি আইনের পোশাক পরে এসে বেটাছেলেদের নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় গাড়িতে ঘুরে আর নর্তকীগিরি করে।’ এই কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব পদ থেকে এড.আবু আল ইউসুফ খান টিপুকে বহিষ্কারের দাবি জানান বিশিষ্টজনেরা। বাংলাদেশ বার কাউন্সিলকেও এব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানিয়ে নারায়ণগঞ্জ আইনজীবী সমিতির নেতৃবৃন্দের শক্ত ভূমিকা দাবি করেছেন।
এছাড়া বিএনপির এই নেতার পারিবারিক শিক্ষা নিয়েও সচেতন মহল প্রশ্ন তুলেছেন। কোন ব্যক্তিই আইনজীবি সমিতির সম্মানিত নারী আইনজীবীদের ‘নর্তকী’ বলে গালি দিতে পারেননা । বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে নিজের সহকর্মীদের কি করে এই ধরণের নোংরা মন্তব্য করার সাহস পান তিনি, তাঁর নিজেরও তো স্ত্রী-মেয়ে সন্তান রয়েছে। তাঁর মুখ দিয়ে এসব অশ্রাব্য ভাষা বের হওয়ার আগে কী তিনি তার পরিবারের সেই সদস্যদের কথা চিন্তা করেছেন এমন প্রশ্ন তুলেছেন নারী আইনজীবিরা। তার বিরুদ্ধে কঠিন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে জানিয়েছেন আইনজীবী নেতারা। এমনকি নারী আইনজীবি থেকে শুরু করে সকল নারী সমাজের মাঝে আঘাত হেনেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে। এছাড়া নারীদের প্রতি হেনস্থা করার ঘটনাও বৃদ্ধি পেয়েছে। বিএনপির দায়িত্বশীল পদে থেকে তাঁর এই কুরুচিপূর্ণ বক্তব্যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ।
নারায়ণগঞ্জ মহিলা পরিষদের সভাপতি রিনা আহমেদ যুগের চিন্তাকে বলেন, ‘তিনি নিজে একজন আইনজীবি হয়ে নারী আইনজীবিদেরকে কিভাবে এই ধরণের নোংরা কথা বলেন। কোনভাবেই তার মন্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। কোর্ট পাড়ায় কোন এপ্রোন পড়ে কোন নর্তকী কাজ করে না। তার এই বক্তব্য অত্যন্ত লজ্জাজনক। এই ধরণের মন্তব্যের মাধ্যমে অপরাধীরা সাহস পায়। আমি একজন নারী হিসেবে তার মন্তব্যের বিরুদ্ধে নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।’
বিএনপির টিপুর এমন বক্তব্য নিয়ে সমালোচনা করেছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা এনসিপির আহবায়ক জুবায়ের সরদার। তিনি যুগের চিন্তাকে জানান, ‘নারীদের অসম্মান করে মন্তব্য করা আমরা সমর্থন করি না। তিনি একজন আইনজীবি হিসেবে তার সংযত হয়ে আচরণ করা উচিত। কেননা ওই নারী আইনজীবী তারই দলের রাজনীতি করে। তিনি সকল নারীদের প্রতি সম্মান রেখে কথা বলবেন, আমরা তার কাছে সেই প্রত্যাশা করি।’
নারায়ণগঞ্জ আইনজীবী ফোরামের সাবেক সভাপতি ও নারায়ণগঞ্জ আইনজীবি সমিতির সভাপতি এড.সরকার হুম্য়াুন কবির বলেন, ‘তিনি (টিপু) যে মন্তব্য করেছেন তা নিঃসন্দেহে খারাপ মন্তব্য। তার এই মন্তব্যে নারী আইনজীবিদের সুনাম ক্ষুন্ন করেছে। রাজনৈতিক দলের পদে থেকে তার এই মন্তব্য কোনভাবেই গ্রহণযাগ্য নয়। আদালত পাড়ায় কোন নর্তকী নেই। তিনি কিভাবে এই মন্তব্য করেছে, তাকে এর প্রমাণ দিতে হবে। নারীদের অসম্মানকারী সমাজের ও জাতির শত্রু। তাদের বিরুদ্ধে কঠিন বিচার হবে। ইতোমধ্যে তাদের শোকজ করা হয়েছে।’
এটিকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ উল্লেখ করে ‘বাংলাদেশ ল ইয়ার্স কাউন্সিল’ নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি এড.মাইনউদ্দিন বলেন, ‘আদালতপাড়ায় এক আইনজীবি আরেকজন আইনজীবিকে নিয়ে যে ধরণের মন্তব্য করা হচ্ছে, তা খুবই দুঃখজনক। তাছাড়া এক আইনজীবি হয়ে আরেকজন নারী আইনজীকে নর্তকী বলতে পারেনা , সে যেই হোক। কেননা নারী জাতি হচ্ছে, মা জাতি। যে এই মন্তব্য করেছে তিনিও একজন মায়ের গর্ভ থেকে এসে পৃথীবির মুখ দেখেছেন। নারী জাতিকে সম্মান দিতে হবে। আমরা তাদের এই কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানাই। তাছাড়া গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থেকে তার এই মন্তব্য ঠিক হয় নাই।’
নারায়ণগঞ্জ আইনজীবি সমিতির সাধারণ সম্পাদক এড. এইচ এম আনোয়ার প্রধান বলেন, একজন আইনজীবি হয়ে আরেকজন আইনজীবেকে মন্তব্য নিয়ে যে ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে, আমরা এতে বিব্রত বোধ করছি। ইতোমধ্যে আইনজীবি সমিতির ইসি কমিটি এই ঘটনায় মিটিং হয়েছে। দ্রুত আমাদের সিদ্ধান্ত জানতে পারবেন। তবে আমি আইনজীবি হিসেবে মনে করবো, উভয় পক্ষ নিজেদের কথায় পরিবতর্ন আনবেন।
টিপুর এধরণের বক্তব্যকে শিষ্টাচার ও অশালীন উল্লেখ করে নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি আবু সাউদ মাসুদ বলেন, ‘২০২৪ এর ৫ আগস্টের পর থেকে একের পর এক উগ্র এবং নিন্দনীয় বক্তব্য দিয়েছেন তিনি। যেন গডফাদার শামীম ওসমানকে অনুসরণ করছেন তিনি। নারী আইনজীবীদের প্রতি মহানগর বিএনপির সদস্য সচিবের এমন কুরুচিসম্পন্ন ও ধৃষ্টতাপূর্ণ বক্তব্য বিএনপির ভাবর্মূতি ক্ষুন্ন করেছে। আমি তাঁর এসকল বক্তব্যর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। একই সাথে বিএনপির হাইকমান্ডকে এব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণের আহবান জানাই। নারায়ণগঞ্জে বিএনপির আরো অনেক নেতা রয়েছেন, কিন্তু তাদেরকে কখনোই ওই ব্যক্তির মতো এমন নিন্দনীয়, উগ্র আচরণ করতে দেখা যায়নি। অবশ্যই এই ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিএনপির সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া উচিৎ বলে মনে করি।’
তরুণ রাজনীতিবিদদের জন্য এমন বক্তব্য নেতিবাচক উদাহরণ হয়ে থাকবে উল্লেখ করে নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আফজাল হোসেন পন্টি বলেন, ‘এড.টিপু বিএনপির একজন পরিচিত নেতা, অনেকদিন যাবৎ রাজনীতিতে জড়িত। নারীদের প্রতি ‘নর্তকী’ এধরণের শব্দ উচ্চারণ অনুচিৎ হয়েছে।’
নারী আইনজীবীদের প্রতি এড.টিপুর এমন কুরুচিপূর্ণ শব্দচয়নের ব্যাপারে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি মহানগর বিএনপির আহবায়ক ও নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক এড.সাখাওয়াত হোসেন খান।
সিনিয়র নেতার এমন শব্দচয়ন দেখে এড.নুর বাঁধন মর্মাহত হয়েছেন। তিনি যুগের চিন্তাকে জানান, নারী আইনজীবি এড. আমেনাকে আমরা অনেক দিন যাবত চিনি। তার চলাফেরায় কোন নেতিবাচক কিছু দেখি নাই। সবার সাথে ভালো আচরণের মধ্য দিয়ে কাজ করেন তিনি। তাছাড়া বিগত আওয়ামী লীগ শাসনামলে বিএনপির নেতাকর্মী থেকে শুরু করে আমার ভাইয়ের মামলাও তিনি পরিচালনা করেছেন। এড. টিপু কাকা, নারী আইনজীবিদের নর্তকী বলে যে মন্তব্য করেছে তা খুবই দুঃখের বিষয়। এছাড়া একেকজনের পারিবারিক শিক্ষা একেক রকম। তাছাড়া তিনি দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকায় তার থেকে আমরা এই ধরণের মন্তব্য প্রত্যাশা করি না। তিনি এই মন্তব্য করার আগে তার চিন্তা করা উচিৎ ছিল তারও স্ত্রী-কন্যা রয়েছে, যারা নারী। আমেনা অনেক অসহায় নারীদের পক্ষে মামলা পরিচালনা করেছে। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা ভিডিও বক্তব্যে দেখলাম এড. টিপু আইনজীবি হয়ে কয়েকজন নারী আইনজীবিকে নর্তকী বলেছে, যদিও কারো নাম উল্লেখ করে নাই। আমরা মনে করি, তার এই মন্তব্যে সকল নারী আইনজীবিকে বুঝিয়েছে। তাছাড়া তার সহকর্মী নারী আইনজীবিদের এই মন্তব্য করা মানে, নিজের গোষ্ঠিকে বুঝিয়েছে। আমরা আশা করি তিনি তাঁর এই বক্তব্যের জন্য দুঃখপ্রকাশ করবেন।’
এদিকে গতকাল এড.টিপু নারী আইনজীবীদের আক্রমণ করে দেওয়া বক্তব্যে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর আমেনা আক্তার শিল্পী। তিনি যুগের চিন্তাকে জানান,‘ তিনি তার পরিবার থেকে সুশিক্ষা পায় নাই। তাই এই ধরণের মন্তব্য করেছে। তিনি নারায়ণগঞ্জের নারী আইনজীবিদেরকে আঘাত করেছে। সে মানসিক বিকারগ্রস্থ বিধায় এই ধরণের মন্তব্য করেছে। আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে তার বিরুদ্ধে বিচার চাই। তার মত লোক দিয়ে দলের কি কাজে আসবে তা আমি বোধগম্য নয়। তিনি এখন নারায়ণগঞ্জের বিষফোঁড়া হয়ে গেছে। তাছাড়া আমি ২০১৩ সনে নারায়ণগঞ্জ বারের সনদ পাই। তিনি ২০১৬ সনে ঢাকা বারের সনদ পায়। তিনি আমারও জুনিয়র আইনজীবি। আমি তার বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর কাছে ন্যায় বিচার চাই।’


