Logo
Logo
×

বিশেষ সংবাদ

‘হঠাৎ সাংবাদিক’ বিপত্তি

Icon

যুগের চিন্তা রিপোর্ট

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম

‘হঠাৎ সাংবাদিক’ বিপত্তি

‘হঠাৎ সাংবাদিক’ বিপত্তি

Swapno



সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দৈনিক মানবজমিনের পত্রিকার প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীর একটি মন্তব্য ঝড় তুলেছে। তিনি বলেছেন, ‘এখন আর সাংবাদিকতা নেই। কারণ, এখন সাংবাদিক তৈরি হচ্ছে না। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে, যার হাতে মেবাইল আছে-সবাই সাংবাদিক। এটাকে বলা যায় ‘হঠাৎ সাংবাদিক।’ নারায়ণগঞ্জে এই ‘হঠাৎ সাংবাদিক’ এর প্রভাব কতখানি, তা জানতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের অভিমত ও করণীয় জানতে চায় দৈনিক যুগের চিন্তা।  


নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক ও মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক এড. সাখাওয়াত হোসেন খান যুগের চিন্তাকে বলেন, ‘সাংবাদিকতা একটি মহৎ পেশা, এই পেশাকে সকলেই শ্রদ্ধা করে। যাকে ঘিরে এটার সুবিধা নিয়ে কিছু অপরাধী সাংবাদিকতার খোলস লাগিয়ে মূল সাংবাদিকদের সুনাম ক্ষুন্ন করছে। এই ধরণের অপসাংবাদিকতা দেশ থেকে নিমূল হওয়া উচিত। দেশে সাংবাদিকতায় একটি আইন হওয়া দরকার। যাতে যে কেউ এসেই সাংবাদিকতার খোলস পরতে না পারে।


’ তিনি বলেন, ‘অনেকেই শিক্ষাগত যোগ্যতা ছাড়াই সাংবাদিক বনে যাচ্ছেন। যাকে ঘিরে সাংবাদিকতার গুণগতমান ক্ষুন্ন হচ্ছে। তাছাড়া বহু অপসাংবাদিকদের দ্বারা জনগণ প্রতারিত হচ্ছে। এদিকে সকল কাজেই ভালো-মন্দ রয়েছে। কিন্তু এ পেশায় রক্ষাকবজ বেশি থাকার কারণে অপকর্মকারীরা অনেকেই সাংবাদিকদের খোলস পড়ছেন। যাদের থেকে জনগণকে রেহাই দিতে দ্রুত সরকারের প্রয়োজন এই অপসাংবাদিক রোধে কাজ শুরু করা।’


নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল-আমিন যুগের চিন্তাকে বলেন, ‘বর্তমানে শুধু নারায়ণগঞ্জই নয়, সারাদেশের ভূঁইফোড় সাংবাদিকতার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। মোবাইল হাতে নিয়েই নিজেক সাংবাদিক হিসেবে জাহির করছে কিন্তু নেই শিক্ষাগত যোগ্যতা বা অভিজ্ঞতা। এদের মতো অপসাংবাদিকদের কারণেই মূল ধারার সাংবাদিকরা মূল্যায়িত হতে পারছে না। যাকে ঘিরে সরকার ও প্রেস কাউন্সিলের প্রয়োজন যাচাই-বাছাই করে এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।’


নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক রায়হান কবির যুগের চিন্তাকে বলেন, ‘ভূঁইফোড় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সরকার কাজ শুরু করেছে। আশা করছি দ্রুতই তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে তাদের প্রতিরোধ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিলে আমরা যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবো।’


জামায়াতে ইসলামী নারায়গঞ্জ মহানগর শাখার আমীর মাওলানা আব্দুল জব্বার যুগের চিন্তাকে বলেন, ‘অনলাইন-পত্রিকা সব কিছুই একটি নীতিমালার আওতায় আসা দরকার। কারণ, সাংবাদিকদের একটি মর্যাদা রয়েছে, যারা সত্য-মিথ্যা যাচাই করে সমাজের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে মোবাইল একটি হাতে নিয়ে ‘আন্ডার মেট্রিক’ পাস অনেক ব্যাক্তি নিউজ পোর্টাল খুলে সাংবাদিকতা শুরু করে দিচ্ছে। যাকে ঘিওে কোনটা আসল আর কোনটা নকল মানুষ মিলিয়ে ফেলছে। যাকে ঘিরে সরকারের উচিত যারা নিবন্ধন ছাড়া ভূঁইফোড় সাংবাদিক, তাদের যাচাই বাচাই করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।’

তিনি বলেন, ‘বর্তমানে বেকার যুবকের সংখ্যা বেশি থাকায়, বেকাররা মনে করছে, মোবাইল একটা হলেই আমি সাংবাদিক হয়ে যাবো। সেই জন্য ভূঁইফোড় সাংবাদিক বাড়ছে। রাষ্ট্রের উচিত তাদেরকে বাছাই করে যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেওয়া। এর পাশাপাশি এর বিরুদ্ধে সরকারের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন।’


জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নারায়ণগঞ্জ জেলার আহ্বায়ক জুবায়ের সরদার যুগের চিন্তাকে বলেন, ‘বর্তমানে ভূঁইফোড় অনলাইন ও অপসাংবাদিকদের জন্য সাংবাদিকতা থেকে মানুষের বিশ্বাস উঠে যাচ্ছে। কিন্তু এদের প্রতিকারে কোন ব্যবস্থা দেখছি না, নারায়ণগঞ্জের মূল ধারার গণমাধ্যমকর্মীদের। যাকে ঘিরে এই ভূঁইফোড়তা ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছে। যেখানে দ্রুত সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা প্রয়োজন।’


জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নারায়ণগঞ্জ মহানগরের আহ্বায়ক শওকত আলী যুগের চিন্তাকে বলেন, আমরা কিন্তু আগেও গণমাধ্যমের সংস্কার বিষয়ে একটি প্রস্তাব দিয়েছিলাম। বর্তমানে ব্যাঙের ছাতার মতো ভূঁইফোড় একাধিক অনলাইন পোর্টাল খোলা হচ্ছে, যা সরকারি নীতিমালার আওতায় নেই। তাছাড়া তাদের জবাবদিহিতা নেই বললে চলে।


’ তিনি বলেন, ‘এই অপসাংবাদিকরা মূলত সাংবাদিকতা নয় ব্লাকমেইলিং করতে মাঠে নেমেছে এবং নানাভাবে হেনস্থাও করছে। সবমিলিয়ে এটার একটি অসুস্থকর পরিবেশ হিসেবে আমরা মনে করি। তাছাড়া মূল দ্বারার গণমাধ্যমকর্মী যারা রয়েছে তাদের জন্য এটা একটি হুমকি বললেই চলে। আমরা আবারো বলছি, একটি নীতিমালার মধ্যে দিয়ে সাংবাদিকতা পরিচালিত হওয়া প্রয়োজন।’


জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নারায়ণগঞ্জ মহানগরের সদস্য সচিব আশিকুর রহমান অভি যুগের চিন্তাকে বলেন, ‘বর্তমানে কিছু ভূঁইফোড় অনলাইন কোন প্রকারের যাচাই-বাছাই ছাড়াই বিভিন্ন নিউজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দিচ্ছেন। তাদের বিরুদ্ধে সরকারের একটা ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।’


তিনি বলেন, ‘এই ভূঁইফোড় সাংবাদিকদের চিহ্নিত করে জাতির সামনে এদের তুলে ধরতে পারলে মানুষ এই প্রতারকদের চিনবে। সরকারের কাছে আমাদের আবেদন থাকবে মূল দ্বারার সাংবাদিকদের এগিয়ে আনতে ভূঁইফোড় সাংবাদিক ও সংগঠনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা জরুরী হয়ে দাঁড়িয়েছে।’


নারায়ণগঞ্জ জেলা তথ্য অফিসার মোহাম্মদ কামরুজ্জামান যুগের চিন্তাকে বলেন, ব‘র্তমানে কিছু অপসাংবাদিকদের জন্য সাংবাদিকতা অনেকটাই নিচে নেমে গেছে। কিন্তু এটা নিয়ন্ত্রণ রাখতে সরকার, তথ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সকলের ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিকারের ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।’


নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সভাপতি আবু সাউদ মাসুদ যুগের চিন্তাকে বলেন, ‘মিডিয়ার দুর্বলতার কারণেই স্যোশাল মিডিয়া, মিডিয়া রূপে দাঁড়িয়ে গিয়েছে। গত ১৬/১৭ বছর মিডিয়া যে আচরণ করেছে, বর্তমানেও সেই আচরণ করে যাচ্ছে, কোন পরিবর্তন আসেনি। বর্তমানে আমাদের দুর্বলতার কারণেই ‘মায়ে রান্দে বাবায় খায় ডটকম’ চালু হয়েছে। বর্তমানে প্রশাসনকে বিভিন্ন সময় বলা হয়েছে, তারা যেন এদেরকে যাচাই-বাছাই করে, কিন্তু দেখি তারাও মিডিয়ার ব্যাপারে বেশি আগ্রহী নয়।


তিনি বলেন, বর্তমানে তথ্য মন্ত্রণালয় চাইলে উদ্যোগ নিয়ে নিয়ম-নীতির মধ্যে এনে ভূঁইফোড় অনলাইন ও সংগঠনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। কিন্তু তারা কেন এ বিষয়ে কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না তা আমরা জানি না। তা ছাড়া প্রেস ক্লাব নারায়ণগঞ্জের সাংবাদিকতা একক নিয়ন্ত্রণ করে না, শুধু আমাদের মেম্বারদের নিয়ন্ত্রণে রাখি। তাছাড়া নারায়ণগঞ্জের সকল পত্রিকা, যার যার পলিসি হিসেবে চলে।


নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আফজাল হোসেন পন্টি যুগের চিন্তাকে বলেন, অভিজ্ঞতা ও নিবন্ধন ছাড়াই ভূঁইফোড় অনলাইন পোর্টাল খুলে অপসাংবাদিকতার সমস্যাটি অনেকটাই পুরনো। বর্তমানে সেটা ইউটিউব এবং ফেসবুকের কল্যাণে ও বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের যে ডিজিটাল সেকশন চালু হওয়ার কারণে সমস্যাটি অনেকটাই গভীর হয়েছে।


তিনি বলেন, বিগত দিনে আমরা দেখতাম পত্রিকা ও টেলিভিশনের সাংবাদিক, যাদের আমরা আলাদাভাবে সাংবাদিক চিহ্নিত করতে পারতাম। কিন্তু জাতীয় মিডিয়াগুলো বর্তমানে যে পেইজ খুলে রেখেছেন, প্রায় একই রকম একজন সাধারণ ব্যক্তিও তেমনটি খুলতে পারে। যাকে ঘিরে আসল-নকল আলাদা করা যাচ্ছে না। যার সুবিধা নিচ্ছেন কিছু অসৎ ব্যক্তি, যারা এটাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। যার কারণে অনেকেই সেই অপসাংবাদিকদের দ্বারা ব্ল্যাকমেইলিং এর শিকার হচ্ছেন। কিন্তু বর্তমান সময়ে এটার পুরো দায় এসে পড়ছে সাংবাদিকদের উপরে, যার কারণে এক বিব্রতকর অবস্থায় মূল দ্বারার সাংবাদিকদের পড়তে হচ্ছে।


তিনি বলেন, বিগত দিনে আমরা বহুবার আওয়াজ তুলেছিলাম, একটি নীতিমালার মধ্যে সাংবাদিকদের আনতে হবে। সরকারি কর্মকর্তা বা ডাক্তার সকলের কিন্তু বিশেষ কিছু নাম্বার আছে, যার মাধ্যমে চিহ্নিত করা যায়। কিন্তু সাংবাদিকদের কিন্তু সেটা নেই। তাছাড়া নীতিমালা করার উদ্যোগ নিলে, নানা সময় বহু বাধা পড়ে যায়। তা কেন পড়ে যায়, তা আমরা জানি না। বর্তমানে এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক ও তথ্য অফিসারসহ যারা সংশ্লিষ্ট রয়েছে সকলেই ঐক্যবদ্ধ হয়ে অপসাংবাদিকতা প্রতিরোধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।  


নারায়ণগঞ্জ জেলা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আহসান সাদিক শাওন যুগের চিন্তাকে বলেন, সাংবাদিকতার বর্তমান পরিস্থিতিতে অভিজ্ঞতার মানদন্ড, সব থেকে বেশি প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাছাড়া বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যতগুলো ভূঁইফোড় অনলাইন বা সাংবাদিক রয়েছে, তাদের সাথে সকলে থাকলেও দিনশেষে মূল ধারার টিভি কিংবা সংবাদপত্রের নিউজগুলোই খোঁজে সকলেই। যার কারণ মূল ধারার মানদন্ড ঠিক থাকে। বর্তমানে সাংবাদিকতায় মানদণ্ড গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher
ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন